August 15, 2026

নকুন্ডার মাটিতে স্বাধীনতার গোপন ঘাঁটি,সুধীরচন্দ্র ঘোষের অমর সংগ্রামের ইতিহাস

আজও অবহেলিত তাঁর ঐতিহাসিক বাড়ি

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: স্বাধীনতার ইতিহাস শুধু কলকাতার রাজপথ, বড় বড় সভা কিংবা শহরের বিপ্লবী আস্তানার ইতিহাস নয়; ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রকৃত শক্তি ছড়িয়ে ছিল বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামেও। সেইসব অখ্যাত-অর্ধপরিচিত গ্রাম, সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি এবং মাটির পথ একদিন হয়ে উঠেছিল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের গোপন কেন্দ্র। হুগলি জেলার গোঘাটের নকুন্ডা গ্রামও সেই ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। আর সেই ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে থাকা এক নাম—সুধীরচন্দ্র ঘোষ। ১৯০৭ সালে নকুন্ডা গ্রামে জন্ম সুধীরচন্দ্র ঘোষের। পিতা রামপদ ঘোষ, মাতা মনমোহিনী ঘোষ। কৈশোরেই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ব্রিটিশ শাসনের অত্যাচার এবং মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা জাতীয় আন্দোলনের আবহ তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলে। ১৯২১ সাল। গান্ধীজির ডাকে সারা দেশে অসহযোগ আন্দোলনের ঢেউ। সেই সময় আরামবাগ মহকুমাও উত্তাল হয়ে উঠেছিল জাতীয়তাবাদের জোয়ারে। একই সময়ে দ্বারকেশ্বর নদের ভয়াবহ বন্যায় আরামবাগের বিস্তীর্ণ এলাকা বিপর্যস্ত। দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে ত্রাণ নিয়ে এগিয়ে আসেন জাতীয় আন্দোলনের নেতারা। এই সময় প্রফুল্লচন্দ্র সেন, হেমন্ত বসু, বিজয় মোদক প্রমুখ নেতৃবৃন্দ আরামবাগ হয়ে বড়ডোঙ্গল এলাকায় পৌঁছন। ত্রাণকার্যের সূত্রেই তাঁদের সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয় তরুণ সুধীরচন্দ্র ঘোষের। স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে ত্রাণকার্যে যুক্ত হন তিনি। এই ত্রাণকাজই পরবর্তী জীবনে তাঁর রাজনৈতিক ও স্বাধীনতা সংগ্রামের পথকে বদলে দেয়। প্রফুল্লচন্দ্র সেনকে সঙ্গে নিয়ে তিনি পৌঁছে যান বিস্তীর্ণ জলমগ্ন নকুন্ডা গ্রামে। দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি গ্রামের মানুষের সঙ্গে গড়ে ওঠে জাতীয় আন্দোলনের সম্পর্ক। আর সেই সূত্রেই নকুন্ডা ও বড়ডোঙ্গল ক্রমশ কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকেন্দ্রে পরিণত হতে থাকে। সুধীরচন্দ্র ঘোষ ধীরে ধীরে গোঘাট থানা তথা আরামবাগ মহকুমার কংগ্রেস সংগঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে ওঠেন। তাঁর নেতৃত্বে নকুন্ডা অঞ্চলে তৈরি হয় স্বাধীনতা আন্দোলনের এক নিভৃত ঘাঁটি। তাঁর বাড়ি শুধু একটি পারিবারিক বাসস্থান ছিল না—স্থানীয় মানুষের স্মৃতিতে সেটি ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামী ও রাজনৈতিক নেতাদের আসা-যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। প্রফুল্লচন্দ্র সেনের পাশাপাশি ডক্টর প্রফুল্ল ঘোষ, বিজয় মোদক, হেমন্ত বসু, অতুল্য ঘোষ, প্রাণকৃষ্ণ মিত্রের মতো নেতারাও এই বাড়িতে অবস্থান করেছেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এমনকি বিপ্লবী ভূপেন্দ্রনাথ দত্তেরও এই বাড়িতে আসার স্মৃতি স্থানীয়ভাবে প্রচলিত। ব্রিটিশ পুলিশের নজর এড়িয়ে সেই বাড়ি থেকেই চলত সংগঠনের নানা কাজ। সবজির ঝুড়ির আড়ালে গ্রামে গ্রামে পৌঁছে যেত গোপন ইস্তাহার ও আন্দোলনের বার্তা। এভাবেই ব্রিটিশের চোখে ধুলো দিয়ে গ্রামবাংলার মানুষের মধ্যে স্বদেশচেতনা ছড়িয়ে দেওয়া হত এবং আন্দোলন ক্রমশ তীব্রতা পেত। স্বাধীনতা সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকার জন্য সুধীরচন্দ্র ঘোষকে দীর্ঘ সময় ব্রিটিশ সরকারের কারাবরণ করতে হয়। পরিবারের সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, তাঁর মোট কারাবাসের সময় ছিল ৬ বছর ৪ মাস। এর মধ্যে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে ৩ বছর ৪ মাস, দমদম জেলে ২ বছর এবং খড়্গপুরের হিজলি জেলে ১ বছরেরও বেশি সময় তিনি হাজতবাস করেন। স্বাধীনতার জন্য একজন গ্রামবাংলার মানুষের এই দীর্ঘ কারাবাস প্রমাণ করে, স্বাধীনতার লড়াই কেবল শহুরে রাজনৈতিক নেতাদের লড়াই ছিল না; প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষও নিজেদের জীবন, স্বাধীনতা ও