সোমালিয়া ওয়েব নিউজ; এক সময় গ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল বড় আকারের টিনের ট্রাঙ্ক বা লোহার ভারি বাক্স। মেয়ের বিয়েতে যৌতুক হিসেবে হোক, কিংবা চাকরিজীবীর দূর দেশে যাত্রার সঙ্গী—এই লোহার বাক্সগুলো ছিল পরিবারের আভিজাত্য এবং নিরাপত্তার প্রতীক। কিন্তু সময়ের করাল গ্রাসে আজ সেই দিনগুলো কেবলই ধূসর স্মৃতি। ড্রয়িংরুমে জায়গা করে নিয়েছে অত্যাধুনিক প্লাইউডের ইন্টেরিয়র বা চকচকে স্টিলের ওয়ার্ডরোব, আর ধুলো জমছে বাড়ির এক কোণে পড়ে থাকা সেই পুরনো ট্রাঙ্কটিতে।
এক সময় আরামবাগের ট্যাক্সি স্ট্যান্ড এর কাছে হাতুড়ি আর টিনের ঠোকাঠুকি শব্দে কান পাতা দায় হতো। ভোর থেকে রাত অবধি চলত নকশা কাটা টিনের বাক্স তৈরির কাজ। আজ সেই সব কারখানায় নেমে এসেছে শ্মশানের নীরবতা। হাতেগোনা দুই-একজন কারিগর এখনও বাপ-ঠাকুরদার পেশা আঁকড়ে পড়ে আছেন, কিন্তু তাদের চোখেমুখে শুধুই অনিশ্চয়তা। নতুন প্রজন্মের কেউ আর এই হাড়ভাঙা খাটুনিতে আসতে চায় না। আধুনিক ফাইবার ট্রলি ব্যাগ বা হালকা ওজনের সুটকেসের সঙ্গে অসম লড়াইয়ে হেরে যাচ্ছে এই শত বছরের শিল্প। আমরা কথা বলেছিলাম আরামবাগের একমাত্র ট্রাঙ্ক কারখানার মালিক সনৎ বাবুর সাথে তিনি জানান আগের থেকে বিক্রি অনেকটাই কমে গেছে এখন যতটুকু বিক্রি হচ্ছে স্কুল কলেজ বা অফিসে ডকুমেন্ট রাখতে অথবা ছেলেটা যখন কোথাও কোন হোস্টেল বা মেসে পড়তে যাচ্ছে সেইটুকু লাগছে।
পুরনো ট্রাঙ্কগুলো ছিল অনেকটা সিন্দুকের মতো। মা-কাকিমাদের প্রিয় শাড়ি, জরুরি দলিল, এমনকি নতুন কেনা পোশাকগুলোও সযতনে রাখা থাকত এই লোহার অন্দরে। ন্যাপথলিনের গন্ধ আর সেই মরচে ধরা তালার ক্যাঁচক্যাঁচে শব্দটা শুনলেই মনে পড়ে যেত বাড়ির কর্তার গম্ভীর উপস্থিতি। সেই ট্রাঙ্কের গায়ে রঙিন তুলিতে লেখা থাকত মালিকের নাম কিংবা কোনো পাহাড়ি ঝরনার দৃশ্য—যা আজ আধুনিক ওয়ার্ডরোবের যান্ত্রিক ফিনিশিংয়ের কাছে অনেক বেশি মানবিক ছিল।
বর্তমান যান্ত্রিক জীবনে মানুষের সময়ের বড্ড অভাব। ভারী লোহার বাক্স সরানো বা পরিষ্কার করা ঝক্কির কাজ মনে হয়। তাই মানুষ ঝুঁকছে হালকা, চাকা লাগানো ট্রলি কিংবা দেয়াল জোড়া সাজানো আলমারির দিকে। সেখানে ঠাঁই আছে বিলাসবহুল উপকরণের, কিন্তু নেই সেই মায়া। পুরনো দিনের সেই ট্রাঙ্ক বা লোহার বাক্স এখন বড়জোর স্টোররুমে বাতিল জিনিসের স্তূপ হয়ে থাকে, অথবা কেজি দরে বিক্রি হয়ে যায় ভাঙারি দোকানে।
শিল্পের বিবর্তন অনিবার্য, কিন্তু প্রতিটি বিবর্তন কিছু হারিয়ে যাওয়ার বেদনা দিয়ে যায়। লোহার বাক্সের কারিগরদের সেই নিপুণ হাতের কাজ হয়তো আর কয়েক দশক পর জাদুঘরে ঠাঁই পাবে। আমাদের শোবার ঘর হয়তো সাজবে আধুনিকতার রঙে, কিন্তু স্মৃতির গভীরে চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে সেই পুরনো টিনের ট্রাঙ্কটির ক্যাঁচক্যাঁচে সুর।




![]()

More Stories
বেপরোয়া বাইক, বেআইনি ইঞ্জিন ভ্যান ও নিয়মভাঙা পার্কিং—চাপ বাড়ছে রাস্তায়, উদ্বেগে সাধারণ মানুষ
কর্পোরেট আগ্রাসনে কোণঠাসা আরামবাগের পুরনো দোকানপাট
অর্ধশতকের ঐতিহ্য ধরে টিকে আছে আরামবাগের একমাত্র কাঁসা-পিতল পালিশের দোকান