February 4, 2026

লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যু: রহস্য, দেশপ্রেম আর এক অমোঘ নীরবতা

সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ ভারতের ইতিহাসে এমন এক প্রধানমন্ত্রী, যাঁর জীবন ছিল সাদামাটা, অথচ মৃত্যু ঘিরে আজও ঘনীভূত রহস্য—লাল বাহাদুর শাস্ত্রী। স্বাধীন ভারতের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী, যিনি “জয় জওয়ান, জয় কিষাণ” ধ্বনিতে দেশকে এক অদম্য আত্মবিশ্বাসে ভরিয়ে দিয়েছিলেন, তিনিই শেষ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেন এমন পরিস্থিতিতে, যা আজও নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়।

শাস্ত্রীজীর সাদাসিধে জীবন ছিল ভারতীয় রাজনীতির এক অনন্য অধ্যায়। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন আর্থিক অসুবিধার জন্য তিনি ব্যাংক থেকে মাত্র পাঁচ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। মৃত্যুর পর সেই ঋণ তাঁর স্ত্রী ললিতা দেবী পরিশোধ করেন নিজের পেনশন থেকে—কারণ প্রধানমন্ত্রী শাস্ত্রীজি একটাকাও সঞ্চয় রেখে যাননি। আজ যখন এক গ্রামের প্রধানের সম্পত্তিও কোটি ছাড়ায়, তখন শাস্ত্রীজির নিঃস্বতার ইতিহাস চমকে দেয়।

নেহেরুর মৃত্যুর পর যখন তিনি দেশের দায়িত্ব নেন, তখন ভারত ছিল উত্তাল—চীন যুদ্ধের ক্ষত এখনো তাজা, পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘর্ষ অনিবার্য। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে তাঁর দৃঢ় নেতৃত্বে দেশ জয়লাভ করে। তারপরই ১৯৬৬ সালে তিনি যান তাসখন্দে, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আয়ুব খানের সঙ্গে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করতে।

কিন্তু চুক্তির কয়েক ঘণ্টা পরেই—রাতের নৈশ আহার শেষে, অভ্যাসমতো এক গ্লাস দুধ খাওয়ার পর—তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সরকারি ঘোষণা ছিল হার্ট অ্যাটাক। কিন্তু তারপর থেকে শুরু হয় একের পর এক অস্বাভাবিক ঘটনা—

  • তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক, যিনি শাস্ত্রীজির মৃত্যুর প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন, সংসদীয় তদন্ত কমিটিতে সাক্ষ্য দিতে যাওয়ার পথে ট্রাক দুর্ঘটনায় মারা যান।
  • চিকিৎসকের দুই সন্তানও রহস্যজনকভাবে মারা যান কয়েকদিনের মধ্যেই।
  • শাস্ত্রীজির পরিচারক রামনাথ দুর্ঘটনায় আহত হন এবং স্মৃতিশক্তি হারান।
  • এমনকি যিনি তাঁকে শেষবার খাবার পরিবেশন করেছিলেন, তিনিও অদৃশ্য হয়ে যান

সেই রাতে তাঁর ঘরের ফোন বিকল ছিল, এবং তিনি যে ফ্লাস্কে দুধ পান করেছিলেন, সেটিও কখনো আর উদ্ধার করা যায়নি। সবচেয়ে বিস্ময়কর—একজন রাষ্ট্রনেতার অস্বাভাবিক মৃত্যুর পরও পোস্টমর্টেম হয়নি তাঁর দেহের।

মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে শাস্ত্রীজি দেশে ফোন করে বলেছিলেন, “এমন এক খবর দেব, যাতে সারা ভারত চমকে যাবে—দেশের ইতিহাসই বদলে যাবে।”

অনেকে বিশ্বাস করেন, তিনি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জীবিত থাকার সূত্র পেয়েছিলেন রাশিয়ায়, এবং সেই খবরই জানাতে চেয়েছিলেন দেশবাসীকে। তাসখন্দ যাওয়ার আগে তিনি নেতাজি তদন্ত কমিটিও গঠন করেছিলেন।

যখন তাঁর দেহ দেশে ফেরে, পরিবার দেখেছিল মাথায় ক্ষতচিহ্ন, ঠোঁটে ও শরীরে বিষপ্রয়োগের দাগ। স্ত্রী ললিতা দেবী তাঁর ছেলে অনিল শাস্ত্রীকে ফিসফিস করে বলেছিলেন—“এটা স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, এটা খুন।”

রাশিয়ার কিছু গোয়েন্দা তথ্যও পরবর্তীতে ইঙ্গিত দেয়, এটি সত্যিই “একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড” ছিল।

লাল বাহাদুর শাস্ত্রী বেঁচে থাকলে হয়তো ভারতের প্রশাসন ও রাজনীতির চেহারা অন্যরকম হতো। দুর্নীতি রোধে তাঁর কঠোর মনোভাব ও স্বচ্ছ চরিত্র আজও বিরল উদাহরণ। তাঁর মৃত্যু শুধু এক নেতার অবসান নয়, বরং এক সম্ভাব্য স্বচ্ছ ভারতের স্বপ্নের মৃত্যু।

তাসখন্দের সেই নীরব রাত্রি আজও ইতিহাসের বুক চিরে প্রশ্ন তোলে—
ভারতের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী কি সত্যিই হার্ট অ্যাটাকে মারা গিয়েছিলেন, নাকি তিনি খুন হয়েছিলেন?

Loading