আজ তাঁর জন্মদিনে তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে দেশবাসী। তাঁর সানাইয়ের সুর আজও ভারতীয় সংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ হিসেবে অনুরণিত হয়।
সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ আজ ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, কিংবদন্তি সানাই বাদক উস্তাদ বিসমিল্লাহ খান-এর জন্মদিন। ১৯১৬ সালের ২১শে মার্চ ডুমরাঁও-এ জন্মগ্রহণ করেন তিনি। শৈশব থেকেই সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগ তাঁকে নিয়ে যায় বারাণসীতে, যেখানে তিনি গুরু আলী বক্স ‘ভিলায়াতু’-র কাছে সানাই শেখেন।
উস্তাদ বিসমিল্লাহ খান সানাইকে শুধুমাত্র বিয়ে বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের যন্ত্রের গণ্ডি থেকে বের করে এনে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের মঞ্চে প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর সানাইয়ের সুরে মুগ্ধ হয়েছিল গোটা দেশ তথা বিশ্ব। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার প্রভাতে লাল কেল্লা থেকে তাঁর সানাই পরিবেশন এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত হয়ে রয়েছে।
তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পান দেশের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ভারতরত্ন সহ পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ ও পদ্মবিভূষণ। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি সংগীতকে সাধনা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
সকাল বেলা গঙ্গাস্নান, দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, আর সন্ধ্যায় বালাজি মন্দিরের চাতালে সানাই রেওয়াজ—এই ছিল কিংবদন্তি সানাইবাদক উস্তাদ বিসমিল্লাহ্ খাঁ-র রোজকার জীবন। ধর্মের বেড়া পেরিয়ে সুরের ভিতর তিনি খুঁজেছিলেন মানুষের মিলনবিন্দু। তাই রাধাকৃষ্ণের লীলার রাগে ডুবে যেতে যেতে খাঁ সাহেব বলতেন, “বাজাতে বাজাতে মনটা আমার বৃন্দাবনে চলে যায়।”
পরিবেশনা তাঁর কাছে ছিল না শুধু শিল্পচর্চা; হয়ে উঠত মানবদর্শনের এক গভীর উপস্থাপনা। প্রতিটি অনুষ্ঠানের শেষে ‘রঘুপতি রাঘব রাজা রাম’ তাঁর সানাইয়ে ধ্বনিত হতো অবধারিতভাবে। আর বছরে একদিন—মহরমে—দাঁড়িয়ে বাজাতেন বিলাতগীতি নৌহা।
ব্রিটিশ ভারতে জন্ম, বালাজি মন্দিরে সানাই শিক্ষা
ব্রিটিশ ভারতের এক গোঁড়া মুসলিম পরিবারে জন্ম ‘কামরুদ্দিন’-এর। জন্মের সময় ঠাকুরদা বলে ওঠেন—“বিসমিল্লাহ!”—সেই থেকেই তাঁর নাম বিসমিল্লাহ্। মাত্র ছয় বছর বয়সে পাড়ি দেন বারাণসীতে। কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের সানাইবাদক মামা আলি বক্স ‘বিলায়েতু’ খাঁ-র কাছে শুরু হয় তাঁর সুরসাধনা।
মাত্র ১৪ বছর বয়সেই তিনি প্রথম মঞ্চে—‘ইলাহাবাদ মিউজিক কনফারেন্স’-এ। সেদিন থেকেই ভারতীয় সঙ্গীতমঞ্চে উজ্জ্বল হতে থাকে এক নতুন নক্ষত্র। তিনি ২০০১ সালে ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘ভারত রত্ন’ সহ পদ্মভূষণ ও পদ্মবিভূষণ পুরস্কারে ভূষিত হন।
শৈশব স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে তিনি প্রায়ই বলতেন—
“ভোরে গঙ্গায় স্নান করে মসজিদে নামাজ পড়তাম। তারপর বালাজি মন্দিরে গিয়ে সারাদিন সানাই বাজাতাম। কোনোদিন অসুবিধা হয়নি।”
সঙ্গীতই ছিল তাঁর একমাত্র পরিচয়—মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার এক সার্বজনীন শিক্ষা।
স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রজাতন্ত্র দিবসে সানাইয়ের সুর
১৯৫০ সালে স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রজাতন্ত্র দিবসে নেহেরু স্বয়ং অনুরোধ করলেন সানাই পরিবেশনের জন্য। প্রথমে দ্বিধা—“মহরম ছাড়া দাঁড়িয়ে সানাই বাজাই না”—কিন্তু নেহেরুর অনুরোধে রাজি হলেন। ভাবতে লাগলেন, কী সুর বাজাবেন!
তখনই মনে পড়ল বেনারসের ঘাটে মাঝিদের সুর। ঠিক করলেন, দেশের প্রাণের সুরই পৌঁছে দেবেন মানুষের কাছে।
রাজপথে সেদিন তাঁর সানাইয়ে বাজল—‘গঙ্গা দুয়ারে বানাইয়া বাজে’—দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষের মাটির টান যেন পৌঁছে গেল কোটি মানুষের হৃদয়ে।
শেষ যাত্রায় একুশ তোপধ্বনি
৯২ বছর বয়সে প্রয়াত হলেন উস্তাদ বিসমিল্লাহ্ খাঁ—ভারতীয় সঙ্গীতের এক যুগের অবসান। কেন্দ্রীয় সরকার ঘোষণা করেছিল একদিনের জাতীয় শোক। বারাণসীর ফতেহমান গোরস্থানে সমাধিস্থ করা হয় তাঁকে। ভারতীয় সেনা একুশ তোপধ্বনিতে জানায় শ্রদ্ধা। তাঁর প্রিয় এক সানাইকেও সমাধির পাশে শুইয়ে দেওয়া হয়েছিল।
বিসমিল্লাহ্ খাঁ নিজেই বলতেন—
“বিভিন্ন ঘরানা থেকে ফুল তুলে এনে আমার সানাইয়ে ভরে দিই। তৈরি হয় গুলদস্তা।”
সেই গুলদস্তার সুর আজও বাজে ভারতীয় সংস্কৃতির অন্তরে—ধর্ম-বর্ণ-ভাষা সকল ভেদাভেদ ছাপিয়ে।

![]()

More Stories
আন্তর্জাতিক অরণ্য দিবসে অরণ্য রক্ষায় শপথ নেওয়ার আহ্বান
দেশে সারের ঘাটতি মেটাতে আমদানি বাড়াল কেন্দ্র, ইউরিয়া আমদানি ৮৯ লক্ষ টন
গড়চিরোলিতে বড় সাফল্য, ১১ নকশালের আত্মসমর্পণ—৬৮ লক্ষ টাকার পুরস্কারমূল্য ছিল মাথায়