সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলাফল ঘিরে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরেই শুরু হয়েছে আত্মসমালোচনা ও ক্ষোভের সুর। হুগলি জেলার গোঘাটে দলের বর্ষীয়ান নেতা মনোরঞ্জন পাল একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু তুলে ধরে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, এই পরাজয় শুধুমাত্র নির্বাচনী হার নয়, বরং একটি “বৃহত্তর রাজনৈতিক বার্তা”। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে সংগঠনগত দুর্বলতা, নেতৃত্বের সঙ্গে দূরত্ব, এবং বাস্তব সমস্যার প্রতি অবহেলার অভিযোগ। মনোরঞ্জন পালের অভিযোগ, তাঁকে জেলা সহ-সভাপতির পদে রেখে কার্যত “আই ওয়াশ” করা হয়েছে এবং দীর্ঘ তিন বছর তাঁকে সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে রাখা হয়। তিনি বলেন, যারা একসময় তৃণমূল কংগ্রেসকে এলাকায় প্রতিষ্ঠা করতে লড়াই করেছিলেন, বিশেষ করে বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে সংগ্রামে সামিল হয়েছিলেন, তাদেরই পরবর্তীতে বঞ্চিত করা হয়েছে। এর ফলে দলের ভিত দুর্বল হয়েছে। তিনি দাবি করেন, সংগঠন পরিচালনায় অতিরিক্তভাবে বেসরকারি কৌশলগত সংস্থা—আইপ্যাকের ওপর নির্ভরতা দলের ক্ষতি করেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাস্তব মাটির কর্মীদের অভিজ্ঞতা ও মতামতকে গুরুত্ব না দিয়ে বাইরের কর্পোরেট সংস্থার কৌশলের ওপর নির্ভর করায় সংগঠনগত ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও নেতৃত্বের বার্তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। নির্বাচনের ঠিক আগে অভিষেক ব্যানার্জির মত নেতার বক্তব্য—বিশেষ করে “চার তারিখের পর দেখে নেওয়া ও বদলা” সংক্রান্ত মন্তব্য—ভোটারদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে তাঁর মত। এ বিষয়ে অভিষেক ব্যানার্জির মতো নেতৃত্বের আরও বেশি সচেতন হওয়া প্রয়োজন ছিল বলে তিনি মনে করেন। তিনি ইঙ্গিত করেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-কে সঠিকভাবে পরামর্শ দেওয়ার মতো লোকের অভাব ছিল এবং ভুল তথ্য বা পরামর্শের কারণে বাস্তব পরিস্থিতি যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। অর্থনীতি ও প্রশাসন নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, সরকারি কর্মচারীদের একটি বড় অংশ সরকারের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে এবং তারা নিজেদের স্বার্থ নিয়েই বেশি ব্যস্ত থেকেছে। পাশাপাশি কৃষকদের সমস্যার দিকেও তিনি আলোকপাত করেন—বিশেষ করে সীমান্তে পণ্য পরিবহণে বাধা এবং কৃষিপণ্যের বাজারে প্রভাব—যা সরকারের বড় নীতিগত ভুল বলে তিনি মনে করেন। মনোরঞ্জন পাল আরও অভিযোগ করেন, তৃণমূল কংগ্রেস সাধারণ মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে উপেক্ষা করেছে, যার ফলেই তারা বিকল্পের দিকে ঝুঁকেছে। একইসঙ্গে তিনি বলেন, “পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি” দীর্ঘস্থায়ী হয় না এবং মানুষের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা কমে যায়। দলের সাংগঠনিক ব্যর্থতা নিয়ে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কর্মীরা আক্রান্ত হলেও অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় নেতৃত্ব তাদের পাশে দাঁড়ায়নি। ব্লক বা জেলা স্তরের নেতাদের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, কর্মীরা সাহায্যের জন্য ফোন করলেও অনেক সময় সাড়া পাননি। তাঁর মতে, এই বিচ্ছিন্নতাই সংগঠনের ভাঙনের অন্যতম কারণ।তবে সমালোচনার পাশাপাশি তিনি নতুন পরিস্থিতি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও দেন। তাঁর মতে, যদি বিজেপি দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, অর্থনৈতিক স্বস্তি, সরকারি কর্মচারীদের জন্য সঠিক সুবিধা এবং কৃষকদের উন্নয়নে কাজ করতে পারে, তাহলে মানুষ সেই দিকেই ঝুঁকবে। এমনকি তিনি মন্তব্য করেন, সেক্ষেত্রে “সবাই বিজেপি করুক”—অর্থাৎ মানুষ কার্যকর শাসনকেই প্রাধান্য দেবে। সবশেষে তিনি নবনির্বাচিত বিজেপি বিধায়কের উদ্দেশে বলেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করে যদি সাধারণ মানুষকে শান্তি ও স্বস্তিতে রাখা যায়, তবে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই তাঁদের পাশে থাকবে। সব মিলিয়ে মনোরঞ্জন পালের এই মন্তব্য তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ, সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং ভোট-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেছে, যা আগামী দিনে রাজ্যের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।


![]()

More Stories
সংগ্রাম থেকে জয়: গোঘাটে বিজেপির সাফল্যে কর্মীদের সংযমের বার্তা দিলেন দোলন দাস
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে আরামবাগ মহকুমার ফলাফল এক নজরে
দলবিরোধী কর্মকাণ্ডে কড়া বার্তা—কারণ দর্শানোর নোটিশ বিজেপির, ৭ দিনের সময়সীমা, নামের লিস্ট নিচে