August 22, 2026

আলু কি শুধু খাবার? স্টার্চ শিল্প গড়ে উঠলে বদলে যেতে পারে পশ্চিমবঙ্গের আলু অর্থনীতি

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: পশ্চিমবঙ্গের কৃষি অর্থনীতিতে আলুর গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু বছরের পর বছর উৎপাদন বাড়লেও চাষিদের সামনে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—উৎপাদিত আলুর বাজার কোথায়? উৎপাদন বেশি হলে দাম পড়ে যায়, আবার উৎপাদন কম হলে দাম বাড়ে। হিমঘরে সংরক্ষণ, পরিবহণ, বাজারজাতকরণ এবং অতিরিক্ত উৎপাদনের চাপ মিলিয়ে আলু চাষ ক্রমশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাই আলুকে শুধু কাঁচা কৃষিপণ্য হিসেবে বিক্রি না করে প্রক্রিয়াজাত শিল্পের কাঁচামালে পরিণত করার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।

এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা রয়েছে পটেটো স্টার্চ বা আলুর শ্বেতসারে। আলুর মধ্যে থাকা স্টার্চকে জল দিয়ে আলাদা করে পরিশোধন ও শুকিয়ে সাদা সূক্ষ্ম গুঁড়ো তৈরি করা হয়। খাদ্যশিল্পে স্যুপ, সস, বেকারি পণ্য, নুডলস, আইসক্রিম ও বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে এর ব্যবহার রয়েছে। পাশাপাশি কাগজ, কার্টন, বস্ত্র, আঠা এবং ওষুধশিল্পেও পটেটো স্টার্চের ব্যবহার করা যায়। ফলে মাঠের আলু সরাসরি বাজারে বিক্রির পরিবর্তে স্টার্চ ও অন্যান্য শিল্পপণ্যের কাঁচামালে পরিণত হলে আলুর মূল্য অনেকটাই বাড়ানো সম্ভব।

এর আরও একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র ইথানল উৎপাদন। স্টার্চকে এনজাইমের সাহায্যে গ্লুকোজ ও অন্যান্য গাঁজনযোগ্য শর্করায় পরিণত করে সেখান থেকে ইথানল তৈরি করা সম্ভব। তবে খাদ্যযোগ্য আলু সরিয়ে জ্বালানি উৎপাদনের পরিবর্তে অতিরিক্ত, বাজারে বিক্রি করা কঠিন, নিম্নমানের কিন্তু শিল্পোপযোগী আলু এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের বর্জ্য ব্যবহার করাই বেশি বাস্তবসম্মত।

পটেটো স্টার্চ থেকে পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং তৈরিরও সম্ভাবনা রয়েছে। স্টার্চভিত্তিক জৈব-অবক্ষয়যোগ্য উপাদান দিয়ে প্লাস্টিকের বিকল্প তৈরির কাজ বিশ্বজুড়ে চলছে। তবে প্রতিটি স্টার্চজাত পণ্যকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবেশবান্ধব বলা যায় না। তাই মান নির্ধারণ, গবেষণা ও যথাযথ শংসাপত্র জরুরি।

পশ্চিমবঙ্গে আলু উৎপাদনকারী এলাকাগুলিতে ‘পটেটো ভ্যালু অ্যাডিশন মিশন’ গড়ে তোলা যেতে পারে। কৃষকের কাছ থেকে আলু সংগ্রহ করে খাদ্যযোগ্য আলু বাজারে পাঠানো এবং শিল্পোপযোগী অতিরিক্ত আলু স্টার্চ কারখানায় ব্যবহার করা যেতে পারে। সেই স্টার্চ থেকে খাদ্যপণ্য, আঠা, কাগজ ও বস্ত্রশিল্পের উপকরণ, প্যাকেজিং সামগ্রী এবং উপযুক্ত ক্ষেত্রে ইথানল তৈরি করা সম্ভব। এর সঙ্গে পরিবহণ, প্যাকেজিং, যন্ত্র রক্ষণাবেক্ষণ, পরীক্ষাগার ও লজিস্টিক্সে নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হবে।

এই উদ্যোগ সফল করতে কৃষক, সমবায়, শিল্পপতি ও সরকারের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়চুক্তি, ন্যায্য মূল্য, গুণমানের মানদণ্ড এবং নির্ভরযোগ্য সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কারখানা স্থাপনের আগে উৎপাদন খরচ, স্টার্চের পরিমাণ, জল-বিদ্যুৎ, পরিবহণ এবং বাজারদর নিয়ে পূর্ণাঙ্গ আর্থিক সমীক্ষাও জরুরি।

আলু চাষিকে বাঁচানোর পথ তাই শুধু বেশি আলু উৎপাদনে নয়, আলুর প্রতিটি অংশ থেকে সর্বাধিক অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করার মধ্যে। আজকের অতিরিক্ত আলুই আগামী দিনে স্টার্চ, খাদ্যপণ্য, শিল্পের কাঁচামাল, জৈব-জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব উপাদানে পরিণত হয়ে পশ্চিমবঙ্গে নতুন শিল্প, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের পথ খুলে দিতে পারে।

Loading