February 6, 2026

অর্ধশতকের ঐতিহ্য ধরে টিকে আছে আরামবাগের একমাত্র কাঁসা-পিতল পালিশের দোকান

স্টিলের যুগে কমছে কাজ, তবু হাতের কারুকাজে আজও চকচকে ইতিহাস

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ; আরামবাগ শহরের বুকে প্রায় ৫৫ বছরের পুরনো এক ঐতিহ্য—একটি কাঁসা-পিতল পালিশের একটিমাত্র দোকান। সময় বদলেছে, বাজার বদলেছে, মানুষের ব্যবহার বদলেছে; কিন্তু এই ছোট্ট কারখানার ভিতরে এখনও প্রতিদিন ঘুরে চলেছে মেশিন, আর অভিজ্ঞ হাতের স্পর্শে নতুন জীবন পাচ্ছে পুরনো ধাতব বাসনপত্র। এক সময় আরামবাগের ঘরে ঘরে কাঁসা-পিতলের বাসনের ব্যবহার ছিল নিত্যদিনের ব্যাপার। বিয়ে-শাদি, পুজো-পার্বণ, কিংবা অতিথি আপ্যায়ন—সব ক্ষেত্রেই এই ধাতব বাসনের আলাদা মর্যাদা ছিল। সেই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখে বছরের পর বছর ধরে একাই কাজ করে চলেছে এই পালিশের কারখানা। আরামবাগের আশেপাশে আজও তেমন আর কোনও পালিশের কারখানা গড়ে ওঠেনি। এই কাজ সহজ নয়। প্রয়োজন বিশেষ দক্ষতা, ধৈর্য এবং দীর্ঘ অভিজ্ঞতার। বিভিন্ন ধরনের কাপড়, বিশেষ উপকরণ এবং মেশিনের সাহায্যে ধীরে ধীরে পালিশ করা হয় বাসনপত্র। সারাদিন ধরে মেশিনের শব্দ আর কর্মীদের হাতের নিখুঁত কৌশলে ধাতুর গায়ে ফিরে আসে পুরনো উজ্জ্বলতা।বালিদেয়ানগঞ্জ, মানিকপাঠ সহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় কাঁসা-পিতলের জিনিস তৈরি হলেও পালিশ করাতে হয় এই আরামবাগেই। শুধু আশপাশ নয়—দূরের বাঁকুড়া, বিষ্ণুপুর, তারকেশ্বর, এমনকি কলকাতা থেকেও বাসনপত্র আসে এখানে। প্রায় ৫৫ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এই দোকানের কর্মীরা প্রত্যেকেই পারদর্শী। তবে কাজের কষ্ট আর দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন হওয়ায় নতুন কর্মী এই পেশায় আসতে চান না বলেই জানাচ্ছেন মালিক। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রা। স্টিলের ব্যবহার বেড়েছে বহুগুণ, কমেছে কাঁসা-পিতলের বাসনের চাহিদা। ফলে আগের তুলনায় কাজও কমেছে অনেকটাই। বর্তমানে এই কারখানায় মাত্র ছয়-সাত জন কর্মচারী কাজ করেন। পালিশের খরচা কেজি প্রতি প্রায় ৭০ টাকা।দোকানের মালিক মৃত্যুঞ্জয়বাবু জানান, সাধারণ মানুষের পক্ষে কাঁসা-পিতল চিনে নেওয়া সহজ নয়। পালিশ করাতে এলে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তাঁরা বলে দিতে পারেন কোন ধাতু কী। তাঁর কথায়, “কাঁসা-পিতলের বাসনে খাওয়া-দাওয়া শরীরের জন্যও ভালো। কিন্তু ধাতুর দাম বেড়ে যাওয়ায় মানুষ এখন স্টিলের দিকে বেশি ঝুঁকছে, তাই কাজও আগের মতো নেই।” তবু সব প্রতিকূলতার মাঝেও থেমে নেই এই ছোট্ট কারখানা। প্রতিদিন মেশিন ঘোরে, হাত চলে, আর ইতিহাসের মতোই চকচকে হয়ে ওঠে ধাতব বাসনপত্র। শুধু একটি দোকান নয়—এ যেন আরামবাগের হারিয়ে যেতে বসা এক শিল্পের শেষ আশ্রয়। প্রশ্ন একটাই, এই ঐতিহ্য আর কতদিন টিকে থাকবে?

Loading