শপিংমল ও অনলাইন বাজারের দাপটে টিকে থাকার লড়াই, স্মৃতি হয়ে যাচ্ছে হালখাতা-ক্রেতার সম্পর্ক
সোমালিয়া ওয়েব নিউজ; সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বদলাচ্ছে আরামবাগ শহর। বাড়ছে পরিধি, বদলাচ্ছে বাজারের চরিত্র। একের পর এক শপিংমল, বড় কর্পোরেট ব্যবসা আর অনলাইন কেনাকাটার বিস্তার—সব মিলিয়ে নতুন অর্থনীতির ঢেউ আছড়ে পড়েছে শহরে। আর সেই ঢেউয়ের ধাক্কায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন আরামবাগের আদি-পুরনো দোকানদাররা।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চালানো ছোট দোকানগুলির অবস্থা আজ অত্যন্ত সঙ্কটজনক। ব্যবসা আগের মতো চলছে না, ক্রেতার সংখ্যা কমছে প্রতিদিন। বহু দোকানদার জানাচ্ছেন, সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। কর্মচারীদের বেতন সময়মতো দেওয়া যাচ্ছে না, আগের মতো লোকও রাখা সম্ভব হচ্ছে না। তবু দাঁতে দাঁত চেপে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা।
এক সময় শহরের বাজার মানেই ছিল পরিচিত মুখ, বিশ্বাসের সম্পর্ক। জামাকাপড় বা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনা হতো দোকান থেকে, ধার-বাকি থাকত, চৈত্র মাসে হালখাতায় মিটত সেই হিসেব। দোকানদার-ক্রেতার মধ্যে ছিল পারিবারিক সম্পর্ক, আপ্যায়ন, আমন্ত্রণ। কালের বিবর্তনে সেই ছবি আজ প্রায় অতীত। শপিংমলের ঝকঝকে পরিবেশে কেনাবেচা হয় ঠিকই, কিন্তু সেখানে ব্যক্তিগত সম্পর্কের উষ্ণতা নেই—এমনটাই মনে করছেন বহু পুরনো ব্যবসায়ী।
তাঁদের অভিযোগ, কর্পোরেট সংস্থাগুলির আগ্রাসী বিপণন কৌশল ক্রেতাদের প্রভাবিত করছে। নানা অফার ও ডিসকাউন্টের লোভে একসঙ্গে বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। অথচ পণ্য বদলানো বা পরিষেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময় সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে বলেও দাবি তাঁদের। ছোট দোকানগুলির মতে, গুণগত মান ও বিশ্বাসযোগ্যতার দিক থেকে এখনও তারা অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে।
শুধু পুরনো দোকানই নয়, নতুন করে শুরু হওয়া অনেক ছোট ব্যবসাও কয়েক মাসের মধ্যে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কর্মহীন হয়ে পড়ছেন বহু মানুষ। দোকানের সঙ্গে যুক্ত কর্মচারীদের ভবিষ্যৎ নিয়েও বাড়ছে অনিশ্চয়তা।
পুরনো দোকানদারদের আশা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। কিছু ‘পকেট কাস্টমার’ বা নিয়মিত ক্রেতার ভরসায় এখনও দোকানগুলো টিকে আছে। কিন্তু ব্যবসা যে ক্রমশ কমছে, তা স্বীকার করছেন সকলেই। তবে কর্পোরেট শপিংমলের বক্তব্য তাদের ব্যবসা ঠিক আছে, এর জন্য বিশেষ কোনো সমস্যা হবে না।
পুরনো দোকানগুলির ও ছোট ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, এই প্রবণতা চলতে থাকলে একসময়ের প্রাণবন্ত ছোট বাজার সংস্কৃতি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে। শুধু দোকান নয়, হারিয়ে যাবে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, বিশ্বাস আর আবেগের সেই অদৃশ্য বন্ধন। আরামবাগের পুরনো দোকানদারদের চোখে এখন তাই একটাই প্রশ্ন—এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত তারা টিকে থাকতে পারবেন তো?


![]()

More Stories
বেপরোয়া বাইক, বেআইনি ইঞ্জিন ভ্যান ও নিয়মভাঙা পার্কিং—চাপ বাড়ছে রাস্তায়, উদ্বেগে সাধারণ মানুষ
স্মৃতির ধুলোমাখা টিনের ট্রাঙ্ক: আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া এক পৈতৃক স্পন্দন
অর্ধশতকের ঐতিহ্য ধরে টিকে আছে আরামবাগের একমাত্র কাঁসা-পিতল পালিশের দোকান