August 16, 2026

ক্যারাম খেলার ১০০ বছরের ইতিহাস: ভারত থেকে বিশ্বমঞ্চে পাড়ি, আঙুলের ছোঁয়ায় বদলে গেল খেলার দুনিয়া

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: কাঠের চৌকো বোর্ড, চার কোণে চারটি পকেট, সাদা-কালো গুটি, মাঝখানে লাল রানি আর একটি স্ট্রাইকার—আঙুলের একটিমাত্র নিখুঁত টানে ছুটে যায় কাঙ্ক্ষিত গুটির দিকে। স্ট্রাইকারের টক্ করে আঘাতের শব্দ, বোর্ডের গায়ে গুটির ছুটে চলা, পকেটে গুটি পড়ার মুহূর্তে আনন্দের উচ্ছ্বাস—একসময় এটাই ছিল পাড়ার ক্লাব, গ্রামের সন্ধ্যা কিংবা পরিবারের অবসরের অন্যতম পরিচিত ছবি। আজ সেই ছবিই যেন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যাচ্ছে। ক্যারাম শুধু একটি খেলা নয়, বহু মানুষের শৈশব, কৈশোর এবং সামাজিক জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক আবেগ। প্রায় একশো বছরের যাত্রায় ভারতীয় উপমহাদেশের ঘরোয়া পরিবেশ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে গেলেও ডিজিটাল যুগের দাপটে সেই পুরনো ক্যারামই আজ নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে। ক্যারামের জন্ম ঠিক কোথায়, কে প্রথম এই খেলা তৈরি করেছিলেন—তার নির্ভুল ও সর্বসম্মত ঐতিহাসিক উত্তর আজও পাওয়া যায়নি। তবে ইতিহাস, প্রচলিত তথ্য এবং খেলাটির বিকাশের ধারার দিকে তাকালে ভারতীয় উপমহাদেশকেই আধুনিক ক্যারামের অন্যতম প্রধান উৎপত্তি ও বিকাশকেন্দ্র হিসেবে মনে করা হয়। উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে বিশ শতকের গোড়ার দিকে ভারতে বোর্ডভিত্তিক এই ধরনের খেলার বিকাশ শুরু হয় বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। তৎকালীন বোম্বে, অর্থাৎ বর্তমান মুম্বই, কেরামের প্রাথমিক বিকাশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে উঠে আসে। তবে মুম্বইতেই যে ক্যারামের জন্ম—এমন চূড়ান্ত ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। প্রথমদিকে ক্যারাম ছিল নিছক ঘরোয়া বিনোদন। বাড়ির বারান্দা, পাড়ার ক্লাব, সামাজিক সংগঠন, পুজোর প্যান্ডেলে কিংবা চায়ের দোকানের আড্ডায় কেরাম বোর্ড ঘিরে বসতেন মানুষ। মাঠের প্রয়োজন নেই, খেলতে লাগে না বড় কোনও সরঞ্জাম—শুধু একটি বোর্ড, কিছু গুটি, স্ট্রাইকার আর কয়েকজন খেলোয়াড়। এই সহজলভ্যতাই ক্যারামকে সাধারণ মানুষের খেলা করে তুলেছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্যারাম আর শুধু অবসর কাটানোর খেলা থাকেনি। বিভিন্ন শহরে তৈরি হতে শুরু করে কেরাম ক্লাব। প্রতিযোগিতা বাড়ে, নিয়মকানুন আরও সুসংহত হয়। বোর্ড, গুটি, স্ট্রাইকার এবং খেলার সরঞ্জামেও ধীরে ধীরে মান নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ভারতের পাশাপাশি শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানসহ ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্যারাম ছড়িয়ে পড়ে। পরে প্রবাসী ভারতীয় ও দক্ষিণ এশীয় মানুষের হাত ধরে খেলাটি পৌঁছে যায় মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে। এভাবেই পাড়ার বোর্ড পেরিয়ে ক্যারাম পৌঁছে যায় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মঞ্চে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সংগঠিত কাঠামো গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে International Carrom Federation বা ICF গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিভিন্ন দেশের সংগঠন, খেলোয়াড় ও প্রতিযোগিতাকে একটি আন্তর্জাতিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার ফলে ক্যারাম ধীরে ধীরে একটি সংগঠিত প্রতিযোগিতামূলক খেলায় পরিণত হয়। ভারতও আন্তর্জাতিক