সুন্দরবনে দেশি ধানের পুনরুত্থান‘সীতাশাল’-এর সাফল্যে নতুন আশা কৃষকদের


সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ সুন্দরবনের প্রতিকূল আবহাওয়াকেও হার মানিয়ে দেশি ধানের চাষে ফের নতুন আশার আলো দেখতে শুরু করেছেন স্থানীয় কৃষকরা। সমবায়ের উদ্যোগে পুনরুজ্জীবিত হয়েছে প্রাচীন জাতের ধান—‘সীতাশাল’। মাত্র তিনটি ধানের শীষ নিয়ে তিন বছর আগে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজ তা ছড়িয়ে পড়েছে অন্তত সাত বিঘা জমিতে

মানসীদি ও অমলদার হাতে বীজ সংরক্ষণ ও বৃদ্ধির সেই প্রচেষ্টা আজ সমবায়ের গর্ব। ২০২২-২৩ মৌসুমে ভয়াবহ আবহাওয়ার ক্ষতির পরও সাগরদ্বীপের মানসীদির মাঠে ‘সীতাশাল’-এর বিঘাপ্রতি ফলন হয়েছিল ১১ মণ। একেকটি শীষে ধান পাওয়া গেছে সর্বোচ্চ ৩৫৫টি—যা স্থানীয় কৃষকদের তাক লাগিয়ে দিয়েছে।

ঘরভর্তি চাল রেখে সারা বছরের খোরাকি মিটিয়ে অতিরিক্ত উৎপাদন পৌঁছচ্ছে স্থানীয় হাটে ও শহরের বাজারে। যারা এই সমবায়ের ‘সীতাশাল’ চাল খেয়েছেন, তাঁরা এর স্বাদ ও মানের প্রশংসা করছেন বারবার। সমবায়ের নিয়মও স্পষ্ট—কৃষকের নির্ধারিত দামেই চাল বিক্রি হবে।
চাল তৈরি থেকে শুরু করে কল চালানো—সবই কৃষকরাই করেন। বাজারি দালালের কাছে সস্তায় ধান বিক্রির দিন অনেক আগেই শেষ। সমবায় বলয়ে জমে উঠেছে ন্যায্য মূল্য ও ন্যায্য পরিশ্রমের এক বিকল্প কৃষিব্যবস্থা।

তবে আশঙ্কাও আছে। স্থানীয় কৃষকদের মতে, বাজারি ‘বাঁজা’ বীজ জমিতে ছড়িয়ে পড়ে ধীরে ধীরে নষ্ট করে দিচ্ছে এলাকার জিনবৈচিত্র্য। কর্পোরেট বীজশিল্পের এই নিঃশব্দ দখলদারি প্রকৃত দেশি জাতের অস্তিত্বকেই বিপদে ফেলছে। কোম্পানির বীজের পরাগ ছড়িয়ে পড়ছে মাঠে মাঠে—ফলে জেনেটিক বিশুদ্ধতা রক্ষা করা আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

তবু আশা জাগাচ্ছে দেশের ধানের শক্তি
সুন্দরবনের খারাপ আবহাওয়া, ঘূর্ণিঝড়, অকালবৃষ্টি—সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে দেশি ধানগুলো শক্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে মাঠে। বয়স্ক কৃষকদের মুখে যে গুণের কথা এতদিন শোনা যেত, আজ সবটাই চোখের সামনে সত্য হয়ে ধরা দিচ্ছে। কৃষকরা বুঝছেন—আগামী দিনে টিকে থাকার একমাত্র পথ সঠিক বীজ, স্বাস্থ্যকর মাটি এবং নিজস্ব কৃষি-জ্ঞানকে ধরে রাখা।

চাষ মানে শুধু চাল নয়, টিকে থাকার লড়াই
দিনের শেষে এই প্রচেষ্টা কেবল লাল-নীল-সবুজ-হলুদ ‘জৈব চাল’ বিক্রির গল্প নয়। এর চেয়ে অনেক বৃহৎ এক সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংগ্রাম—যেখানে কৃষক নিজের বীজ, জমি ও শ্রমের উপর অধিকার ফিরে পাচ্ছেন।

সুন্দরবনের কৃষকদের কথায়—
“বাজার আর আবহাওয়া বুঝিয়ে দিচ্ছে, ভাল বীজ ছাড়া বাঁচা যাবে না। দেশি ধানই আমাদের শেষ ভরসা।”

দেশি ধানের এই পুনর্জাগরণই আজ তাঁদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ও আশার উৎস।

Loading