আরামবাগে লিগাল মেট্রলজি ইন্সপেক্টর সন্দীপ সরকারের বার্তা: “শুধু দোকান নয়, ক্লিনিক-হাসপাতালের ওজনযন্ত্রও নিয়মিত যাচাই বাধ্যতামূলক”
সোমালিয়া ওয়েব নিউজ; আমরা সবাই ক্রেতা। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস থেকে শুরু করে সবজি, মুদিখানা, সোনা, পেট্রোল—প্রতিদিনই নানা পণ্য বাজার থেকে কিনতে হয় সাধারণ মানুষকে। কিন্তু ওজন ও পরিমাপ নিয়ে অভিযোগ দীর্ঘদিনের হলেও অনেকেই জানেন না কোথায় গিয়ে অভিযোগ জানাতে হবে বা কীভাবে নিশ্চিত হবেন যে তিনি সঠিক পরিমাণেই পণ্য পাচ্ছেন। ইলেকট্রনিক ওজনযন্ত্র, দাঁড়িপাল্লা ও বাটখারা ব্যবহার সংক্রান্ত নিয়মকানুন সাধারণ মানুষের পক্ষে সুনির্দিষ্টভাবে জানা সবসময় সম্ভবও নয়। ফলে বাজারে একটু অসতর্ক হলেই ঠকে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। সবজি বাজার থেকে শুরু করে সোনার দোকান, পেট্রোল পাম্প—বিভিন্ন জায়গায় সঠিকভাবে ওজন ও পরিমাপ যাচাই না করলে ক্রেতার ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই বিষয়ে সাধারণ মানুষ কীভাবে সচেতন হবেন, কেনাকাটার সময় কোন কোন বিষয় খেয়াল রাখা উচিত এবং কোথায় গেলে অভিযোগ জানানো যাবে—এই সব প্রশ্ন নিয়ে আমরা হাজির হয়েছিলাম আরামবাগের দায়িত্বে থাকা লিগাল মেট্রলজি দপ্তরের ইন্সপেক্টর সন্দীপ সরকারের কাছে।
সাক্ষাৎকারে সন্দীপ সরকার জানান, লিগাল মেট্রলজির কাজ শুধু বাজারের ওজনযন্ত্র দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিভিন্ন ক্লিনিক, হাসপাতাল, হেলথ সেন্টার এবং নার্সিংহোমে চিকিৎসাক্ষেত্রে যে ওজনযন্ত্র ব্যবহার হয়, সেগুলিও নির্দিষ্ট সময় অন্তর ভেরিফিকেশন করানো বাধ্যতামূলক। কারণ রোগীর ওজন মেপে অনেক সময় ওষুধের ডোজ নির্ধারণ করা হয়। ফলে এই যন্ত্রগুলির নির্ভুলতা রোগীর চিকিৎসার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ক্রেতা হিসেবে যেমন দোকানে ওজনযন্ত্র ভেরিফিকেশন করা আছে কিনা দেখে নেওয়া উচিত, ঠিক একইভাবে রোগী বা রোগীর পরিবারেরও চিকিৎসাকেন্দ্রে থাকা ওজনযন্ত্রটি ভেরিফাইড কি না, তা দেখে নেওয়া প্রয়োজন।
লিগাল মেট্রলজি ইন্সপেক্টর আরও জানান, যাঁরা ওজন বা পরিমাপ সংক্রান্ত যন্ত্র ব্যবহার করেন তাঁদের উচিত ভেরিফিকেশন সার্টিফিকেট দোকান বা প্রতিষ্ঠানের সামনে দৃশ্যমান জায়গায় রাখা, যাতে সাধারণ মানুষ সহজেই বুঝতে পারেন যন্ত্রটি আইন অনুযায়ী যাচাই করা আছে কিনা। পাশাপাশি ওজনযন্ত্রে থাকা স্ট্যাম্পিং ডেট দেখেও বোঝা যায় ভেরিফিকেশন কতদিন আগে হয়েছে। ইলেকট্রনিক ওজনযন্ত্রের ক্ষেত্রে ক্যাপাসিটি বা ক্ষমতা অনুযায়ী ১০ ভাগের এক ভাগ বাটখারা রাখা উচিত এবং সেই বাটখারাটিও ভেরিফিকেশন করা থাকা বাধ্যতামূলক বলে জানান তিনি।
