August 11, 2026

ভগবদ্গীতার আদর্শ ও ক্ষুদিরাম বসুর আত্মবলিদান

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে মাত্র ১৮ বছর বয়সে ১৯০৮ সালের ১১ আগস্ট ক্ষুদিরাম বসুর হাসি মুখে ফাঁসির মঞ্চে ওঠার ঘটনাটি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক বহিঃপ্রকাশ ছিল না, বরং এটি ছিল গভীর আধ্যাত্মিক চেতনা ও পরম আত্মত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন এবং সশস্ত্র বিপ্লববাদী ধারার যখন বিকাশ ঘটে, তখন ভারতবর্ষে কার্ল মার্কসের ‘দাস ক্যাপিটাল’ বা বামপন্থি ভাবাদর্শের কোনো বিস্তার ঘটে নি—রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লব (১৯১৭) কিংবা শ্রেণি সংগ্রামনির্ভর তত্ত্ব ভারতে পৌঁছানোর বহু পূর্বেই ক্ষুদিরাম বসু, প্রফুল্ল চাকী, অরবিন্দ ঘোষদের মতো বিপ্লবীরা নিজেদের উৎসর্গ করেছিলেন। ফলে তৎকালীন সশস্ত্র আন্দোলনের রসদ কোনো রাজনৈতিক অর্থনৈতিক তত্ত্ব থেকে আসেনি; তার মূল ভিত্তি ছিল ভারতীয় সনাতন আধ্যাত্মিকতা ও স্বদেশপ্রেম, যার মূল চালিকাশক্তি ছিল ‘শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা’। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’ ও স্বামী বিবেকানন্দের কর্মযোগের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিপ্লবীরা গীতাকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মহাশক্তিতে পরিণত করেছিলেন। গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের “নৈনং ছিন্দন্তি শাস্ত্রাণি নৈনং দহতি পাবকঃ” অর্থাৎ আত্মার অমরত্ব এবং মৃত্যুর অবিনশ্বরতার দর্শন ক্ষুদিরামকে শেখায় যে শরীর নশ্বর কিন্তু দেশের জন্য কৃত ত্যাগ অমর; অন্যদিকে “কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন” বাণী তাঁর মধ্যে নিষ্কাম কর্মের প্রেরণা জোগায়, যেখানে ব্যক্তিগত লাভ বা খ্যাতির আশা না করে মাতৃভূমির পরাধীনতার শৃঙ্খলমোচনকেই তিনি পরম ‘স্বধর্ম’ বলে গণ্য করেছিলেন। ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, ফাঁসির আদেশ শোনার পর বা ফাঁসির দিন সকালে মুজাফফরপুর জেলে তাঁর মুখে কোনো ভয়ের ছাপ ছিল না, বরং হাতে গীতা জড়িয়ে ধরে অতীব শান্ত ও স্ফুর্ত হৃদয়ে তিনি ফাঁসির দড়ি গলায় পরেছিলেন। সুতরাং, ক্ষুদিরাম বসুর বিপ্লব কোনো সামাজিক শ্রেণিসংগ্রামের ফসল ছিল না; ‘দাস ক্যাপিটাল’ বা পাশ্চাত্য কোনো রাজনৈতিক তত্ত্ব নয়, বরং গীতার অমর বাণীই তাঁর মধ্যে আত্মোৎসর্গের সেই আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল, যা তাঁকে হাসি মুখে মৃত্যুকে জয় করার বীরত্ব দান করেছিল।

একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি।
হাসি হাসি পরব ফাঁসি দেখবে ভারতবাসী।

Loading