November 30, 2025

কার্তিক শুক্লপক্ষ পূর্ণিমাতিথি , শ্রীরাস পূর্ণিমা

সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ
আসুন রাসলীলা সম্পর্কে একটু জানার চেষ্টা করি!
রাসলীলা কেন ও কিভাবে হয়েছিল এবং কাদের সাথে রাস লীলা হয়েছিল?
সর্বেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তার বিভূতি শ্রীমতি রাধারাণী সহিত গোপীকাগণ কে নিয়ে বৃন্দাবনের রাসমন্ডলে মহারাস লীলা করেন।
ঈশ্বরের সাথে আত্মার মহামিলনই রাস। আরো বিশেষ ভাবে বলতে গেলে ভক্ত ও ভগবানের মিলন শ্রীকৃষ্ণ যখন এ জগতে আবির্ভুত হয়ে ভৌম বৃন্দাবনে দিব্যলীলা বিলাস করছিলেন শ্রীকৃষ্ণের বয়স যখন আট বছর তখন কৃষ্ণ শরৎপুর্ণিমার রাতে বৃন্দাবনের কুঞ্জে মধ্যরাতে তাঁর অপ্রাকৃত বংশীধ্বনি দ্বারা তাঁর অন্তরঙ্গ ভক্ত গোপীদের আহ্বান করে ছিলেন তখন সেই রাতে শ্রীকৃষ্ণের বংশীধ্বনি শ্রবণ করে ব্রজগোপীরা গৃহ থেকে বরিয়ে কৃষ্ণের কাছে ছুঁটে এসেছিল কেবল বৃন্দাবনের গোপীরাই নয় ব্রহ্মান্ডের বিভিন্ন স্থান থেকে ভগবানের শুদ্ধ ভক্তরা যারা ভগবানকে পতিরুপে তাঁর সাথে লীলা বিলাস করতে চেয়েছিলেন সকলেই ছুটে এসেছিলেন নিত্যসিদ্ধ এবং সাধনসিদ্ধ সকলকে তিনি সেদিন আহ্বান করেছিলেন তখন শ্রীকৃষ্ণ সেসকল গোপীদের সাথে নিজেকে যতসংখ্যক গোপী ততসংখ্যক বিস্তার করে সকলের সাথে নৃত্য করেছিলেন বৃন্দাবনের সেই নৃত্যই রাসনৃত্য বলে সুপরিচিত ‘রাস’ শব্দটি এসেছে ‘রস’ থেকে সর্বশ্রেষ্ঠ রস হচ্ছে মাধুর্য রস মাধুর্যরসে কৃষ্ণ এই লীলা করেছিলেন বলে তা রাসলীলা। এটা ভগবানের সবচেয়ে উন্নত ও শ্রেষ্ঠ লীলা এবং চিন্ময় স্তরের সর্বোচ্চ উপলব্ধি রাসলীলায় ছিলেন তিন শ্রেণির গোপী, নিত্যসিদ্ধা, সাধনসিদ্ধা, কৃপাসিদ্ধা, নিত্যসিদ্ধা ও গোপীরা শ্রীকৃষ্ণের নিত্য পার্ষদ তারা কখনোই এ জগতের বন্ধনে আবদ্ধ নয় তারা সর্বদাই পরম শুদ্ধ এবং শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গেই থাকেন। সাধনসিদ্ধা বলতে যারা সাধনা করে শুদ্ধ হয়েছেন যেমন ত্রেতাযুগে ভগবান রামচন্দ্র যখন শ্রীমতি সীতাঠাকুরাণীকে নিয়ে দন্ডকারণ্যের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন ভগবান রামচন্দের সেই রুপ মাধুরিমা দর্শন করে দন্ডকারণ্যের ঋষিরা যারা লক্ষ লক্ষ বছর ধরে ধ্যান করছিলেন তাঁরা ভগবানকে পতিরুপে পেতে চেয়েছিলেন ভগবান রামচন্দ্র তাঁদের বলেছিলেন আমি যখন দ্বাপরের শেষে কৃষ্ণরুপে লীলা করতে আসবে তখন তোমাদের সকল বাঞ্ছা পুর্ণ করব তাই তাঁরা রাসলীলাতে অংশগ্রহণ করেছিলেন আরো ছিলেন দেবকন্যা ঋষিকন্যা, গান্ধর্বকন্যা গণ তাঁরা জড় দেহধারী স্বামীগণ যাদের নিয়ন্তা বা স্বামীও হচ্ছেন কৃষ্ণ বা জগন্নাথ তাদের পরিত্যাগ করে নিত্য পতি বা নিত্য স্বামী, চিন্ময় দেহধারী কৃষ্ণের প্রতি শরণাগত হয়েছেন আরেক শ্রেণির গোপী যারা তখনো ততটা শুদ্ধ হয়ে ওঠেনি, তাদের গৃহে বন্দি করে রাখা হয়েছিল কৃষ্ণ বিরহের অগ্নিতে তাদের সমস্ত পাপরাশি দগ্ধ হয় এবং বিরহ জ্বালায় ছটফট করতে করতে সেখানেই প্রাণত্যাগ করেন। কিন্ত