ক্যারামে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় এবং দেশের বহু খেলোয়াড় আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাফল্য অর্জন করেন। ইতিহাসের এই গৌরবময় যাত্রার মাঝেই আজ ক্যারামের সামনে এক কঠিন বাস্তবতা। মোবাইল ফোন এসেছে, এসেছে অনলাইন গেম, এসেছে ক্যারামের ডিজিটাল সংস্করণও। কিন্তু হারিয়ে গেছে সেই কাঠের বোর্ডের চারপাশে বসে কয়েকজন মানুষের একসঙ্গে সময় কাটানোর দৃশ্য। একসময় সন্ধ্যা নামলেই গ্রামের ক্লাবঘরে কিংবা বাড়ির উঠোনে ক্যারাম বোর্ড বেরিয়ে আসত। বোর্ডে পাউডার ছড়িয়ে গুটির চলার পথ মসৃণ করা হতো। তারপর স্ট্রাইকারে আঙুলের টান—টক্! একটি গুটি পকেটে ঢুকতেই উচ্ছ্বাস। কখনও জেতার আনন্দ, কখনও হারের অভিমান, কখনও বন্ধুর সঙ্গে তর্ক—সব মিলিয়ে ক্যারাম ছিল সামাজিক জীবনেরও অংশ। আজ সেই শব্দ অনেক জায়গাতেই আর শোনা যায় না। বোর্ড আছে, কিন্তু খেলোয়াড় নেই। স্ট্রাইকার আছে, কিন্তু আঙুলের টান নেই। গুটি আছে, কিন্তু চারপাশে বসে থাকা মানুষগুলো নেই। সন্ধ্যার ক্লাবে এখন অনেক সময় ক্যারাম বোর্ডের পরিবর্তে দেখা যায় মোবাইলের আলো। এই হারিয়ে যাওয়া ক্যারামের গল্প খুঁজতে আমরা পৌঁছে গিয়েছিলাম হুগলি জেলার গোঘাট থানার ইন্দিরা গ্রামে। এখনও সেখানে তৈরি হয় ক্যারাম বোর্ড। কিন্তু একসময়ের তুলনায় চাহিদা অনেকটাই কমে গেছে। ক্যারাম বোর্ড তৈরির সঙ্গে যুক্ত কারিগর রাসবিহারী পণ্ডিত আমাদের জানালেন, এই বোর্ড তৈরি নিছক কাঠ জোড়ার কাজ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘ প্রায় ৩০ বছরের অভিজ্ঞতা, ধৈর্য এবং নিখুঁত পরিমাপের দক্ষতা। বোর্ডের প্রধান উপকরণের মধ্যে রয়েছে বাবলা কাঠের ফ্রেম এবং উন্নতমানের প্লাই। কাঠ ও প্লাই ভালোভাবে শুকিয়ে নিয়ে নির্দিষ্ট মাপ অনুযায়ী কাটা হয়। এরপর অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফ্রেমের সঙ্গে জোড়া দেওয়া হয়। একটি ভালো মানের বোর্ড তৈরি করতেই লেগে যায় প্রায় দুই থেকে তিন দিন। এরপর পালিশ ও ফিনিশিংয়ের জন্য আরও সময় লাগে। অর্থাৎ একটি বোর্ডের পিছনে রয়েছে কয়েক দিনের শ্রম, অভিজ্ঞতা এবং কারিগরের নিখুঁত হাতের কাজ। কিন্তু সেই শ্রমের বাজারই আজ সংকুচিত হচ্ছে। চাহিদা কমে যাওয়ায় নতুন প্রজন্মের কেউ এই পেশায় আসতে চাইছে না। ফলে শুধু ক্যারাম খেলা নয়, ক্যারাম বোর্ড তৈরির ঐতিহ্যবাহী কারিগরিও হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায়। রাসবিহারী পণ্ডিতের সঙ্গে আমাদের কথোপকথনে উঠে এসেছে বোর্ড তৈরিতে কী কী কাঁচামাল লাগে, বোর্ডের মাপ কীভাবে নির্ধারিত হয়, পকেটের মাপ কত রাখা হয়, একটি বোর্ড তৈরি করতে কত সময় লাগে এবং ভবিষ্যতে এই শিল্পের অস্তিত্ব কতটা নিরাপদ—এমন নানা প্রশ্ন। বোর্ড তৈরির গল্প শোনার পর আমরা কথা বলেছিলাম ক্যারাম খেলোয়াড় হারাধন লাহার সঙ্গে। ক্যারাম খেলার নিয়ম কী, কত ধরনের ক্যারাম খেলা হয়, একজন দক্ষ খেলোয়াড় হতে কী ধরনের অনুশীলন দরকার, কেরাম খেলার শারীরিক ও মানসিক উপকারিতা কী, কোথায় কোথায় প্রতিযোগিতা হয় এবং সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আগের তুলনায় ক্যারামের প্রতি মানুষের আগ্রহ কেন কমছে—এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমরা তাঁর সঙ্গে কথা বলেছিলাম। কারণ ক্যারাম শুধু গুটি পকেটে ফেলার খেলা নয়। একজন দক্ষ খেলোয়াড়কে একই সঙ্গে হিসাব করতে হয় গুটির অবস্থান, স্ট্রাইকারের গতি, আঙুলের চাপ এবং পরবর্তী চালের সম্ভাবনা। অর্থাৎ একটি ছোট্ট বোর্ডের মধ্যেই রয়েছে মনোযোগ, ধৈর্য, হিসাব, কৌশল ও হাতের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণের এক অনন্য সমন্বয়। ক্যারাম ছিল একসময়ের সামাজিকতার ভাষা। যে বাড়িতে বিকেলে বাবা-ছেলে একসঙ্গে