ভবিষ্যৎ বিসর্জন দিয়েছিলেন। সুধীরচন্দ্র ঘোষের কর্মকাণ্ড শুধু স্বাধীনতা আন্দোলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। নকুন্ডা অঞ্চলে শিক্ষার প্রসারেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ১৯২২ সালে প্রতিষ্ঠিত নকুন্ডা কাত্যায়নী উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম ছিলেন তিনি বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়। বিদ্যালয়ের প্রথম সভাপতি ছিলেন প্রফুল্লচন্দ্র সেন এবং পরবর্তীতে সুধীরচন্দ্র ঘোষ সেই দায়িত্ব গ্রহণ করেন। স্বাধীনতার পরেও তিনি জনজীবন থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি। কংগ্রেসের রাজ্য কমিটির সদস্য হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ১৯৮২ সালে ৭৫ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। কিন্তু তাঁর সংগ্রামী জীবনের স্বীকৃতি রাষ্ট্রও দিয়েছিল। স্বাধীনতার ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে ১৯৭২ সালে ভারত সরকার স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সম্মান জানাতে তাম্রপত্র প্রদান করে। সুধীরচন্দ্র ঘোষও সেই সম্মান লাভ করেন। তাঁর পরিবারের কাছে সংরক্ষিত তাম্রফলকে লেখা রয়েছে—“স্বাধীনতার পঁচিশতম বছর উপলক্ষে স্বাধীনতা সংগ্রামে স্মরণীয় অবদানের জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী এই তাম্রপত্র প্রদান করেছেন।” অর্থাৎ নকুন্ডার এই সংগ্রামী শুধু স্থানীয় মানুষের স্মৃতিতেই স্বাধীনতা সংগ্রামী নন, স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর অবদান রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিও পেয়েছিল। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, যে বাড়িতে বসে স্বাধীনতা আন্দোলনের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে, সেই সুধীরচন্দ্র ঘোষের বাড়িকে ২০০১ সালে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার পশ্চিমবঙ্গ হেরিটেজ কমিশনের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ বছর কেটে গেলেও ঐতিহাসিক এই বাড়িটির যথাযথ সংস্কার ও সংরক্ষণ হয়নি। বর্তমানে পরিবারের পক্ষ থেকে বাড়িটির দেখাশোনা করেন তাঁদের খুড়তুতো ভাই দেবাশীষ ঘোষ। এলাকাবাসী পীযূষ কান্তি ঘোষ, লাবণ্য পাল, তরুণ কান্তি ঘোষ-সহ স্থানীয় মানুষের আবেদন, স্বাধীনতা সংগ্রামের এই স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি দ্রুত সংস্কার ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হোক। কারণ এই বাড়ি নিছক একটি পুরনো স্থাপনা নয়; এর প্রতিটি দেওয়াল, প্রতিটি কাঠামো যেন বহন করছে স্বাধীনতা সংগ্রামের এক বিস্মৃত অধ্যায়। এই বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ১৯২১-এর অসহযোগ আন্দোলনের দিন, দ্বারকেশ্বরের বন্যায় দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ইতিহাস, গ্রামে গ্রামে জাতীয়তাবাদ ছড়িয়ে দেওয়ার ইতিহাস, ব্রিটিশ পুলিশের চোখ এড়িয়ে গোপন ইস্তাহার পৌঁছে দেওয়ার ইতিহাস, স্বাধীনতা সংগ্রামীদের গোপন বৈঠকের স্মৃতি এবং সুধীরচন্দ্র ঘোষের দীর্ঘ কারাবরণের ইতিহাস। স্বাধীনতার ৭৯ বছর পর তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে—যে মানুষটি দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবনের ছয় বছর চার মাস কারাগারে কাটিয়েছিলেন, তাঁর স্মৃতিবাহী বাড়িটি কি কেবল সময়ের সঙ্গে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে? স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হলে শুধু বইয়ের পাতায় নয়, এই ধরনের জীবন্ত স্মৃতিচিহ্নও সংরক্ষণ করা জরুরি। সুধীরচন্দ্র ঘোষের তাম্রপত্রে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি আজও অমলিন, কিন্তু তাঁর স্মৃতিবাহী বাড়িটি আজ সংস্কারের অপেক্ষায়। নকুন্ডার মাটি তাই শুধু একটি গ্রামের মাটি নয়—এই মাটির সঙ্গে মিশে রয়েছে স্বাধীনতার সংগ্রামের ইতিহাস, আত্মত্যাগের ইতিহাস এবং গ্রামবাংলার অগণিত নীরব সৈনিকের ইতিহাস। সুধীরচন্দ্র ঘোষ সেই ইতিহাসেরই এক নীরব অথচ দীপ্তিমান সৈনিক। এখন সময় এসেছে তাঁর স্মৃতিবাহী বাড়িটিকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করে আগামী প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার, যাতে স্বাধীনতার ইতিহাস কেবল স্মৃতিতে নয়, বাস্তবের একটি জীবন্ত স্থাপত্যেও বেঁচে থাকে।

Loading