November 30, 2025

Oplus_16908288

বাংলাদেশের মাটি থেকে উঠে আসা হ্যানিম্যানের উত্তরসূরি — ডা. রবিন বর্মন

ক্লাসিক্যাল হোমিওপ্যাথির আদর্শে অটল, মেধা, মনন ও মানবিকতার এক বিরল সংমিশ্রণ

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ; দেশভাগের ইতিহাস শুধু বিভেদের নয়, তার ভেতর দিয়ে গড়ে উঠেছে বহু মানুষের সংগ্রামী জীবনগাথা। তেমনই এক অনন্য জীবনকথা ডা. রবিন বর্মনের — যিনি আজ ভারতের হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। সাতক্ষীরার মাটিতে জন্ম, কিন্তু কর্মক্ষেত্র কলকাতায়; দুই বাংলারই মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধা করেন একজন বিশিষ্ট ক্লাসিক্যাল হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক ও শিক্ষক হিসেবে। ১৯৬৬ সাল। দেশভাগের অশান্ত সময়ে বাবা-মায়ের হাত ধরে বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাড়ি দেন ছোট্ট রবীন্দ্রনাথ বর্মন। পশ্চিমবঙ্গের বসন্তী থানার এক সাধারণ গ্রামে নতুনভাবে গড়ে ওঠে তাঁদের সংসার। আজকের স্বনামধন্য চিকিৎসক তখন কেবল এক স্কুলছাত্র — কিন্তু জেদ ছিল, নিজের পরিশ্রমেই জীবনকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে হবে। সেই রবীন্দ্রনাথই আজ সবার কাছে পরিচিত ডা. রবিন বর্মন নামে — একাগ্রতা, অধ্যবসায় ও গবেষণার প্রতীক হিসেবে। ১৯৮১ সালে হোমিওপ্যাথি পরীক্ষায় আশি শতাংশ নম্বর পেয়ে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হন রবিনবাবু। ১৯৮৬ সালে প্রিন্সিপাল তুষার কমল বসুর কাছ থেকে গোল্ড মেডেল লাভ করেন। তাঁর একাডেমিক দক্ষতা এতটাই অসাধারণ ছিল যে, এমবিবিএস ছাত্রদের এনাটমি পর্যন্ত পড়িয়েছেন তিনি। এক সময় আর জি কর মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা রবিনবাবুর ক্লাস করার জন্য কলেজে ভাঙচুর করেছিলেন — কারণ তাঁর ক্লাসেই তারা প্রকৃত শিক্ষা ও প্রেরণা খুঁজে পেত। রবিনবাবু ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হোমিওপ্যাথি কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। ক্লাসিক্যাল হোমিওপ্যাথি নিয়ে তিনি একটি বই লিখছেন কিছুদিনের মধ্যেই সেই বই প্রকাশ হবে। তিনি ওঠাবসা করতেন প্রখ্যাত চিকিৎসক ডা. জ্ঞান মজুমদার, ডা. ভোলানাথ চক্রবর্তী, ডা. জে.এন. কাঞ্জিলাল, ডা. বিশ্বনাথ সেনগুপ্ত ও ডা. এস.পি. দে-র সঙ্গে। বিশেষত ডা. এস.পি. দে তাঁর জীবনের প্রধান অনুপ্রেরণা — তাঁর কাছেই ক্লাসিক্যাল হোমিওপ্যাথির মর্ম বুঝে নেন রবিনবাবু। সেই থেকেই তাঁর চিকিৎসা দর্শন দাঁড়ায় এক মজবুত ভিত্তির উপর — “চিকিৎসা মানে শুধু ওষুধ নয়, রোগীর মনের দিকটিও বোঝা। ”আজ হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী তাঁর কাছে হোমিওপ্যাথির পাঠ নিচ্ছেন,তাঁদের মধ্যে বিভাস বৈরাগী, বিদেশ সরকার, রুমা প্রমুখ তাঁর প্রিয় ছাত্র। তিনি বিশ্বাস করেন, “হোমিওপ্যাথি শুধু ইনস্টিটিউশনাল শিক্ষার্থীদের সম্পত্তি নয়। নন-ইনস্টিটিউশনাল প্র্যাকটিশনারদের মধ্যেও অগাধ জ্ঞান থাকে। ”তিনি উদাহরণ দেন — ইতিহাসের, প্রখ্যাত চিকিৎসক ডা. নীলমণি ঘটক এবং হ্যানিম্যানের প্রিয় ছাত্র বনিং