কৃষ্ণচিন্তা করতে করতে তাদের প্রাণত্যাগ হয়েছিল বলে তারা শ্রীকৃষ্ণের কৃপায় তৎক্ষণাৎ তাঁরই মতো চিন্ময় দেহ প্রাপ্ত হন। তখন তারা অপ্রাকৃত দেহে মনের গতিতে শ্রীকৃষ্ণের কাছে ছুটে যান তারা পিতৃধর্ম মাতৃধর্ম পতিব্রতা ধর্ম ইত্যাদি সবরকম জড় ধর্ম পরিত্যাগ করে একমাত্র শ্রীকৃষ্ণের শরণাগত হয়েছিলেন তাঁদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল, ব্যক্তিগত সুখ সুবিধা বিবেচনা না করে সর্বতোভাবে শ্রীকৃষ্ণেকে সুখী করা পরমেশ্বর ভগবানের সন্তুষ্টি বিধানের জন্য তারা সর্বতোভাবে নিজেদের উৎসর্গ করেছিলেন তাই ব্রজগোপীকারা হলেন ভগবানের সর্বশ্রেষ্ঠ ভক্ত এবং শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় বর্ণিত সর্বধর্মান্ পরিত্যাজ্য মামেকং শরণং ব্রজ (১৮/৬৬) শ্লোকের মুর্ত প্রতীক।।
ব্রজের নির্মল রাগ শুনি ভক্তগন, রাগ মার্গে ভজে যেন ছাড়ি ধর্ম কর্ম। আমার করুনাময় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের লীলার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ লীলা হলো শ্রীরাসলীলা। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গোপাল যখন ৮ বছরের ছিলেন, তখন তিনি শ্রীরাসলীলা করেছিলেন। তিনি তিন রকমের ব্রজসখীদের নিয়ে রাসলীলা করেছেন। যেমনঃ সাধনসিদ্ধা, কৃপাসিদ্ধা, নিত্যসিদ্ধা ব্রজগোপী। যেই লীলা দর্শনে নিখীলো জগতের সমস্ত দেব-দেবী দর্শন করতে মনোবাঞ্ছা করেছিলেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শরৎকালীন প্রস্ফুটিত-মল্লিকা-কুসুম-শোভিত সেই রজনী সমাগত দেখিয়া যোগমায়া শক্তিকে আশ্রয় করতঃ ক্রীড়া করিতে ইচ্ছা করিলেন। তখন বহুকাল পরে আগত পতি যেমন প্রিয়ার মুখমন্ডল কুন্কুমরন্জিত করিয়া থাকেন, সেইরুপ নক্ষত্রপতি চন্দ্রদেবও তখন পরম সুখকর কিরন দ্বারা বদন অরুনিত করিয়া উদ্ভাশিত করলেন। আজ আমার প্রান গোবিন্দের বদন শোভা যেনো কারো সাথে তুলনা করা যায় না, তার তুলনা তিনি নিজেই। আমার শ্রীমন্ মহাপ্রভু তিনি নিজেই নিজের সেই রাসমাধুর্য বর্ণনায় বলেছেন—
“কৃষ্ণাঙ্গ লাবণ্যপুর, মধু হইতে সুমধুর
তার মাঝে মুখ সুধাকর।
মধু হইতে সুমধুর, তাহা হইতে সুমধুর,
তার মাঝে স্মিত জোছনাভর।।
ভগবান গোপালের সর্বাঙ্গ লাবণ্যের খনি। সমস্ত অঙ্গের লাবন্যরাশি শ্রীবদনে ঘনীভূত। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গৃহিতচিও ব্রজগোপীগন সেই কামোদ্দীপক গীত শ্রবন করিয়া একে অপরের গমনের উদ্যোগ লক্ষ্য না করিয়াই প্রিয় যেখানে ছিলেন তথায় গমন করলেন। কোন গোপী চুল্লীর উপর দুগ্ধ চাপাইয়া, কেউ শিশুদিগকে দুগ্ধপান, কেউ পতির শুশ্রূষা, কেউ ভোজন, কেউ অঙ্গরাগ, গার্ত্রমর্জন ও নয়নে অন্জন প্রদান করিতেছিলেন। তাহার ঐসব কার্য পরিত্যাগ করিয়া জগত পতির কাছে গেলেন। সবাই বাঁশির সুরে আত্নহারা হয়ে যেনো বিপরীতভাবে পরিধান করিয়াই ভগবানের কাছে গেলেন। কোনো গোপী কৃষ্ণচিন্তামগ্ন, গৃহের কর্ম ছাড়িয়া অসমর্থা হইয়া চক্ষু মুদ্রিত করিয়া ভগবানের ধ্যান করতে লাগলেন। প্রিয়তমের দুঃসহ বিরহজনিত