February 4, 2026

গাছতলায় পাঠশালায় শিক্ষার্থী সপ্তাহ: শিক্ষার আলোয় আদিবাসী শিশুরা, ব্যতিক্রমী উদ্যোগ খানাকুলে

 

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ; রাজ্যের সমস্ত সরকারি ও সরকার-সহায়তাপ্রাপ্ত বিদ্যালয়ের সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই খানাকুলের কৃষ্ণনগর এলাকায় গাছতলায় পাঠশালায় সাফল্যের সঙ্গে পালিত হলো শিক্ষার্থী সপ্তাহ। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে থাকা আদিবাসী শিশুদের শিক্ষার মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে এই উদ্যোগ আজ এক মানবিক ও সামাজিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

খানাকুল ব্লকের বিভিন্ন এলাকায় বছরের অধিকাংশ সময় বিহার, ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশা থেকে আগত বহু আদিবাসী পরিবার জীবিকার সন্ধানে বসবাস করে। নির্মাণ শ্রম, কৃষিশ্রম ও দিনমজুরির সঙ্গে যুক্ত এই পরিবারগুলির শিশুরা দারিদ্র্য, পরিযায়ী জীবনযাপন ও সচেতনতার অভাবে বিদ্যালয়মুখী হতে পারে না। ফলে আধুনিক যুগেও এই সমস্ত শিশুরা প্রাথমিক শিক্ষার ন্যূনতম সুযোগ থেকেও বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে।

এই বাস্তব পরিস্থিতিকে সামনে রেখেই গত ১৪ নভেম্বর ২০২৫, শিশু দিবসের দিন, খানাকুলের কৃষ্ণনগর এলাকায় সূচনা হয় ‘গাছতলায় পাঠশালা’। রামনগর অতুল বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অমিত কুমার আঢ্য-র নেতৃত্বে এবং এলাকার শুভানুধ্যায়ী সমাজকর্মী ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিবর্গের সহযোগিতায় শুরু হওয়া এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হলো—বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগেই আদিবাসী শিশুদের পড়া, লেখা ও গণিতের প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি করা।

শিক্ষার্থী সপ্তাহ উপলক্ষে এদিন পাঠশালার ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে উৎসবের আবহ তৈরি হয়। শিশুদের হাতে তুলে দেওয়া হয় নতুন পোশাক, খাতা, পেনসিল, রং, স্কেল-সহ বিভিন্ন শিক্ষাসামগ্রী। রাজ্য সরকারের শিক্ষা দপ্তরের নির্দেশিকা অনুযায়ী গাছতলায় পাঠশালাতেও অঙ্কন প্রতিযোগিতা, কুইজ প্রতিযোগিতা এবং শিক্ষামূলক ক্রীড়া কার্যক্রমের আয়োজন করা হয়। শিশুদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে পুরো পাঠশালা চত্বর আনন্দ ও উচ্ছ্বাসে মুখরিত হয়ে ওঠে।

এই প্রসঙ্গে প্রধান উদ্যোক্তা অমিত কুমার আঢ্য বলেন,

“শিক্ষা কোনো দয়া নয়, এটি শিশুর অধিকার। ভবিষ্যৎ ভারত গড়তে হলে সমাজের সর্বস্তরের শিশুদের শিক্ষার আওতায় আনতেই হবে। গাছতলায় পাঠশালা সেই লক্ষ্যেই আমাদের ক্ষুদ্র কিন্তু আন্তরিক প্রয়াস।”

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রতি রবিবার নিয়মিতভাবে এই গাছতলায় পাঠশালায় আদিবাসী শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা প্রদান করা হয়। খানাকুলের বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকারা রোটেশন পদ্ধতিতে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে পাঠদান করেন। পাঠ্যসূচির মধ্যে রয়েছে—বাংলা ও হিন্দি বর্ণপরিচয়, প্রাথমিক গণিত, সাধারণ জ্ঞান, নৈতিক শিক্ষা এবং পরিচ্ছন্নতা ও সামাজিক আচরণ সংক্রান্ত পাঠ।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এই উদ্যোগের ফলে শিশুদের মধ্যে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ যেমন বেড়েছে, তেমনই অভিভাবকদের মধ্যেও সচেতনতা তৈরি হয়েছে। অনেক অভিভাবকই ভবিষ্যতে তাঁদের সন্তানদের নিকটবর্তী বিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

‘ভবিষ্যৎ ভারতবর্ষ, শিক্ষিত ভারতবর্ষ’—এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে গাছতলায় পাঠশালার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ আজ খানাকুলে এক আশার আলো হয়ে উঠেছে। সমাজের প্রান্তিক শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে এমন উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হওয়ার দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে।

Loading