হোসেন — দুজনেই ছিলেন নন-ইনস্টিটিউশনাল, অথচ অসামান্য চিকিৎসক। ডা. রবিন বর্মনের চিকিৎসা দর্শনের মূল ভিত্তি জার্মান চিকিৎসক স্যামুয়েল হ্যানিম্যানের তত্ত্ব। তাঁর মতে, হ্যানিম্যানের আবিষ্কৃত ‘মায়াজম’ তত্ত্ব আজও সমান প্রাসঙ্গিক। রবিনবাবু বলেন, “হ্যানিম্যান বুঝেছিলেন যে সিফিলিস ও গনোরিয়ার মতো রোগ দমন করার ফলে শরীরে জমে থাকা দূষিত পদার্থ নতুন রোগ সৃষ্টি করে। এই দূষিত পদার্থই মায়াজম। যদি মায়াজম ঠিকভাবে বোঝা যায়, তাহলে ওষুধ নির্বাচনে ভুল হয় না।”তিনি ছাত্রদের শেখান ‘ল অফ সিমিলিয়া’, ‘ল অফ সিম্প্লেক্স’ ও ‘ল অফ মিনিমাম’— ক্লাসিকাল হোমিওপ্যাথির তিনটি শাশ্বত সূত্র। নিজের ফার্মেসিতে তিনি অনেক সময় নিজেই সূক্ষ্ম মাত্রায় ওষুধ তৈরি করেন, যাতে প্রতিটি ডোজ প্রাকৃতিকভাবে কার্যকর হয়। বর্তমান সময়ে বহু চিকিৎসক হোমিওপ্যাথি নামের আড়ালে একাধিক ওষুধ মিশিয়ে ব্যবহার করছেন। একে তিনি বলেন “পোলি-ফার্মেসির বিপজ্জনক প্রবণতা। ”তাঁর বক্তব্য,“এভাবে অনেক ওষুধ মিশিয়ে দেওয়া হোমিওপ্যাথির মূল দর্শনকে বিকৃত করে। হয়তো সাময়িক উপকার হয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা ক্ষতিকারক।”তাঁর মতে, হোমিওপ্যাথি ও এলোপ্যাথি একে অপরের পরিপূরক— “যখন হঠাৎ করে প্রেসার বা সুগার বেড়ে যায়, তখন এলোপ্যাথি প্রয়োগ করতেই হবে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি রোগ, ইমিউনোলজিক্যাল ডিসঅর্ডার বা ক্রনিক অসুখের ক্ষেত্রে হোমিওপ্যাথিই শ্রেষ্ঠ। ”ডা. রবিন বর্মন বিশ্বাস করেন, সরকারের উচিত বড় হসপিটাল ও আইসিইউ-তে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার প্রয়োগের সুযোগ দেওয়া। তিনি বলেন “করোনার সময় হোমিওপ্যাথিকে সামনে আনা হয়েছিল। ভবিষ্যতে এই শাখায় আরও গবেষণা প্রয়োজন। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মাধ্যমে নতুন ওষুধ বের করা দরকার।”তাঁর মতে, হোমিওপ্যাথি কোনো প্রাচীন ধারা নয়, এটি আজও বিকাশমান বিজ্ঞান। “লক্ষণ লিপিবদ্ধ করা বই ‘মেটেরিয়া মেডিকা’ এখনো চিকিৎসার ভিত্তি। ”জন্মভূমির টান আজও গভীর। সাতক্ষীরার শস্যশ্যামলা মাটি, মানুষের সরলতা তাঁকে আজও টানে। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের মানুষ আজও খুব আন্তরিক, সেই দেশের টান আমার রক্তে আছে। কয়েকবার গিয়েছি, ভবিষ্যতে আরও যাওয়ার ইচ্ছা আছে।”বর্তমান SIR চালু পরিস্থিতি প্রসঙ্গে প্রশ্নে তিনি বলেন,“এই বাছাই প্রক্রিয়াতে কারোর দ্বিধা থাকার কথা নয়। এতে দুধ-জল আলাদা হবে। যারা দ্বিধা করছে, তাদের নিশ্চয়ই কিছু সমস্যা আছে।”আজ তিনি শুধু একজন চিকিৎসক নন, এক আদর্শ শিক্ষাগুরু ও মানবপ্রেমিক। তাঁর জীবন প্রমাণ করে, অধ্যবসায় ও আদর্শে অবিচল থাকলে কিছুই অসম্ভব নয়। ডা. রবিন বর্মনের কথায়— “চিকিৎসা মানে শুধু রোগ সারানো নয়, রোগীর মন বোঝা। শরীর ও মনের সম্পর্কটাই চিকিৎসার আসল সূত্র।”বাংলাদেশের মাটিতে জন্ম, ভারতের মাটিতে কর্ম(কলকাতা,বেলঘরিয়া) — দুই দেশের মানুষ আজ একবাক্যে বলেন,“ডা. রবিন বর্মন হ্যানিম্যানের আদর্শে জন্মানো এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা।”

Loading