“আমরাই এখন গরু”— আলুর দামে ধস, চোখের জলে মাঠে নেমেছে গোঘাটের কৃষক পরিবার

সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ মাঠে সোনালি আলুর পাহাড়, অথচ কৃষকের ঘরে আনন্দ নেই— আছে শুধু দুশ্চিন্তা আর হতাশা। আলুর বাজারদর এতটাই তলানিতে যে, খরচ তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন চাষিরা। ফলে বাধ্য হয়ে গোঘাটের বহু কৃষক নিজেদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নেমে পড়েছেন আলু তোলার কাজে। গরু বা শ্রমিক ভাড়া করার সামর্থ্য নেই, তাই মদিনার নিরঞ্জন নন্দী বলছেন— “আমরাই এখন গরু হয়ে গেছি।”গোঘাটের বিভিন্ন গ্রামে দেখা যাচ্ছে এক হৃদয়বিদারক ছবি। মাটি থেকে আলু তোলার জন্য প্রয়োজন গরু, হাল-বলদ ও লাঙল। কিন্তু গরু ভাড়া করলে অতিরিক্ত খরচ। সেই খরচ আর বহন করা সম্ভব নয়। তাই পরিবারের পুরুষরা নিজেরাই লাঙল কাঁধে তুলে মাঠে নেমেছেন। এক কৃষকের আক্ষেপ, “গরু আনতে গেলেও খরচ আছে। আলুর যে দাম, তাতে গরু দিয়ে আলু ভাঙা পোষাবে না। তাই নিজেরাই গরুর কাজ করছি।” শুধু পুরুষরাই নন, পরিবারের বৃদ্ধ মহিলারাও মাঠে নেমেছেন আলু কুড়োতে। কারণ বাইরে থেকে শ্রমিক আনলে খরচ বেড়ে যাবে আরও। শরীর খারাপ এই রৌদ্রে তাতেও আসতে হয়েছে আলু জমিতে জানাচ্ছেন চায়না নন্দী।অনেক ক্ষেত্রে স্কুলপড়ুয়া ছেলেমেয়েদেরও মাঠে নিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছেন বাবা-মায়েরা জানাচ্ছেন বলরামপুরের কৃষক স্বপন সাঁতরা। ক্লাস এইটের এক ছাত্রকে তার বাবা মাঠে নিয়ে এসেছেন আলু তুলতে। কারণ শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না, আর পাওয়া গেলেও মজুরি দেওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই বলে জানাচ্ছে এক অষ্টম শ্রেণীর স্কুল ছাত্র মৃত্যুঞ্জয়। চাষিরা বলছেন, ফসল ঘরে তোলার সময় সাধারণত যে আনন্দ থাকে, এবার সেই আনন্দের ছিটেফোঁটাও নেই। বরং রয়েছে অনিশ্চয়তা। কেউ কেউ হতাশার সুরে বলছেন, “ব্যাংক বা মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে আলু চাষ করেছি। এই দামে আলু বিক্রি হলে ঋণ শোধ করা অসম্ভব। অনেক চাষিরই মনে হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করা ছাড়া আর কোনও পথ থাকবে না।”। কৃষকদের অভিযোগ, সারের দামও তাদের চাপে ফেলছে। বস্তার গায়ে যে দাম লেখা থাকে, বাস্তবে তার থেকেও বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। শুধু তাই নয়, অনেক সময় সারের সঙ্গে বিভিন্ন আনুষঙ্গিক জিনিসও নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। হরিপদ সাঁতরা নামে এক চাষির বক্তব্য, “আমরা চাষিরা একজোট নই বলেই সার ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে খালি বস্তার ব্যবসায়ী— সবাই সুযোগ নিচ্ছে। নানা ভাবে কালোবাজারি হচ্ছে। কিন্তু আমাদের পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই।”। এদিকে গোঘাটের কৃষি কর্মাধ্যক্ষা মানসী দেবী জানান, এ বছর আবহাওয়া অনুকূল ছিল এবং উন্নত প্রজাতির চাষ হওয়ায় আলুর ফলন খুব বেশি হয়েছে। গোঘাট কৃষি দপ্তরের এডিএ সৌরভ বর্মন বলেন, “ফলন অনেক বেশি হওয়ায় বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। চাষিদের উচিত শুধু আলুর ওপর নির্ভর না করে বিকল্প ফসলের দিকে ঝোঁকা। বিভিন্ন রবিশস্য চাষ করলে ঝুঁকি কমবে।”। সারের অতিরিক্ত দামের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি জানান, এ ধরনের কোনও লিখিত অভিযোগ এখনও তার কাছে আসেনি। অভিযোগ এলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি তিনি জানান, গোঘাটে আলুর বীজ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী বছর থেকে কিছু চাষির হাতে সেই বীজ তুলে দেওয়া সম্ভব হবে।‌ রঘুবাটির সমবায় সমিতির ম্যানেজার বলেন, অনেক সময় সারের সঙ্গে কিছু ট্যাগিং পণ্য নিতে হয়। কৃষি দপ্তরের আধিকারিক সৌরভবাবু আশ্বাস দেন, সরকার বিষয়টি নিয়ে ভাবছে এবং খুব শিগগিরই চাষিদের কাছ থেকে আলু কেনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পশ্চিমবঙ্গ প্রকৃতিশীল আলু ব্যবসায়ী সমিতির রাজ্য সম্পাদক ও হুগলি জেলা আলু ব্যবসায়ী সমিতির সম্পাদক লালু মুখার্জী বলেন, “এবার আলুর ফলন অনেক বেশি হয়েছে। চাষিদেরও ভাবতে হবে বিকল্প পদ্ধতিতে চাষ করার কথা।” সারের দাম নিয়ে অভিযোগ থাকলে স্থানীয় বিডিও অফিস বা কৃষি দপ্তরে জানানোরও পরামর্শ দেন তিনি।তবে মাঠের বাস্তব ছবিটা একেবারেই অন্যরকম। পরিবারের সবাই মিলে লাঙল ধরেছেন, মাটির বুক চিরে আলু তুলছেন— কিন্তু সেই আলু ঘরে তুলেও মুখে হাসি নেই। চোখে শুধু একটাই প্রশ্ন— এই চাষ করে কি আদৌ বাঁচা যাবে?

oplus_0

Loading