February 9, 2026

কলকাতার মৃত্যুঘণ্টা কি বেজে গেলো?

সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ দক্ষিণবঙ্গে এবার জল-আবহাওয়ার সংকট যেন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দামোদর, অজয়, দ্বারকেশ্বর, রূপনারায়ণ—রাঢ়বঙ্গের নদীগুলি উত্তাল। কলকাতাতেও সাম্প্রতিক জলজটের ফলে তড়িদাহত হয়ে মৃত্যুতে শহরবাসী স্তম্ভিত। এই ঘটনা প্রায় প্রতিবছরই ঘটে চলেছে , কিন্তু এই চরম পরিস্থিতির অন্তরালে লুকিয়ে আছে এক গভীরতর কারণ—পূর্ব কলকাতার জলাভূমি ধ্বংস।

আনন্দবাজার পত্রিকার এক ছোট্ট খবরে সম্প্রতি প্রকাশ পেয়েছিল—“বেআইনি দখলদারির চোটে আন্তর্জাতিক মর্যাদা হারানোর আশঙ্কা পূর্ব কলকাতা জলাভূমির।” কিন্তু বড় আকারে কোনো আলোচনার ঝড় ওঠেনি। অথচ এই জলাভূমিই বহুদিন ধরে কলকাতার প্রাণরক্ষা করে এসেছে।

১৯৭১ সালে ইরানের রামসার শহরে যে আন্তর্জাতিক জলাভূমি সংরক্ষণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তার তালিকায় ভারতের প্রথম দিককার ‘রামসার সাইট’ হিসেবে ২০০২ সালে জায়গা পেয়েছিল পূর্ব কলকাতার জলাভূমি। এই জলাভূমিকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক নিকাশি ও শোধন ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন পরিবেশবিদরা। প্রতিদিন প্রায় সাতশো মিলিয়ন লিটার বর্জ্যজল এখানে এসে প্রাকৃতিকভাবেই বিশুদ্ধ হয়ে যেত। শুধু তাই নয়, এখান থেকেই মেলে বিপুল মাছ ও শাকসবজি—কলকাতার বাজার সস্তা হওয়ার অন্যতম কারণ এই ভেড়িগুলি।

এই বিস্ময়কর আবিষ্কার করেছিলেন প্রয়াত পরিবেশবিদ ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ। আশির দশকে সরকারি চাকুরে হয়েও তিনি অক্লান্ত পরিশ্রমে প্রমাণ করেছিলেন—“বর্জ্যজল ৯৫% জল, আর মাত্র ৫% জীবাণু। জলাভূমির সূর্যালোক ও জলজ জীববৈচিত্র্যের প্রভাবে সেই জল নিখরচায় বিশুদ্ধ হয়ে যায়।” তাঁরই প্রচেষ্টায় হাইকোর্ট ১৯৯২ সালে জলাভূমি ভরাটে রায় দিয়ে সংরক্ষণ নিশ্চিত করে। পরবর্তী কালে তাঁর লেখালিখি আন্তর্জাতিক মহলে সাড়া জাগায়।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, প্রোমোটার শক্তি ও প্রশাসনিক উদাসীনতায় ভরাট হতে শুরু করেছে জলাভূমি। কলকাতার আসল ‘কিডনি’ হয়ে ওঠা এই ভৌগোলিক বিস্ময় ক্রমশ বিকল হয়ে পড়ছে। ফলে সামান্য বৃষ্টি বা প্রকৃতির অল্প রুষ্টতাতেই আজ ভেসে যাচ্ছে শহর। জমা জলে দুর্গন্ধ, মশা ও জলবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে যে লকগেট খোলা, কর্পোরেশনের পাম্প চালানো বা পাইপ বসানো চলছে, তা স্থায়ী সমাধান নয়—এ যেন কিডনি বিকল রোগীর ‘ডায়ালিসিস’।

ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ জলাভূমি রক্ষার আন্দোলন চালিয়ে গিয়েছিলেন আমৃত্যু। তাঁর লেখা Ecology and Traditional Wetland Practices বইটি আজও পরিবেশবিদদের জন্য একটি নির্দেশিকা। ভারতের সবুজ বিপ্লবের জনক এম এস স্বামীনাথন বইটির মুখবন্ধে লিখেছিলেন—“যেভাবে অমর্ত্য সেনের অর্থনীতি ‘ওয়েলফেয়ার ইকনমিক্স’, তেমনি ধ্রুবজ্যোতির কাজ ‘ওয়েলফেয়ার ইকোলজি’।”

কিন্তু দুঃখজনকভাবে, বহু আন্তর্জাতিক সম্মানে ভূষিত এই পরিবেশবিদ ২০১৮ সালেই প্রয়াত হন। তাঁর সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে আজ কলকাতা ডুবে আছে জলজটে।

প্রশ্ন একটাই—
শহরের আসল রক্ষাকবচ জলাভূমি যদি চিরতরে হারিয়ে যায়, তবে কি তবে কলকাতার মৃত্যুঘণ্টা সত্যিই বেজে গেলো?

Loading