February 4, 2026

ওড়িশার মালকানগিরীতে ‘বাঙালীদের উপর আকস্মিক আক্রমণ’—এমন বিভ্রান্তিকর দাবি গত কয়েক দিনে সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে দ্রুত ছড়িয়েছে


দণ্ডকারণ্য থেকে মালকানগিরী—ইতিহাসের দীর্ঘ ছায়া

সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ ১৯৫৬ সালে দেশভাগের পর পশ্চিমবঙ্গ, পূর্ব পাকিস্তান ও ত্রিপুরা থেকে বিপুল সংখ্যায় বাঙালি শরণার্থী ভারতে আসেন। পশ্চিমবঙ্গের সীমিত পরিকাঠামো তাঁদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দিতে পারছিল না। কিন্তু তথ্যের গভীরে যাওয়া হলে দেখা যাবে , ঘটনাটি কোনো জাতিগত শত্রুতা বা একতরফা আক্রমণের গল্প নয়,
এই প্রেক্ষাপটে ভারত সরকার দণ্ডকারণ্য অঞ্চলে একটি বৃহৎ পুনর্বাসন প্রকল্প হাতে নেয়—যার পরিধি ছিল আজকের ওড়িশার মালকানগিরী থেকে ছত্তিশগড়ের কাঙ্কের পর্যন্ত প্রায় ৬৫,০০০ বর্গকিলোমিটার

দণ্ডকারণ্য (Dandakaranya) একটি বিশাল বনভূমি অঞ্চল যা ছত্তিশগড়, ওড়িশা, অন্ধ্র প্রদেশ ও তেলেঙ্গানা পর্যন্ত বিস্তৃত এবং মালকানগিরি (Malkangiri) হল ওড়িশা রাজ্যের একটি জেলা যা এই দণ্ডকারণ্য অঞ্চলের মধ্যেই অবস্থিত, বিশেষত দক্ষিণ ওড়িশার দিকে; ঐতিহাসিকভাবে দণ্ডকারণ্য প্রকল্পের অধীনে পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা বাঙালি উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের স্থান ছিল মালকানগিরি, আর বর্তমানে এটি মাওবাদী কার্যকলাপ এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার আন্দোলনের একটি কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে মাওবাদীরা এই অঞ্চলকে তাদের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে। 

বাঙালিদের পুনর্বাসনের জন্য বনভূমি পরিষ্কার করা হয়। প্রতিটি পরিবারকে ৬–৭ একর জমি দেওয়া হয়, পরে তা কমিয়ে ৩–৫ একরে আনা হয়। প্রথমে অস্থায়ী পাট্টা, পরে স্থায়ী করা হয়।

এই পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্যেই জন্ম নেয় মৌলিক দ্বন্দ্ব—
এলাকার আদিবাসী কোয়া, ভূমিয়া ও অন্যান্য সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে বনভূমি, নদী, পাহাড় ও প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকতেন।
জমি পুনর্বণ্টন ও বনসাফাই তাঁদের জীবনযাত্রাকে কঠোরভাবে প্রভাবিত করে। তাদের অভিযোগ ছিল—

  • ভূমির অধিকার সংকুচিত হয়েছে,
  • বন-নির্ভর জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে,
  • সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ায় আদিবাসীদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

এই ক্ষোভ সময়ের সঙ্গে বাড়তে বাড়তে আজও নানা কারণে বিস্ফোরণের মতো ফেটে পড়ে।

৪ ডিসেম্বরের হত্যাকাণ্ড: উত্তেজনার তাৎক্ষণিক কারণ

পোটেরু নদীর কাছে ৫১ বছর বয়সী কোয়া আদিবাসী বিধবা লেক পাদিয়ামির মাথাবিহীন দেহ উদ্ধার হওয়ার পরই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়।

পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে—
ঘটনাটি এক বাঙালি বর্গাচাষী সুকুমার মণ্ডল ও ওই আদিবাসী পরিবারের জমি-বিতর্ক থেকে দীর্ঘদিন ধরে চলা উত্তেজনার ফল।

