হোলি ও দোল পূর্ণিমা: রঙ, ভক্তি ও মিলনের উৎসব

সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ বসন্তের আগমনে প্রকৃতি যখন নতুন সাজে সেজে ওঠে, তখনই বাঙালির দুয়ারে কড়া নাড়ে দোল পূর্ণিমা বা হোলি। এটি কেবল রঙের উৎসব নয়, এর পেছনে রয়েছে গভীর আধ্যাত্মিক, সামাজিক ও পৌরাণিক মাহাত্ম্য। হোলি এবং দোল পূর্ণিমা একই দিনে পালিত হলেও তাদের আচার, ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। উত্তর ভারতে এটি মূলত হোলি নামে পরিচিত, আর পূর্বভারত—বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে—এটি দোল পূর্ণিমা হিসেবে পালিত হয়। দোল বা হোলি হলো বসন্তের উৎসব (বসন্তোৎসব)। শীতের জড়তা কাটিয়ে প্রকৃতিতে যখন নতুন পাতা ও ফুলের জোয়ার আসে, তখন মানুষও সেই আনন্দকে বরণ করে নেয় রঙের মাধ্যমে। শান্তিনিকেতনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রবর্তিত ‘বসন্তোৎসব’ এই প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের এক অনন্য উদাহরণ।

হোলির পৌরাণিক মাহাত্ম্য- হোলির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভক্ত প্রহ্লাদ ও অসুররাজ হিরণ্যকশিপু-র কাহিনি। হিরণ্যকশিপুর বোন হোলিকা অগ্নিতে অক্ষত থাকার বর পেয়েছিলেন। প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে আগুনে বসেও তিনি দগ্ধ হন, আর প্রহ্লাদ ভগবানের কৃপায় রক্ষা পান। সেই থেকেই “হোলিকা দহন” অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তির জয়ের প্রতীক।

দোল পূর্ণিমা বিশেষভাবে শ্রীকৃষ্ণরাধা-র লীলার সঙ্গে যুক্ত। বৃন্দাবনে কৃষ্ণের রঙ খেলার ঐতিহ্য থেকেই দোলের সূচনা বলে বিশ্বাস। এই দিন মন্দিরে রাধা-কৃষ্ণের বিগ্রহকে দোলায় বসিয়ে আবির ও গুলাল দিয়ে আরাধনা করা হয়।

পশ্চিমবঙ্গে দোল উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু-র জন্মতিথি। তাই একে “গৌর পূর্ণিমা”ও বলা হয়। বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মধ্যে এই দিনটি অত্যন্ত পবিত্র। বাঙালি হিন্দুদের কাছে এই দিনটির গুরুত্ব অপরিসীম কারণ ১৪৮৬ খ্রিষ্টাব্দের এই পূর্ণিমা তিথিতেই নবদ্বীপে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জন্ম হয়। তাই বৈষ্ণব সমাজে এটি ‘গৌর পূর্ণিমা’ হিসেবে পরম শ্রদ্ধার সাথে উদযাপিত হয়। সংকীর্তন আর ভক্তিগীতিতে মুখরিত হয়ে ওঠে মঠ ও মন্দিরগুলো।

শান্তিনিকেতনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই উৎসবকে এক অনন্য রূপ দিয়েছেন। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নিবিড় যোগাযোগ স্থাপনে তাঁর প্রবর্তিত ‘বসন্তোৎসব’ আজ বিশ্ববন্দিত। আবির খেলা আর রবীন্দ্রসঙ্গীতের মূর্ছনায় সেখানে রঙের উৎসব হয়ে ওঠে এক সাংস্কৃতিক মহামিলন।

Loading