Oplus_16908288

তাজপুর সরস্বতী শিশু মন্দির: ২৭ বছরের ঐতিহ্যে ভারতীয় সংস্কার, মূল্যবোধ ও জাতীয় চেতনার অনন্য শিক্ষাকেন্দ্র

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: প্রথাগত শিক্ষার পাশাপাশি ভারতীয় দর্শন, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, নৈতিকতা ও চরিত্র গঠনের শিক্ষাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে এক অনন্য শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তুলেছে বাঁকুড়া জেলার প্রত্যন্ত তাজপুর গ্রামের সরস্বতী শিশু মন্দির। ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে তাজপুর গ্রামের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। হুগলি জেলার শেষ সীমানা আনুড় গ্রামের ঠিক পাশেই শুরু হয়েছে বাঁকুড়া জেলার তাজপুর গ্রাম। জেলার সীমানায় অবস্থিত এই প্রত্যন্ত গ্রামেই প্রতিষ্ঠিত হয় সরস্বতী শিশু মন্দির, যা আজ মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষার এক উল্লেখযোগ্য কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। “অখিল ভারতীয় শিক্ষা সংস্থান ‘বিদ্যা ভারতী’-র অধীন পরিচালিত এই বিদ্যালয় শুধুমাত্র একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং ভারতীয় জীবনদর্শন, মূল্যবোধ ও জাতীয় চেতনাকে আগামী প্রজন্মের মধ্যে বিকশিত করার এক নিরন্তর প্রয়াস। প্রধান আচার্য নিতাই চন্দ্র নায়েক আমাদের জানান বিদ্যা ভারতীর অধীনে বর্তমানে সারা ভারতবর্ষে প্রায় ৩০ হাজারেরও বেশি সরস্বতী শিশু মন্দির ও অনুরূপ বিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে প্রায় ৪৫ লক্ষ ছাত্র-ছাত্রী অধ্যয়ন করছে এবং প্রায় ১ লক্ষ ৪০ হাজার আচার্য-আচার্যা শিক্ষাদানের দায়িত্ব পালন করছেন। সেই বৃহৎ শিক্ষাপরিবারেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা তাজপুর সরস্বতী শিশু মন্দির। ১৯৯৯ সালের ৯ মে, ২৫শে বৈশাখ এই বিদ্যালয়ের পথচলা শুরু হয়। এলাকার কয়েকজন সমাজমনস্ক ও রাষ্ট্রীয় ভাবধারায় বিশ্বাসী ব্যক্তির উদ্যোগে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়, যাঁদের মধ্যে অন্যতম প্রেরণাদাতা ছিলেন শ্রদ্ধেয় শক্তিপদক পাল মহাশয়। বর্তমানে বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান হয় এবং ভাই-বোন নামে সম্বোধিত ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা প্রায় ৮৩৩ জন। বিদ্যালয়ের প্রধান আচার্য নিতাই নায়ক জানান, ‘শিশু মন্দির’ নামকরণের পিছনে রয়েছে একটি গভীর দর্শন। যেমন মন্দিরে বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করে পূজা করা হয়, তেমনই এই বিদ্যালয়ে ভারতীয় সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিক পরিবেশ, দেশপ্রেম ও মূল্যবোধকে প্রতিষ্ঠা করে শিশুদের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা হয়। তাই এটি শুধুমাত্র একটি স্কুল নয়, প্রকৃত অর্থেই একটি ‘শিশু মন্দির’। এখানকার শিক্ষা শুধুমাত্র বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। নিয়মিত পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি পাঁচটি বিশেষ বিষয়ে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়—শারীরিক শিক্ষা, যোগ, সংগীত, সংস্কৃত এবং নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা। ছোটবেলা থেকেই শিশুদের মধ্যে শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং গুরুজনদের প্রতি শ্রদ্ধা জাগিয়ে তোলার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিদ্যালয়ে প্রবেশের আগে শিশুরা বাড়ির গুরুজন ও বাবা-মাকে প্রণাম করে আসে, বিদ্যালয়ে প্রবেশের সময় কপালে তিলক দিয়ে তাদের বরণ করা হয়। আচার্যরাও বিদ্যালয়ে প্রবেশের আগে ভূমি প্রণাম করেন। এরপর প্রতিদিন মাতৃবন্দনা, সরস্বতী বন্দনা, দেশবন্দনা ও প্রার্থনার মাধ্যমে দিনের পাঠ শুরু হয়। বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের এখানে ‘আচার্য’ ও ‘আচার্যা’ নামে সম্বোধন করা হয়। আচার্যদের নির্দিষ্ট পোশাক সাদা ধুতি ও সাদা পাঞ্জাবি এবং আচার্যাদের পোশাক লালপাড় সাদা শাড়ি। ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি সম্মান রেখেই এই পোশাকবিধি চালু রয়েছে। ছাত্র-ছাত্রীরা তাঁদের ‘দাদামণি’ ও ‘দিদিমণি’ বলে সম্বোধন করে, যা শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে আত্মিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে তোলে। বিদ্যালয়ে নিয়মিতভাবে সদাচার শিক্ষা, নৈতিক শিক্ষা, আধ্যাত্মিক আলোচনা, সংস্কৃত ভাষা শিক্ষা, যোগব্যায়াম, দেশাত্মবোধক সংগীত এবং শারীরিক ক্রীড়া কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এছাড়াও বিদ্যারম্ভ সংস্কার, নবীনবরণ, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, স্বচ্ছতা অভিযান, জল সংরক্ষণ, সেবা কার্যক্রম, শিক্ষামূলক ভ্রমণ, বনভোজন, সাপ্তাহিক শিশুসভা, মাতৃ সম্মেলন, অভিভাবক সম্মেলন, ঠাকুরদা-ঠাকুরমা সম্মেলনের মতো একাধিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচি আয়োজন করা হয়। ফলে বিদ্যালয়টি শুধু ছাত্র-ছাত্রীদের নয়, অভিভাবক ও গোটা সমাজকেও সংস্কারমুখী করে তোলার একটি কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। প্রধান আচার্য নিতাই নায়ক জানান, শুরুতে বিদ্যালয়ের পথচলা সহজ ছিল না। নানা বাধা ও প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে এগোতে হয়েছে। কিন্তু আজ বিদ্যা ভারতীর বিদ্যালয়গুলির শিক্ষার মান ও পরীক্ষার ফলাফল প্রমাণ করে দিয়েছে যে মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে সমানভাবে এগিয়ে যেতে পারে। তাঁর দাবি, সাম্প্রতিক মাধ্যমিক পরীক্ষায় রাজ্যের প্রথম থেকে ত্রয়োদশ স্থান পর্যন্ত বহু ছাত্র-ছাত্রী বিদ্যা ভারতীর বিদ্যালয় থেকে উত্তীর্ণ হয়েছে। বিদ্যালয়ের আর্থিক পরিকাঠামো মূলত সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের অনুদান ও সহযোগিতার উপর নির্ভরশীল। সরকারি অনুদান না থাকলেও গত বছর বিষ্ণুপুরের সাংসদ সৌমিত্র খাঁ তাঁর সাংসদ তহবিল থেকে বিদ্যালয়ের ভবন উন্নয়নের জন্য ১২ লক্ষ টাকা প্রদান করেন। এজন্য বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। প্রধান আচার্য নিতাই চন্দ্র নায়েক আরও জানান, তাঁদের লক্ষ্য প্রতিটি ব্লকে অন্তত একটি আদর্শ মাধ্যমিক সরস্বতী শিশু মন্দির গড়ে তোলা, যাতে আরও বেশি সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী ভারতীয় সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও চরিত্র গঠনের এই শিক্ষা লাভের সুযোগ পায়। তিনি আরও বলেন, সরকারি বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরাও যেন এই ধরনের মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা পায়, সেই উদ্যোগ নেওয়া উচিত। তবে বিদ্যালয়ের পরিকাঠামো উন্নয়নে সরকারি সহযোগিতা গ্রহণে আপত্তি না থাকলেও শিক্ষা পরিচালনায় কোনও ধরনের সরকারি হস্তক্ষেপ তাঁরা চান না। তাঁর মতে, শিক্ষা ব্যবস্থার স্বাধীনতা বজায় থাকলেই এই আদর্শ ও মান অক্ষুণ্ণ থাকবে। মিড-ডে মিল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্য শিক্ষা ও সংস্কার গঠন; তাই এমন কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত নয় যাতে পাঠদানের সময় বা শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হয়। ভারতীয় সভ্যতা, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে আগামী প্রজন্মের মধ্যে সঞ্চারিত করার যে প্রয়াস তাজপুর সরস্বতী শিশু মন্দির গত ২৭ বছর ধরে করে চলেছে, তা আজ শুধুমাত্র একটি বিদ্যালয়ের সাফল্যের গল্প নয়; বরং সমাজ গঠন, চরিত্র নির্মাণ এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ এক নতুন প্রজন্ম তৈরির এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে ক্রমশ প্রতিষ্ঠা লাভ করছে।

Oplus_16908288
Oplus_16908288

Loading