February 4, 2026

পৌষ অমাবস্যা / আম্রবকুল অমাবস্যার কথা

আধ্যাত্মিক সাধনা ও কৃষিজ ঐতিহ্যের এক অনন্য মিলন

সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ দেখতে দেখতে আবার এসে পড়ল অমাবস্যা—মায়ের পুজোর দিন। কনকনে শীতের সঙ্গে পৌষ মাসের শুরুতেই এই বিশেষ তিথি বাঙালির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনে এক গভীর তাৎপর্য বহন করে। এই অমাবস্যা শুধু পৌষ অমাবস্যা নয়, এর আরেক নাম আম্রবকুল অমাবস্যা

নামের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে তার অর্থ। ‘আম্রবকুল’ অর্থাৎ আমের মুকুল। এই দিনে মায়ের পুজোয় আমের মুকুলের ছড়া ব্যবহৃত হয়। পূজা-পদ্ধতি অন্যান্য অমাবস্যার মতোই হলেও, এর অন্তর্নিহিত ভাবনা একেবারেই আলাদা ও গভীর।

তন্ত্র ও সাধনার ভাষায়, আমের মুকুল যেন সাধকের প্রতীক। একেবারে কুঁড়ি অবস্থায় যেমন আমের যাত্রা শুরু, তেমনই সাধকও সূচনায় থাকে অতি নরম ও সংবেদনশীল অবস্থায়। ঝড়-ঝাপটা, প্রতিকূলতা, কঠিন তপস্যা—সব সহ্য করেই ধীরে ধীরে পরিণতির দিকে এগোতে হয়। বৈশাখের প্রচণ্ড তাপেই যেমন আমের ফলন হয়, তেমনই কঠোর সাধনার মধ্য দিয়েই আসে সিদ্ধি। আর সেই সাধনার চূড়ান্ত ফল—জ্যৈষ্ঠ মাসের ফলহারিণী অমাবস্যায়—মায়ের চরণে নিবেদিত হয়। সাধকও তেমনি নিজের সমস্ত সাধনার ফল মায়ের পায়ে অর্পণ করেন। ভাবনাটি গভীর, অথচ অপরূপ সুন্দর।

এই দিনটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রূপ দেখা যায় শ্রীক্ষেত্র পুরীতে। পৌষ অমাবস্যায় কৃষকেরা আমের মুকুল, ক্ষীর গাঁথা ও মান্দা পিঠে সহযোগে প্রভু জগন্নাথকে ভোগ নিবেদন করেন। উদ্দেশ্য একটাই—আসন্ন আমের মরসুমে ভালো ফলন লাভ করা। শুধু তাই নয়, এই পূজার প্রসাদ আমগাছের গোড়ায় অর্পণ করা হয়, যেন প্রভুর কৃপায় প্রকৃতির কোনো বাধা ছাড়াই চাষবাস সম্পন্ন হয়। ওড়িশায় এই তিথি পরিচিত “বকুলা লাগি” বা “বাউলা অমাবস্যা” নামে।

মানুষ নানা প্রার্থনা নিয়ে ঈশ্বরের দ্বারস্থ হয়—কখনও সুখ, কখনও সাফল্য, কখনও নিরাপত্তার কামনায়। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, আমরা কয়জন সত্যিই নিজেকে সম্পূর্ণভাবে ঈশ্বরের কাছে সমর্পণ করতে পারি? যারা পারেন, তাঁদের আর কিছু চাইবার থাকে না। বিশ্বাস অনুযায়ী, ঈশ্বর তখনই তাঁদের সমস্ত প্রয়োজন পূরণ করেন।

এই অমাবস্যা সেই শিক্ষাই দেয়—আড়ম্বর নয়, চাই সম্পূর্ণ সমর্পণ। শুরু করতে হবে আমের মুকুল হয়ে—নম্র, ধৈর্যশীল ও আশাবাদী। শেষ করতে হবে পরিণত ফলের মতো—নিজের সমস্ত অর্জন ঈশ্বরের চরণে নিবেদন করে। মাঝপথে ঝড়ে পড়লে চলবে না।

Loading