আরামবাগ মহকুমায় ভেরিফিকেশন করা ওজনযন্ত্র ব্যবহারকারীর সংখ্যাও উল্লেখ করেন সন্দীপ সরকার। তাঁর কথায়, গত বছরে আরামবাগ মহকুমায় প্রায় ১৩ হাজারের মতো সার্টিফাইড ভেরিফিকেশন ওজনযন্ত্র ব্যবহারকারী ছিলেন। পাশাপাশি প্রতি মাসে বিভিন্ন এলাকায় একবার করে ইনফোর্সমেন্ট অভিযান চালানো হয়। অর্থাৎ নির্দিষ্ট এলাকায় হঠাৎ করে দোকান বা প্রতিষ্ঠানগুলিতে গিয়ে দাঁড়িপাল্লা কিংবা ইলেকট্রনিক ওজনযন্ত্র পরীক্ষা করা হয় এবং আইন ভাঙলে জরিমানাও করা হয়। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কাঠের লাঠিতে দাঁড়িপাল্লা ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি।
ওজনযন্ত্র ভেরিফিকেশনের জন্য নিয়মিত ক্যাম্পের ব্যবস্থাও করা হয় বলে জানান তিনি। কেউ চাইলে সরাসরি অফিসে এসেও নিজের ওজনযন্ত্র ভেরিফিকেশন করাতে পারেন। এছাড়া ওজনযন্ত্র মেরামতির ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন সন্দীপ সরকার। তাঁর মতে, লাইসেন্সপ্রাপ্ত ওজনযন্ত্র রিপেয়ারকারিদের কাছেই মেরামতি করানো উচিত এবং ভেরিফিকেশন করানোর পর যে পরিমাণ টাকা নেওয়া হচ্ছে, তার অবশ্যই পাকা বিল নেওয়া প্রয়োজন। বিল না দিলে ওই রিপেয়ারিং করানো ঠিক নয় বলেই মত তাঁর।
সোনা কেনার ক্ষেত্রেও বিশেষ সতর্কবার্তা দেন লিগাল মেট্রলজি ইন্সপেক্টর। তিনি বলেন, সোনার দোকানে ওয়ান মিলিগ্রাম মেশিন আছে কিনা তা জেনে নেওয়া উচিত। বর্তমানে সোনার দোকানে ক্লাস ওয়ান ইলেকট্রনিক ওজনযন্ত্র রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ক্লাস ওয়ান মেশিন চেনার সহজ উপায়ও জানান তিনি—দশমিকের পর ডানদিকে তিনটি ডিজিট থাকলেই বোঝা যাবে ওজনযন্ত্রটি তুলনামূলকভাবে বেশি নির্ভুল।
এছাড়া বড় বড় লরি বা ট্রাকে যেখানে পণ্য ওজন হয় সেখানে স্কেল ইন্টারভেল বেশি থাকার কারণে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা যদি সেই ওজনের উপর নির্ভর করে দীর্ঘদিন ধরে খুচরা বিক্রি করেন, তাহলে তাঁরা ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন বলেও সতর্ক করেন তিনি। এই ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা বস্তা বা প্যাকেট হিসেবে ওজন করিয়ে নেওয়াই নিরাপদ বলে মনে করছেন তিনি।
সব মিলিয়ে লিগাল মেট্রলজি দপ্তরের বার্তা একটাই—সচেতন ক্রেতাই প্রতারণা ঠেকাতে পারেন। দোকান, বাজার কিংবা চিকিৎসাকেন্দ্র—যেখানেই ওজন বা পরিমাপের বিষয় জড়িত, সেখানেই ভেরিফিকেশন সার্টিফিকেট, স্ট্যাম্পিং ডেট ও যন্ত্রের মান যাচাই করা প্রয়োজন। সাধারণ মানুষের সামান্য সচেতনতাই ঠকানো বন্ধ করতে পারে এবং ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে পারে।

![]()

More Stories
পাঞ্জাবে ‘অপারেশন প্রহার’-এর দ্বিতীয় দফা শুরু, গ্যাংস্টার দমনে ৭২ ঘণ্টার অভিযান
বস্তারে বড় ধাক্কা মাওবাদীদের, বিজাপুর–সুকমায় একদিনে আত্মসমর্পণ ৫১ জনের
নেশামুক্ত অভিযানে ২৫ কোটি মানুষের কাছে সচেতনতা প্রচার: লোকসভায় জানালেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বিরেন্দ্র কুমার