সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ হুগলী জেলার আরামবাগ মহকুমার বালি-দেওয়ানগঞ্জ এলাকার রাউতপাড়া গ্রামে শতাব্দীপ্রাচীন দুর্গামন্দির, বিষ্ণুমন্দির, সর্বমঙ্গলা মন্দির, মঙ্গলচণ্ডী মন্দির-সহ একাধিক স্থাপত্য নিদর্শন আজ অবহেলা ও সময়ের আঘাতে ভগ্নপ্রায়। গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে থাকা টেরাকোটার অলংকরণযুক্ত মন্দিরগুলির বহু অংশ ইতিমধ্যেই ধসে পড়েছে, কোথাও গর্ভগৃহ টিকে থাকলেও বারান্দা ও চূড়া নষ্ট হয়ে গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাউতপাড়ার মন্দিরগুলি নির্মাণ করেছিলেন রঘুনাথ রাউত। তবে দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে একাধিক মন্দিরে আগাছা ও গাছপালা জন্মে স্থাপত্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে ঘোষপাড়ার রাসবাড়িতে থাকা দামোদর মন্দিরের প্রতিষ্ঠালিপি এখনও অক্ষত থাকলেও মন্দিরের টেরাকোটা কাজের বড় অংশ ক্ষয়ের মুখে।
আরামবাগ মহকুমা জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে দোচালা, চারচালা, আটচালা, একবাংলা, জোড়াবাংলা, একরত্ন, পঞ্চরত্ন ও নবরত্ন মন্দির। তবে নবরত্ন মন্দির খুবই বিরল—একটি রয়েছে বালি-দেওয়ানগঞ্জে, আরেকটি বদনগঞ্জে।
এইসব মন্দিরের গায়ে টেরাকোটার কাজের আধিক্য চোখে পড়ার মতো। পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত, ভাগবত কাহিনি অবলম্বনে দেবদেবীর মূর্তি, অলংকরণ, ইটের কারুকার্য—সব মিলিয়ে এগুলি বাংলার লোকঐতিহ্য ও শিল্পচর্চার অনন্য দলিল।
কামারপুকুর গ্রামে এলাহা বাবুদের কূলে দেবতার বিষ্ণু মন্দির, দুর্গা মন্দির ও নাটমঞ্চেও বহু পুরনো স্থাপত্যভাস্কর্যের নিদর্শন মেলে। পান্ডু গ্রামের গোস্বামীপাড়ায় রাধাগোবিন্দ বিদ্রোহকে কেন্দ্র করে মন্দির, রাসমঞ্চ এবং মন্দিরগাত্রের অলংকরণ আজও গবেষকদের আগ্রহের বিষয়। খালারপ (খারাপ) অঞ্চলে কৃষ্ণনগরের শ্রীমৎ অভিরাম গোস্বামীর প্রতিষ্ঠিত গোপীনাথ জিউর বিশাল নবরত্ন মন্দিরও উল্লেখযোগ্য। গোঘাটের সন্তার পীরতলায় রয়েছে ভগ্ন মসজিদ—সেখানকার কারুকার্যও দেখার মতো। গোঘাটের সন্তার পীরতলায় ভগ্ন মসজিদ, বিভিন্ন কারুকার্য দেখার মত সবকিছুই আস্তে আস্তে ধ্বংসের মুখে চলে যাচ্ছে। গোঘাটের কাটালি পচাখালির গির্জা, সানবাঁধি গ্রামে দুটি ফটক আছে। সেগুলিও ধ্বংসের মুখে। এইভাবেই আস্তে আস্তে ধ্বংসের মুখে চলে যাচ্ছে পুরনো ইতিহাস ঐতিহ্যবাহী মন্দির মসজিদ।
কিন্তু এইসব স্থাপত্য নিদর্শন আজ ধীরে ধীরে ধ্বংসের মুখে। মন্দির-মসজিদের গায়ে জন্মেছে বড় বড় গাছ, আগাছা। প্রশাসন বা এলাকাবাসীর নজরদারি কম। ভোট আসে, ভোট যায়—কিন্তু ঐতিহ্য রক্ষায় উদ্যোগ নেই বললেই চলে।
সংস্কারের দাবি—সচেতনতা ছাড়া রক্ষা সম্ভব নয়
প্রাক্তন অধ্যাপক, লেখক ও স্বাধীনতা সংগ্রামীর পুত্র শ্রী রণজিৎ কুমার গোস্বামী মনে করেন, এই ঐতিহ্য রক্ষায় আগে এলাকার যুবসমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। তাঁর কথায়, “একবার চেষ্টা করে না হলে বারবার চেষ্টা করতে হবে।”
বিশিষ্ট সমাজসেবী মুক্তার আলী জানান, স্থানীয় মানুষ ও ধর্মপ্রাণ সমাজ যদি এগিয়ে না আসেন, তাহলে সংস্কার কোনওভাবেই সম্ভব নয়। সর্বোপরি প্রয়োজন মানুষের সচেতনতা।
এদিকে গোঘাটের বিজেপি বিধায়ক বিশ্বনাথ কারক জানান, সংস্কারের বিষয়ে তিনি তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরকে চিঠি দিয়েছেন। তবে এখনও পর্যন্ত কোনও কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়েনি। তিনি আরও বলেন, তাঁর দল ক্ষমতায় এলে এই স্থাপত্য নিদর্শনগুলির সংস্কারের ব্যবস্থা করা হবে।
আরামবাগ মহকুমার মন্দির স্থাপত্য শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের নিদর্শন নয়—এটি বাংলার শিল্প, ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতির এক অমূল্য দলিল। কিন্তু অবহেলা, পরিত্যাগ এবং পরিকল্পিত সংরক্ষণের অভাবে সেই ঐতিহ্য আজ বিপন্ন।
সময় থাকতেই যদি উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তাহলে আগামী প্রজন্ম হয়তো এই টেরাকোটার ইতিহাস দেখবে শুধু বইয়ের পাতায়—মাটিতে নয়।

![]()

More Stories
বাঁশের কঞ্চির ছিপ থেকে আধুনিক চারা,রিল—বদলে গিয়েছে মাছ ধরার সরঞ্জামের দুনিয়া
স্বর্গীয় বলরাম ঘোষের জন্মশতবর্ষে বাজুয়া হাই স্কুলের কাবাডি ও ফুটবল প্রতিযোগিতা
আরামবাগের কালিপুর মন্দিরে ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের ১৩৯তম জন্মোৎসব