ক্যারাম খেলতেন, যে ক্লাবে বন্ধুরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বোর্ড ঘিরে বসে থাকতেন, যে গ্রামে সন্ধ্যার পর কেরামের শব্দে মুখর হয়ে উঠত চায়ের দোকান কিংবা ক্লাবঘর—সেই কেরাম মানুষের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি করত। একটি বোর্ডের চারপাশে বসে কয়েকজন মানুষ কয়েক ঘণ্টা মোবাইলের বাইরে থাকতেন। আজকের প্রজন্মের কাছে সেই দৃশ্য অনেকটাই অচেনা। আমরা হয়তো ক্যারাম খেলছি, কিন্তু মোবাইলের পর্দায়; স্ট্রাইকারও চলছে, কিন্তু আঙুলের বদলে স্ক্রিনে; গুটি পকেটে পড়ছে, কিন্তু পাশে বসে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মানুষটি নেই। এটাই হয়তো ক্যারামের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। প্রযুক্তিকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। মোবাইল অ্যাপ ক্যারামের নতুন মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। অনলাইনে দূরের মানুষের সঙ্গে খেলা যাচ্ছে, বিভিন্ন কৌশল শেখার সুযোগও বেড়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হল—ডিজিটাল ক্যারাম কি কাঠের বোর্ডের ক্যারামের বিকল্প হতে পারে? প্রযুক্তি ক্যারামের নতুন দরজা খুলতে পারে, কিন্তু পুরনো দরজাটি বন্ধ করে দেওয়া উচিত নয়। স্কুল, কলেজ, ক্লাব ও ক্রীড়া সংগঠনগুলির মাধ্যমে নিয়মিত কেরাম প্রতিযোগিতা আয়োজন, গ্রামীণ প্রতিভা খুঁজে বের করা, পুরনো ক্যারাম ক্লাবগুলিকে সক্রিয় করা, স্কুল-কলেজে এই খেলা শুরু করা এবং দক্ষ বোর্ড নির্মাতাদের উৎসাহ দেওয়া গেলে এই ঐতিহ্যকে নতুন করে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। একই সঙ্গে ক্যারাম বোর্ড তৈরির সঙ্গে যুক্ত কারিগরদের প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। কারণ কারিগর হারিয়ে গেলে শুধু একটি পেশা হারাবে না, হারিয়ে যাবে একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। ক্যারামের একশো বছরের ইতিহাস আমাদের শেখায়—একটি খেলা কীভাবে মানুষের ঘর থেকে সমাজে, সমাজ থেকে দেশে এবং দেশ থেকে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছতে পারে। কিন্তু একই ইতিহাস আজ আমাদের সামনে অন্য একটি প্রশ্নও রেখে যাচ্ছে—যে খেলাকে ভারতীয় উপমহাদেশ পৃথিবীর দরবারে পৌঁছে দিয়েছিল, সেই খেলাটিই কি আমাদের চোখের সামনে হারিয়ে যাবে? হুগলির গোঘাটের ইন্দিরা গ্রামের কারিগরের হাতে এখনও কাঠ কাটা হয়, এখনও তৈরি হয় ক্যারাম বোর্ড, এখনও কেউ কেউ বোর্ডে পাউডার ছড়িয়ে স্ট্রাইকার সাজিয়ে বসেন। কিন্তু সেই সংখ্যা ক্রমেই কমছে। একসময় যে বোর্ড ঘিরে সন্ধ্যা কাটত, আজ সেই বোর্ড অনেক বাড়িতে নীরবে পড়ে থাকে। সমাজ বদলেছে, বিনোদনের ধরন বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, মানুষও বদলেছে। তবুও ক্যারামের সৌন্দর্য বদলায়নি। একটি ছোট্ট স্ট্রাইকার, একটি নিখুঁত নিশানা, এক আঙুলের সামান্য চাপ আর গুটির পকেটে পড়ার সেই চেনা শব্দ। হয়তো ক্যারাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সব উন্নতি মানেই পুরনোকে ভুলে যাওয়া নয়। প্রযুক্তির সঙ্গে এগিয়েও কিছু ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা যায়। কারণ ক্যারাম শুধু কাঠের একটি বোর্ড নয়। এটি আমাদের শৈশবের স্মৃতি, পাড়ার আড্ডা, বন্ধুত্বের গল্প, কারিগরের ঘামের মূল্য এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা এক ভারতীয় খেলাধুলার ঐতিহ্য। তাই সময় এসেছে আবার সেই বোর্ডে পাউডার পড়ুক, স্ট্রাইকারে আঙুলের টান লাগুক, গুটি ছুটে যাক পকেটের দিকে—আর কোনও এক সন্ধ্যায় আবার শোনা যাক সেই বহু পরিচিত শব্দ—টক্! হয়তো সেই শব্দই বলে দেবে, ক্যারাম এখনও হারিয়ে যায়নি।

Loading