প্রধানের চেয়ার ছেড়ে আজ দিনমজুর: সততার মূল্যেই গর্বিত গোঘাটে ভাদুরের মনসা মুদি

ক্ষমতা ছিল, সুযোগ ছিল—তবু নিজের জন্য কিছু নেননি। আজ হার্টের অসুখ নিয়ে দিনমজুরি করেই চলছে সংসার, তবু নেই আক্ষেপ, আছে শুধু মানুষের সম্মান

সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ গোঘাটের ভাদুর অঞ্চলের লঙ্কাবেরিয়া গ্রামের এক সাধারণ মানুষ। বয়স এখন প্রায় ষাট। শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা রোগ, বিশেষ করে হৃদরোগের যন্ত্রণা। তবু প্রতিদিন ভোরে ঘুম ভাঙে তার—কারণ কাজ না করলে চলবে না সংসার, জুটবে না ওষুধ। এই মানুষটির নাম মনসা মুদি। এক সময় তিনি ছিলেন বামফ্রন্ট আমলের ভাদুর পঞ্চায়েতের প্রধান। ময়ের স্রোতে অনেক স্মৃতি যেমন ঝাপসা হয়ে যায়, তেমনই নিজের দীর্ঘ পথচলার কিছু মুহূর্তও ঠিক করে মনে রাখতে পারেননি মনসা মুদি। তিনি বলেন, আনুমানিক ২০০৬ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত তিনি পঞ্চায়েত প্রধানের দায়িত্ব সামলেছিলেন। কিন্তু বয়সের ভার এবং সময়ের দূরত্ব হয়তো তাঁর স্মৃতিকে একটু ধোঁয়াশা করে দিয়েছে। আসলে সেই দায়িত্বপূর্ণ অধ্যায়টি ছিল ২০০৮ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত। সেই সময়ে মানুষের সেবা, গ্রামের উন্নয়ন আর সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অসংখ্য স্মৃতি আজও জড়িয়ে আছে তাঁর জীবনের সঙ্গে। বছর পেরিয়ে গেলেও মানুষের জন্য কাজ করার সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে এখনও তাঁর চোখেমুখে ফুটে ওঠে এক অদ্ভুত আবেগ আর গর্বের ছাপ। কিন্তু আজ সেই প্রাক্তন প্রধানই মানুষের জমিতে দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালান।

সকালবেলা কখনো মাঠে নেমে ধান কাটার কাজ, কখনো আবার রাজমিস্ত্রির জোগাড়ের কাজ—যে কাজ পান, সেটাই করেন। কারণ কাজ না করলে ঘরে উনান জ্বলে না।

মনসা মুদির কথায়, ক্ষমতা ছিল, কিন্তু লোভ ছিল না “প্রধান ছিলাম ঠিকই, কিন্তু নিজের জন্য কিছু করার কথা কখনো মাথায় আসেনি। মানুষ আমাকে দায়িত্ব দিয়েছিল, তাই মানুষের কাজটাই করেছি।”

তিনি মনে করেন, বর্তমান সময়ে অনেক পঞ্চায়েত প্রধান বা সদস্যদের মধ্যে যে ব্যক্তিস্বার্থ দেখা যায়, তিনি সেই পথ থেকে সবসময় দূরে থেকেছেন। তার কথায়—”আমার কোনো লোভ-লালসা ছিল না, এখনো নেই। শুধু নিষ্ঠা নিয়ে কাজ করেছি।”

ক্ষমতার সময় নিজের বা পরিবারের জন্য কোনো সুবিধা নেননি বলেও দাবি করেন তিনি। এমনকি তার স্ত্রীর চাকরির সুযোগ থাকলেও সেই সুযোগ কাজে লাগাননি। তার বিশ্বাস ছিল—নিজের পরিশ্রমেই সংসার চালানোই সৎ পথ।

সংসার এখন দুই জনের

মনসা মুদির সংসারে এখন তিনি আর তার স্ত্রী মঙ্গলা দেবী।

দুটি মেয়ের বহু আগেই বিয়ে হয়ে গেছে। একমাত্র ছেলে চেন্নাইয়ে একটি পেট্রোল পাম্পে কাজ করে।

তাই গ্রামের বাড়িতে দম্পতির সংসার চলছে খুবই কষ্টে। নিজের তেমন কোনো জমিজমা নেই। অন্যের জমিতে কাজ করেই উপার্জন করতে হয়।

এক সময় দলের হয়ে কাজ করেছেন, পঞ্চায়েত পরিচালনা করেছেন—তবু এখন সেই ভাবে আর খোঁজ নেয় না দল।

তিনি অকপটে বলেন,

*”মিটিং-মিছিলে ডাক আসে ঠিকই, কিন্তু পেটের টানে কাজ ছেড়ে যাওয়া যায় না। কাজ না করলে তো সংসার চলবে না।”*

বঞ্চনার কথা তিনি স্বীকার করেন, কিন্তু তার কণ্ঠে নেই কোনো ক্ষোভ বা তীব্র আক্ষেপ। যেন জীবন তাকে অনেক কিছু শিখিয়ে দিয়েছে।

বর্তমানে তিনি কোনো সরকারি সুযোগ-সুবিধা পান না বললেই চলে। তবে তার স্ত্রী রাজ্যের লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পের টাকা পান।

তবু মনসা মুদির সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি অন্য জায়গায়। তিনি বলেন, “এখনো ভাদুর অঞ্চলের মানুষ আমাকে সম্মান দেয়। তৃণমূলের লোকজনও সম্মান করে। সম্মানই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি এটাই আমার বড় পাওনা। এতে বুক ভরে যায়।”*রাজনীতি বদলেছে, ক্ষমতা বদলেছে—কিন্তু মানুষের সম্মান এখনও অটুট।

এখন তার শরীরও আগের মতো নেই। হৃদরোগে ভুগছেন, নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়। স্ত্রী মঙ্গলা দেবীরও রয়েছে নানা শারীরিক সমস্যা।

এই পরিস্থিতিতে তিনি মনে করেন, তার মতো প্রাক্তন জনপ্রতিনিধিদের জন্য কোনো বিশেষ ভাতা বা সহায়তার ব্যবস্থা থাকা উচিত। কারণ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজ করার ক্ষমতাও কমে যাচ্ছে।

সততার এক নিঃশব্দ গল্প গোঘাটের গ্রামবাংলায় মনসা মুদির জীবন যেন এক নিঃশব্দ বার্তা রেখে যায়—

ক্ষমতা মানুষের জীবনে আসে, আবার চলে যায়। কিন্তু সততা আর মানুষের ভালোবাসা থেকে যায় চিরকাল।

আজ তিনি আর পঞ্চায়েতের প্রধান নন।

তিনি একজন সাধারণ দিনমজুর।

তবু অঞ্চলের মানুষ তাকে আজও সম্মান করে সেই “প্রধানবাবু” বলেই—আর সেই সম্মানেই ভরে ওঠে তার বুক।

Loading