তীব্রতাপে সেই গোপীদের সকল অশুভ ক্ষয়প্রাপ্ত হইল। সেই রাস মন্ডল এত সাজানো গুছানো এবং উজ্জ্বল ছিলো যে, সকল ব্রহ্মান্ডের চেয়ে কোটিগুন মাধুর্যমন্ডিত শোভা বেশী। যাহা স্বয়ং প্রজাপতিদেব ব্রহ্মা বর্ননা করতে পারেনি। যেখানে কামদেব বা মদন প্রবেশ করতে পারেনি। সবাই মনে রাখবেন শ্রীভগবানের এই সর্বশ্রেষ্ঠ লীলা স্বরুপ রাসলীলা নিয়ে কিছু ভন্ড, অসাধু অমানুষ ব্যাক্তিবর্গরা বিপরীত ভাবে বা অপব্যখ্যা করেন। যাহা সম্পূর্ন ভাবে মূর্খতা ও মহা মহা অপরাধ। এই রাসলীলা নিয়ে যদি কেউ ভ্রান্তধারনা বা অপব্যখ্যা করেন, জীবনে যাটুকু ভালোকাজের জন্য পূর্ণ্য করেছেন, তৎক্ষনাৎ বিনষ্ট হয়ে মহাপাপ জন্মাবে। কেউ যদি কথার ছলে রাসলীলা নিয়ে টিটকারী মূলক কথা বলেন, তার পূর্ব্ব জন্মের সুকৃতি নষ্ট হয়ে যায়।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কামের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা মদন কে উচিৎ শিক্ষা দিয়েছেন, বা ভগবান জয় করেছেন কামকে। কামের উন্মদনায় দেবরাজ ইন্দ্র, সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা, মহাদেব, চন্দ্র, সকলেই হার মানিয়েছে। তাই কামদেব সে ত্রিলোক বিজয়ে অহংকারে গর্বে গর্বান্বিত। কন্দর্প একবার হরকোপানলে দগ্ধীভূত হইয়াছিল। তবুও সে মনে করে, হর মানে মহাদেব কামদেবকে পরাস্ত করতে পারেন নাই। তাই কামদেব এইনিয়ে ভীষন অহংকার করত। তাই মদন বা কামদেব আস্ফালন বাড়িয়া গিয়াছে, সে রাসমন্ডলে গোপীপরিবৃত ভগবান শ্রী গোবিন্দ তাহার সকল গর্ব চূর্ণ বিচুর্ণ করিয়া দিয়েছেন। মদনের মনে ইচ্ছা ছিল শ্রীহরিকে পাইলে একবার দেখিতাম, পঞ্চ শর দ্বারা তাঁহাকেও পরাভূত করতে পারি কিনা। আমরা ত্রেতা যুগে স্বরন করলে দেখা যায় যে, ভগবান রামচন্দ্র যখন সীতা হারাইয়া কাঁদিতেছেন, তখন মদনের মনে হয়েছিলো তিনি বোধহয় স্ত্রী বশ হইবেন। আসলে তাহা মদনের ভূল ধারনা। কিন্তু মোহানী শূপর্ণখা ভগবান রামচন্দ্রকে বিচলিত করিতে পারে নাই। তদ্রুপ বাল্যরসবিলাসীর উপর মদনের আধিপত্য চলেনা। যেদিন কাত্যায়নী ব্রত পরায়না গোপকুমারী গনের লইয়া কদম্ববৃক্ষে আরোহন করিলেন,সেই দিনও নানা হাস্য পরিহাস করতঃ তাহাদের বসন বস্র প্রত্যর্পন করিলেন। মদন বা কামদেব কিছুই করতে পারেনাই। তৎপর ব্রাহ্মন পত্নীরা পতি ত্যাগ করিয়া যমুনার উপবনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সান্নিধ্যে আসিয়াছিলেন এবং জীবন যৌবন সমর্পনে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। কিন্তু ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ব্রাহ্মনীদিগকে স্ব স্ব পতির নিকট পাঠালেন। মদন বা কামদেব তাহার কোনো প্রভাব পরীক্ষার সুযোগ পাইলেন না। বস্ত্র হরনের দিনে ব্রজগোপীগন কে বলেছিলেন, আগামী পূর্ণিমায় তোমাদের মনোরথ পূর্ণ হইবে। তাই সেই দিন, মহারাসের মহামিলনের দিন,শারদ-পূর্ণিমা। আজ মদনের সাথে ভগবানের যুদ্ধ হবে। এই যুদ্ধে ভগবান মদন বা কামদেবের সকল অহংকার দর্প চূর্ণ-বিচূর্ণ করিয়া দিয়েছেন।

Loading