সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: মাঠজুড়ে বেড়ে উঠছে আমন ধান। কিছুদিন পরেই ধানের শীষে দানা বাঁধার পালা। আর এই সময়েই বাংলার গ্রামীণ কৃষিজীবনে বিশেষ গুরুত্ব নিয়ে আসে আশ্বিন সংক্রান্তি, যা বহু এলাকায় নল সংক্রান্তি নামে পরিচিত। কৃষকের বিশ্বাস, এই বিশেষ দিনে প্রাচীন রীতি মেনে নল পুঁতে পুজো করলে ধানগাছের মঙ্গল হয়, ফসল থাকে সুরক্ষিত এবং শস্যে ভরে ওঠে গোলা। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্কের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে এই লোকজ উৎসব।
নল সংক্রান্তির অন্যতম প্রধান আচার হল ধানক্ষেতে নল পোঁতা। এই রীতির জন্য আগের দিন নলখাগড়া বা বুনো নলগাছ সংগ্রহ করে জলাশয়ে ভিজিয়ে রাখা হয়। সংক্রান্তির সকালে সেই নল তুলে পরিষ্কার করা হয়। এরপর বিভিন্ন গাছের কাণ্ড, ফল ও মূল দিয়ে তৈরি করা হয় বিশেষ পুজোর উপকরণ। মানকচু, গিরি বা প্যাটারি ফল, তাল আঁটি, বেলকুঁড়ি, বিচুটি, কাঁটানটে, কালো আকন্দ, অপরাজিতা, আপাং ও হলুদের মতো উপাদান এতে ব্যবহার করা হয়। সঙ্গে থাকে গরুর দুধ, সর্ষে এবং পুরীর মহাপ্রসাদ।
প্রস্তুত উপকরণ বেলকুঁড়ি গাছের পাতায় রেখে নলগাছের সরু পাতা দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়। এরপর গোবর সার রাখার স্থানে নলটি পুঁতে পুজোর ব্যবস্থা করা হয়। পুরোহিতের পুজো ও প্রার্থনা শেষে সেই নল ধানক্ষেতের চার কোণে অথবা ক্ষেতের মাঝখানে পুঁতে দেওয়া হয়। অঞ্চলভেদে এই আচার পালনের পদ্ধতিতে কিছু পার্থক্য দেখা যায়।
কৃষিজীবী মানুষের বিশ্বাস, আমন ধানের শীষ বেরোনোর আগে এই সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধানগাছের এই পর্যায়কে ঘিরেই নল সংক্রান্তির বিশেষ তাৎপর্য। ঝড়-বৃষ্টি, প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে ফসলকে রক্ষা করা এবং ধানের শীষে পর্যাপ্ত দানা পাওয়ার কামনায় এই পুজো করা হয়। অনেকের কাছে এটি মা লক্ষ্মীর সাধভক্ষণের প্রতীক। অর্থাৎ, ধানগাছের সুস্থ বৃদ্ধি ও ভবিষ্যতের ভালো ফলনের জন্য প্রার্থনা জানান কৃষক পরিবারগুলি।
নল সংক্রান্তির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আরও বেশ কিছু প্রাচীন পারিবারিক রীতি। কোনও কোনও অঞ্চলে সকালে নিমপাতা ও কাঁচা হলুদ বাটা দিয়ে স্নান করার প্রথা রয়েছে। আবার কোথাও নিম-বেগুন কিংবা অন্য তিতো পদ খাওয়ার চল দেখা যায়। আশ্বিন মাসের শেষ রাতে রান্না করে কার্তিক মাসের প্রথম দিনে সেই খাবার খাওয়ার রীতিও কিছু এলাকায় প্রচলিত। চালভাজা ও পান্তা খাওয়ার মতো খাদ্যাভ্যাসও এই সময়ের লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত।
সন্ধ্যায় তুলসীতলায় কিংবা ক্ষেতের আলের কাছে প্রদীপ জ্বালিয়ে সংসারের শান্তি, পরিবারের সুস্থতা ও ফসলের সমৃদ্ধি কামনা করেন অনেকে। এই সমস্ত আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে গ্রামীণ সমাজে বেঁচে রয়েছে বাংলার নিজস্ব লোকবিশ্বাস ও কৃষিভিত্তিক ঐতিহ্য।
সময়ের পরিবর্তনে কৃষিকাজের পদ্ধতি বদলেছে, বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রাও। আধুনিকতার প্রভাবে বহু প্রাচীন লোকাচার ক্রমশ হারিয়ে যাওয়ার পথে। তবুও গ্রামবাংলার বিভিন্ন প্রান্তে নল সংক্রান্তির মতো উৎসব আজও পালন করা হয় নিষ্ঠার সঙ্গে।
নল সংক্রান্তি শুধুমাত্র ধর্মীয় আচার নয়, এটি বাংলার কৃষিসভ্যতা ও প্রকৃতিনির্ভর জীবনযাপনের এক গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়। মাঠের ফসলকে ঘিরে কৃষকের আশা, বিশ্বাস এবং ভালো থাকার প্রার্থনা মিলেমিশে রয়েছে এই উৎসবে। ধানগাছের সুস্থ বৃদ্ধি থেকে শুরু করে গোলাভরা শস্যের স্বপ্ন—সবকিছুকে সঙ্গী করেই আজও বাংলার লোকসংস্কৃতিতে নিজের জায়গা ধরে রেখেছে নল সংক্রান্তি।


![]()

More Stories
রোজ ভ্যালির আমানত ফেরাতে তৎপরতা, ছ’মাসে ৪৯২.৫২ কোটি টাকা বিলির পরিকল্পনা
উৎসবের আগে বড় ঘোষণা, ২১টি বন্ধ চা বাগানের শ্রমিকদের জন্য আর্থিক সহায়তা
যাদবপুরে সিপিআই(এম)-এর বুক স্টল ঘিরে উৎসাহ, উদ্বোধনে বিমান বসু-সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা