কর্ণসুবর্ণ: ইতিহাস, কিংবদন্তি ও রাজা শশাঙ্কের রাজধানী

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার কর্ণসুবর্ণ প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। সপ্তম শতকে এটি গৌড়রাজ্যের রাজধানী হিসেবে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করে। একই সঙ্গে কর্ণসুবর্ণকে ঘিরে ইতিহাস, লোককথা এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের এক অনন্য সমন্বয় গড়ে উঠেছে। এই জনপদের পরিচয় নির্ধারণে যেমন প্রামাণ্য ঐতিহাসিক তথ্য গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত লোকবিশ্বাসও এর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ।

জনশ্রুতি অনুসারে, মহাভারতের অঙ্গরাজ কর্ণ এই অঞ্চলে তাঁর রাজধর্মের কেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন এবং তাঁর নামানুসারেই নাকি জনপদের নাম হয় “কর্ণসুবর্ণ”। একইভাবে লোকপরম্পরায় প্রচলিত রয়েছে যে, বনবাসকালে পাণ্ডবরা এই অঞ্চল অতিক্রম করেছিলেন এবং বর্তমান রাক্ষসীডাঙ্গা এলাকায় ভীম ও হিড়িম্বা-হিড়িম্ব রাক্ষসের কাহিনির সূত্রপাত ঘটে। তবে এসব বর্ণনার পক্ষে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক বা প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। ফলে এগুলোকে ইতিহাসের পরিবর্তে লোককথা হিসেবেই বিবেচনা করা হয়।

কর্ণসুবর্ণ সম্পর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমকালীন বিবরণ পাওয়া যায় সপ্তম শতাব্দীর চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাং (Xuanzang)-এর ভ্রমণবৃত্তান্তে। তিনি ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে, গৌড়রাজ শশাঙ্কের মৃত্যুর অব্যবহিত পরে কর্ণসুবর্ণ সফর করেন। তাঁর বিবরণে কর্ণসুবর্ণকে একটি বৃহৎ, সমৃদ্ধ ও জনবহুল নগর হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন যে এখানকার অধিবাসীরা অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল, জ্ঞানচর্চায় আগ্রহী এবং নৈতিক আচরণে সুপরিচিত ছিলেন। তাঁর বর্ণনায় কর্ণসুবর্ণ ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে একাধিক বৌদ্ধবিহার এবং বহু হিন্দু দেবমন্দিরের অস্তিত্বের কথাও উঠে আসে, যা সে সময়ের ধর্মীয় সহাবস্থানের পরিচয় বহন করে।

কর্ণসুবর্ণের নিকটবর্তী রক্তমৃত্তিকা মহাবিহার ছিল তৎকালীন ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র। বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে এই মহাবিহারের ধ্বংসাবশেষ, পোড়ামাটির ফলক, লিপি এবং বিভিন্ন বৌদ্ধ প্রতীক আবিষ্কৃত হয়। এসব নিদর্শন কর্ণসুবর্ণের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় গুরুত্বের প্রামাণ্য সাক্ষ্য বহন করে।

গৌড়রাজ্যের ইতিহাসে রাজা শশাঙ্ক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শাসক। গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর তিনি গৌড়ে একটি শক্তিশালী স্বাধীন রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন এবং সপ্তম শতকের প্রথমার্ধে উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী শাসক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তাঁর সময়ে থানেশ্বরের সম্রাট হর্ষবর্ধন এবং কামরূপের রাজা ভাস্করবর্মার সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে ওঠে। সমসাময়িক সাহিত্য, বিশেষ করে বানভট্টের হর্ষচরিত-এ শশাঙ্কের বিরূপ চিত্র পাওয়া গেলেও আধুনিক ইতিহাসবিদরা মনে করেন, সে বিবরণ রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে। ফলে তাঁর শাসনকাল মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন উৎস পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

শশাঙ্কের বংশপরিচয় আজও ইতিহাসের অন্যতম রহস্য। তাঁর মুদ্রা ও অল্প কয়েকটি শিলালিপি ছাড়া নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রায় অনুপস্থিত। তাঁর মুদ্রায় শৈবধর্মের প্রতীক বৃষভবাহন মহাদেবের চিহ্ন এবং গুপ্ত যুগের মুদ্রাশৈলীর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। কিছু গবেষক তাঁর সঙ্গে গুপ্ত বংশের সম্ভাব্য সম্পর্কের কথা উল্লেখ করলেও এ বিষয়ে কোনো সর্বসম্মত ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেই।

বাংলার কালগণনার ইতিহাসেও শশাঙ্কের নাম বিশেষভাবে আলোচিত। অনেক গবেষকের মতে, তাঁর আমলে “শশাঙ্কাব্দ” নামে একটি বর্ষপঞ্জির প্রচলন হয়েছিল। যদিও বর্তমান বঙ্গাব্দের উৎপত্তি সরাসরি শশাঙ্কাব্দ থেকে হয়েছে কি না, সে বিষয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে এখনও মতভেদ রয়েছে।

কর্ণসুবর্ণকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল এক বিস্তৃত নগরসভ্যতা। রাজধানীর চারপাশে গোবরহাটি, গোকর্ণ, পাঁচথুপি, শক্তিপুর ও মহলন্দির মতো সমৃদ্ধ জনপদ নগরজীবনের অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলেছিল। একই সঙ্গে এই অঞ্চল বঙ্গোপসাগর হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ রক্ষা করত বলে প্রত্নতাত্ত্বিক ও শিলালিপিগত তথ্য থেকে ধারণা করা হয়। মালয় উপদ্বীপে আবিষ্কৃত একটি প্রাচীন শিলালিপিতে রক্তমৃত্তিকা থেকে আগত মহানাবিক বুদ্ধগুপ্তের উল্লেখ বাংলার সামুদ্রিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হয়।

সময়ের প্রবাহে কর্ণসুবর্ণের ঐশ্বর্য ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যায়। সপ্তম শতকের শেষভাগ থেকেই এর রাজনৈতিক গুরুত্ব কমতে শুরু করে এবং পরবর্তী পাল ও সেন যুগে এই রাজধানীর উল্লেখ খুবই সীমিত হয়ে পড়ে। তবুও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, ঐতিহাসিক দলিল এবং লোকঐতিহ্যের সম্মিলনে কর্ণসুবর্ণ আজও বাংলার অতীত গৌরবের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। রাজা শশাঙ্ক এবং তাঁর রাজধানীকে ঘিরে বহু প্রশ্ন এখনও অনুত্তরিত থাকলেও, কর্ণসুবর্ণের ইতিহাস বাংলা ও ভারতীয় ইতিহাসচর্চার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে চিরকাল প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবে।

Loading