বিস্মৃতপ্রায় শিল্পী হরেন মুখার্জির জীবনসংগ্রামের কাহিনি
সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ সময়ের স্রোতে অনেক নামই হারিয়ে যায়। কিন্তু কিছু গল্প থেকে যায়—মাটির গন্ধে, সুরের টানে, আর মানুষের হৃদয়ে। তেমনই এক জীবন্ত ইতিহাস আজও নিঃশব্দে বয়ে নিয়ে চলেছেন হুগলির গোঘাট থানার বেঙাই গ্রামের প্রায় ৮০ বছরের প্রবীণ সংগীতশিল্পী হরেন মুখার্জি।
১৯৪৬ সালের ৭ই সেপ্টেম্বর এক সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারে জন্ম তাঁর। কিন্তু ঐশ্বর্যের মাঝেও তাঁর জীবনের পথ ছিল মোটেও মসৃণ নয়। পরিবারে যাত্রার ঐতিহ্য থাকলেও, দাদু চাইতেন না তিনি গান-বাজনার জগতে পা রাখুন। দাদু ছিলেন আরামবাগ কোর্টের মোহরীর কাজের সঙ্গে যুক্ত—নিয়ম, শৃঙ্খলা আর রক্ষণশীলতার এক কঠোর প্রতিচ্ছবি। ছোট্ট হরেন তখন চুপিসারে শুনে শুনেই গান শেখেন। দাদুর চোখে পড়লে কান ধরে টেনে নিয়ে যাওয়া হত বাড়িতে—কিন্তু তাতেও থামেননি তাঁর সুরের সাধনা।
বাবা যাত্রা দলে সুর করতেন, দাদা কালীপদ মুখার্জিও ছিলেন নামী শিল্পী—সেই পরিবেশেই অজান্তেই গড়ে উঠেছিল তাঁর সংগীতের ভিত। জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে যখন ঠাকুমার অসুস্থতার কারণে তাঁকে থাকতে হয় বিষ্ণুপুরে। সেখানেই তিনি তালিম নেন বিষ্ণুপুর ঘরানার ধ্রুপদী সংগীতে, প্রখ্যাত গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। সুর যেন তখন তাঁর জীবনের একমাত্র ভাষা।
পরবর্তীতে কলকাতায় এসে তিনি আরও শানিত করেন তাঁর প্রতিভা। পিন্টু ভট্টাচার্য ও শ্যামল মিত্রের মতো গুণী শিল্পীদের সান্নিধ্যে এসে তাঁর সংগীতজীবন নতুন দিশা পায়। বিশেষ করে শ্যামল মিত্রের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর—একসময় পিন্টু ভট্টাচার্যের খাতা থেকে ঠিকানা জোগাড় করে নিজেই পৌঁছে যান শ্যামল মিত্রের কাছে। সেই সাহসই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। শ্যামল মিত্রের হাত ধরেই তিনি সুযোগ পান আকাশবাণীতে গান গাওয়ার।
১৯৭৭-৭৮ সালে প্রথম আকাশবাণীতে গান, এরপর ১৯৮২ সালে এইচএমভি কোম্পানিতে রেকর্ডিং—একসময় আরামবাগ মহকুমার অন্যতম জনপ্রিয় কণ্ঠ হয়ে ওঠেন তিনি। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শ্যামল মিত্রের সঙ্গে মঞ্চ ভাগ করে নিয়েছেন, গেয়েছেন অসংখ্য গান।তবে জীবনের সব অধ্যায় যে মধুর ছিল তা নয়। দুর্গাপুরে এক অনুষ্ঠানে শ্রোতাদের হাতে আক্রান্তও হতে হয়েছে তাঁকে। মাথায় শরীরে আঘাতের চিহ্ন নিয়ে বাড়িতে এসে ভয়ে ভয়ে বলতে হয়েছিল অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। কিন্তু সেই আঘাতকে পেছনে ফেলে, চার বছর পর আবার সেই মঞ্চেই ফিরে গিয়ে জয় করে নেন মানুষের মন—শ্যামল মিত্রের বিখ্যাত গান “তিনটি মন্ত্র নিয়ে যাদের জীবন”এ যেন এক শিল্পীর অবিচল জেদের প্রতীক।
আজ বয়সের ভারে স্মৃতি কিছুটা ঝাপসা। গানগুলোর সব কথা আর আগের মতো মনে থাকে না। তবুও কণ্ঠে এখনও মিশে আছে সেই পুরনো দিনের সুরের আবেশ। কথার ফাঁকে ফাঁকে উঠে আসে হারিয়ে যাওয়া দিনের গল্প, সংগ্রাম আর সাফল্যের মিশেল।আলোচনার শেষে নিজের সুর করা জনপ্রিয় গান **“ওগো বন্ধু বিদায়”** গেয়ে যেন জীবনের এক আবেগময় ইতি টানলেন হরেন মুখার্জি। সেই সুরে মিশে ছিল হারিয়ে যাওয়া দিনের স্মৃতি, না-পাওয়ার বেদনা আর এক অদম্য শিল্পীর অমলিন ভালোবাসা।আজকের দ্রুতগতির সময়ে এমন শিল্পীরা হয়তো আলোচনার কেন্দ্রে নেই, কিন্তু তাঁদের জীবনই প্রমাণ করে—সত্যিকারের সুর কখনও হারিয়ে যায় না, তা থেকে যায় মানুষের হৃদয়ে, প্রজন্মের পর প্রজন্মে।

![]()

More Stories
লোকসংস্কৃতির টানে আজও জীবন্ত চৈত্রসংক্রান্তির ‘ঘেঁটু উৎসব’
বালিবেলা সরস্বতী শিশু মন্দিরে আচার–অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শিশুদের ‘হাতে খড়ি’
১৫ বছরের পুরনো সাওড়া খুন মামলায় বড় মোড় — হাইকোর্টে বেকসুর খালাস ১৯ জন