সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ কৃষিতে লাভ বৃদ্ধির লক্ষ্যে সাম্প্রতিক সময়ে প্রচলিত ফসলের পাশাপাশি অপ্রচলিত কিন্তু সম্ভাবনাময় বিকল্প ফসলের চাষেও জোর দেওয়া হচ্ছে। এই পরিপ্রেক্ষিতেই এক কার্যকর বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে অ্যাজ়োলা—একটি ক্ষুদ্র, পানাজাতীয় ভাসমান ফার্ন, যা প্রাণিখাদ্য ও সবুজ সার দুই ক্ষেত্রেই ব্যবহারযোগ্য।
অ্যাজ়োলা মূলত ধানের জমি, পুকুর, ডোবা, খাল ও বদ্ধ জলাশয়ে জন্মায়। পশ্চিমবঙ্গজুড়ে এটি ‘ক্ষুদিপানা’, ‘তেঁতুলিয়াপানা’, ‘বুটিপানা’, ‘কুটিপানা’ ইত্যাদি নামে পরিচিত। রাজ্যে সহজলভ্য ও সহজচাষ্য জাত হিসেবে কৃষিবিদেরা বিশেষ উল্লেখ করেছেন পিন্নাটা জাতকে।
সবুজ সার হিসেবে অ্যাজ়োলার প্রয়োগ
কৃষিবিদদের মতে, অ্যাজ়োলার পাতায় বসবাস করে অ্যানাবিনা শৈবাল, যা বাতাসের নাইট্রোজেন গ্রহণ করে তা জৈব সারে রূপান্তর করতে সক্ষম। বিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুসারে—
- অ্যাজ়োলা ২ কেজি নাইট্রোজেন সংগ্রহ করতে পারে, যা ৫ কেজি ইউরিয়ার সমান।
- জলের উপরিভাগ সম্পূর্ণ ঢেকে গেলে প্রতি হেক্টর জমিতে ১০–১৫ টন জৈব সার ও ২০–২৫ কেজি নাইট্রোজেন উৎপন্ন হয়।
- এর প্রয়োগে জমিতে ৪৫–৫৫ কেজি ইউরিয়ার সমপরিমাণ কার্যকারিতা পাওয়া যায়।
কাঁচা অ্যাজ়োলায় থাকে: ৩–৪% নাইট্রোজেন, ০.৪৫–১.২৫% ক্যালসিয়াম, ০.১৫–১% ফসফরাস, ০.২৫–৫.৫% পটাশিয়াম, ০.২–০.৭৫% সালফার—সঙ্গে প্রচুর জৈব কার্বন, যা মাটির উপকারী জীবাণুর খাদ্য হিসেবে কাজ করে।
ধানের জমি কাদা করার সময়ে অ্যাজ়োলা ছড়িয়ে দিয়ে পরে জল ধরে রাখলে এটি নিজে থেকেই জমি জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে—মাটিতে সার প্রয়োগের খরচ কমে, আগাছার উপদ্রবও হ্রাস পায়।
প্রাণিখাদ্য হিসেবে অ্যাজ়োলার চাষ ও পুষ্টিগুণ
অ্যাজ়োলায় উপস্থিত পুষ্টিগুণ একে প্রাণিখাদ্যের সমৃদ্ধ উৎসে পরিণত করেছে—
- ২০–২৫% প্রোটিন
- ৬–৬.৫% শ্বেতসার
- ৩–৩.৫% চর্বি ও শর্করা
- ০.২৫–০.৫% ক্লোরোফিল (ম্যাগনেসিয়াম-ঘটিত যৌগ)
পুষ্টিবিদদের মতে, অ্যাজ়োলা খাওয়ালে:
- মুরগির ডিমের উৎপাদন বাড়ে
- কুসুমের রঙ গাঢ় হলুদ হয়
- ডিম ও মাংসে প্রোটিনের মাত্রা বৃদ্ধি পায়
- প্রাণীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী হয়
বাড়িতে অ্যাজ়োলা চাষের সহজ পদ্ধতিও জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা—
এক মিটার চওড়া ও ছ’ইঞ্চি উঁচু পাত্র বা মাটিতে একই মাপের গর্তে প্লাস্টিক বিছিয়ে ১ ইঞ্চি মাটি, গোবর ও ফসফেট দিয়ে ৫–৮ সেন্টিমিটার জল ধরে তার উপর অ্যাজ়োলা ছড়িয়ে দিতে হবে। বড় ড্রামে চাষ করলে নিয়মিত জল বদলানো এবং পরিমাণ মতো গোবর তথা ৭ দিন অন্তর ৫ গ্রাম ফসফেট প্রয়োগ জরুরি।
জলাশয়ের pH মাত্রা ৪.৫–৭-এর মধ্যে রাখতে হবে, এবং তীব্র রোদ–বৃষ্টি থেকে বাঁচাতে সাদা শক্ত প্লাস্টিকের ছাদ বা শাক-সবজির মাচা ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে শামুক ও পোকার আক্রমণ থেকে অ্যাজ়োলাকে রক্ষা করতে নিয়মিত নজরদারি ও প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ নির্দেশিত কীটনাশক ব্যবহার আবশ্যক।
মাত্র ৩–৪ দিনের মধ্যেই বেড ভরে যায় এবং প্রতিদিন ১–২ কেজি সংগ্রহ সম্ভব। স্থানীয় বাজারে অ্যাজ়োলা ৫–১০ টাকা কেজি দরে পাওয়া যায় বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত “ভাল জাতের অ্যাজ়োলা নির্বাচন করে চাষ শুরু করলে খুব কম খরচেই লাভ পাওয়া সম্ভব। আগ্রহী কৃষকেরা নিকটবর্তী কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বা Krishi Vigyan Kendra–এর সঙ্গে যোগাযোগ করলে সহজেই চারা সংগ্রহ করতে পারবেন। একবার চাষ শুরু হলে ভবিষ্যতে নিজেদের উৎপাদিত অ্যাজ়োলা থেকেই বীজ তৈরি সম্ভব।”
সবুজ সার ও প্রাণিখাদ্য—উভয় ক্ষেত্রেই অ্যাজ়োলার যুগল উপযোগিতা কৃষি ব্যয়ের ভার কমিয়ে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাসায়নিক সারের উপর নির্ভরতা কমিয়ে জৈব সার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে এবং পশুপালনে কম উৎপাদন খরচে পুষ্টিগুণ বৃদ্ধিতে অ্যাজ়োলা কার্যকর ভূমিকা নিতে চলেছে।
সঠিক পরিচর্যা, জাত নির্বাচন ও চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করলে পশ্চিমবঙ্গের কৃষিজমিগুলিতে অ্যাজ়োলার ব্যবহার আগামী দিনে কৃষি-অর্থনীতিতে বদল আনতে পারে বলে মনে করছেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা।


![]()

More Stories
লাউয়ের পাতা সুড়ঙ্গকারী পোকা
বস্তায় আদা চাষ নিয়ে কয়েকটি প্রশ্ন ও উত্তর
ফসলের পোকা দমনে মেহগনি গাছের বীজ থেকে জৈব কীটনাশক তৈরির পদ্ধতি