  • আদিবাসী মহিলার স্বামী মারা যাওয়ার পর সুকুমার তাঁর জমিতে চাষ করতেন।
  • ছেলের প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর পরিবারটি জমি ফিরে নিতে চাইলে বিবাদ তীব্র হয়।
  • ১ ডিসেম্বর মহিলাটি মাঠে গিয়ে নিখোঁজ হন।
  • ৪ ডিসেম্বর তাঁর দেহ উদ্ধার হয়।

এ ঘটনাটি আদিবাসী সমাজের ক্ষোভকে বিস্ফোরণের মুখে এনে দাঁড় করায়।

হামলা, অগ্নিসংযোগ ও প্রশাসনের কঠোরতার সিদ্ধান্ত

৫ ডিসেম্বর প্রায় ৫,০০০ সশস্ত্র আদিবাসীর মিছিল এমভি–২৬ গ্রামে ঢোকে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই—

  • প্রায় এক ডজন বাড়ি আগুনে পুড়ে যায়,
  • ছোট দোকান–পাট ভাঙচুর হয়,
  • প্রায় ১০০টি বাঙালি পরিবারের সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হওয়ায় প্রশাসন ২৪ ঘণ্টার জন্য ইন্টারনেট বন্ধ করে।

এখন পর্যন্ত ৫ জন গ্রেফতার হলেও নিহত মহিলার মাথা পাওয়া যায়নি

এ প্রথম নয়—সংঘাতের ছায়া দীর্ঘদিনের

২০২১ সালেও এমভি–৯৩ গ্রামে বাঙালি বসতি ও ভূমিয়া আদিবাসীদের মধ্যে ৭৫ একর জমি নিয়ে সংঘর্ষ হয়েছিল।
সেই সময়ও বনজমি, চাষের অধিকার ও ভূমি ব্যবস্থাপনা ছিল কেন্দ্রীয় সমস্যা।

অর্থাৎ এটি কোনো হঠাৎ উত্তেজনা নয়—এলাকার ইতিহাসগত দ্বন্দ্বের ধারাবাহিক বিস্ফোরণ।

এই ঘটনার বিশ্লেষণে একটি বড় ভুল হয়—
ঘটনাটিকে “বাঙালি বনাম আদিবাসী” সংঘাত হিসাবে দেখা।

বাস্তবে—

  • বাঙালি পুনর্বাসিত পরিবারের দুরবস্থা আছে,
  • আদিবাসীদের দীর্ঘকালীন জমি–অধিকারহানি ও বঞ্চনার বাস্তবতাও আছে,
  • ব্যক্তিগত অপরাধও ঘটেছে,
  • সামাজিক ক্রোধও জমেছে।

সত্য হলো—
হিংসা কে প্রথম করেছে—এই প্রশ্নের উত্তর যতটা কঠিন, তার চেয়ে অনেক বেশি জরুরি হলো হিংসা বন্ধ করা।

মালকানগিরীর ঘটনাই আবার প্রমাণ করে—
রাষ্ট্র যখন পুনর্বাসন, উন্নয়ন বা জমি ব্যবস্থাপনা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, তখন যদি স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সমান গুরুত্ব না দেওয়া হয়, তার ফল একদিন না একদিন বিস্ফোরিত হবেই।

হিংসা কোনো পক্ষের জন্যই গ্রহণযোগ্য নয়।
কিন্তু এই কথাটাও সত্য—
যখন কোনো সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চনার শিকার হয়, তখন তার ক্ষোভও জটিল আকার নেয়।

তাই আমাদের মনে রাখতে হবে—
অত্যাচার, উচ্ছেদ, বঞ্চনা ও জমি লুণ্ঠনের আগুন একবার জ্বলে উঠলে তা কারও ঘরেই সীমাবদ্ধ থাকে না।

যে আগুন অন্যকে পোড়ায়,
একসময় সেই আগুন আর আলাদা করে দেখে না—
মানুষমাত্রই তার তাপে দগ্ধ হয়।

এই কারণেই প্রয়োজন—

  • তদন্তের স্বচ্ছতা,
  • পুনর্বাসন সমস্যার স্থায়ী সমাধান,
  • আদিবাসীর অধিকার নিশ্চিত করা,
  • এবং পুনর্বাসিত বাঙালি পরিবারগুলোর সুরক্ষা।

হিংসা নয়—সমাধান, সহমর্মিতা ও ন্যায়বিচারই এই অঞ্চলের ভবিষ্যত নির্মাণ করতে পারে।

Loading