শ্রম সংহিতায় ডিজিটাল ও মিডিয়া কর্মীদের স্বীকৃতি: সুনিশ্চিত হচ্ছে সামাজিক সুরক্ষা ও আইনি অধিকার

সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ দেশে শ্রম সংস্কারের পথে বড় পদক্ষেপ হিসেবে নতুন শ্রম সংহিতার আওতায় ডিজিটাল অডিও-ভিজ্যুয়াল কর্মী, ইলেকট্রনিক মিডিয়া কর্মী, ডাবিং আর্টিস্ট এবং স্টান্ট পার্সনদের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করা এই পেশাজীবীরা এতদিন পর্যাপ্ত আইনি সুরক্ষা ও স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত ছিলেন। নতুন এই ব্যবস্থার ফলে তারা এখন থেকে শ্রম আইন অনুযায়ী বিভিন্ন অধিকার, সামাজিক সুরক্ষা এবং নিরাপত্তার সুবিধা পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।.ভারতের শ্রম আইনে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর নতুন শ্রম সংহিতায় (Labour Codes) ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং আধুনিক মিডিয়া কর্মীদের জন্য বিশেষ স্বীকৃতির কথা বলা হয়েছে। এর ফলে কয়েক লক্ষ কন্টেন্ট ক্রিয়েটর, অনলাইন নিউজ পোর্টালের সাংবাদিক, ভিডিও এডিটর এবং ফ্রিল্যান্স মিডিয়া কর্মীরা প্রথমবারের মতো আইনি সুরক্ষার আওতায় আসতে চলেছেন।

এতদিন ভারতের শ্রম আইন মূলত কারখানা বা প্রথাগত অফিস কর্মীদের ওপর ভিত্তি করে তৈরি ছিল। কিন্তু নতুন সংহিতায় ‘গিগ ওয়ার্কার’ (Gig Worker) এবং ‘প্ল্যাটফর্ম ওয়ার্কার’ শব্দবন্ধের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে ডিজিটাল কর্মীদের কাজের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। সংবাদপত্রের জগতের বাইরেও যারা ফেসবুক, ইউটিউব বা বিভিন্ন ওয়েব পোর্টালে তথ্য সরবরাহের কাজ করেন, তারা এখন থেকে শ্রম আইনের সুরক্ষা পাবেন।

যে সব অধিকার ও সুরক্ষা বাড়বে

নতুন এই শ্রম সংহিতায় ডিজিটাল কর্মীদের জন্য মূলত চারটি প্রধান স্তম্ভে সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে:

১. সামাজিক সুরক্ষা তহবিল (Social Security Fund):

ডিজিটাল ও গিগ কর্মীদের জন্য একটি কেন্দ্রীয় সামাজিক সুরক্ষা তহবিল গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই তহবিল থেকে কর্মীদের দুর্ঘটনা বিমা, জীবন বিমা, পেনশন এবং মাতৃত্বকালীন সুবিধা প্রদান করা হবে। সংস্থাগুলিকে তাদের বার্ষিক আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ (১% থেকে ২%) এই তহবিলে জমা দিতে হতে পারে।

২. কাজের সময় ও ওভারটাইম:

ডিজিটাল মিডিয়া কর্মীদের অনেক সময় অনিয়মিত এবং অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হয়। নতুন সংহিতায় কাজের সর্বোচ্চ সময়সীমা নির্ধারণ এবং নির্দিষ্ট সময়ের বেশি কাজের জন্য ‘ওভারটাইম’ বা অতিরিক্ত পারিশ্রমিক নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

৩. নিয়োগপত্র ও আইনি চুক্তি:

এখন থেকে ডিজিটাল মাধ্যমে কর্মরত যে কোনও কর্মীকে নিয়োগের সময় একটি বিস্তারিত চুক্তিপত্র বা অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার দেওয়া বাধ্যতামূলক। এর ফলে বিনা নোটিশে কাজ থেকে ছাঁটাই বা বেতন আটকে রাখার মতো অনিয়ম বন্ধ হবে।

৪. স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিধি:

অফিসে বা ফিল্ডে কাজ করার সময় কর্মীদের পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে হবে নিয়োগকারী সংস্থাকেই। যদি কোনও কর্মী অসুস্থ হন বা পেশাগত কারণে চোট পান, তবে তার চিকিৎসার খরচ বা ক্ষতিপূরণ সংস্থাকে বহন করতে হবে।

এক নজরে মিডিয়া কর্মীদের প্রাপ্তি

অধিকারের ক্ষেত্রবর্তমান অবস্থানতুন সংহিতার প্রস্তাব
বীমা সুবিধাঅধিকাংশেরই নেই।ইএসআই (ESI) ও জীবন বীমা বাধ্যতামূলক।
পেনশনকেবল স্থায়ী কর্মীদের জন্য।ডিজিটাল কর্মীদের জন্য কন্ট্রিবিউটরি পেনশন স্কিম।
অভিযোগ কেন্দ্রঅভিযোগ জানানোর সঠিক ফোরাম ছিল না।শ্রম ট্রাইব্যুনালে সরাসরি আবেদনের সুযোগ।
ছুটির নিয়মনির্ধারিত ছুটির অভাব।নির্দিষ্ট বাৎসরিক ও অসুস্থতাকালীন ছুটি।

শ্রম বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি একটি অত্যন্ত প্রগতিশীল পদক্ষেপ। এতদিন ডিজিটাল মিডিয়া ছিল এক প্রকার ‘অসংগঠিত ক্ষেত্র’। এই স্বীকৃতির ফলে মেধাসত্ত্ব রক্ষা (Intellectual Property) এবং শ্রমের মর্যাদার মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি হবে। তবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ডিজিটাল নিউজ পোর্টালগুলি এই আর্থিক দায়ভার কীভাবে বহন করবে, তা নিয়ে কিছু মহলে প্রশ্নও রয়েছে।এই সিদ্ধান্তের ফলে বিনোদন ও মিডিয়া শিল্পে কর্মরত বহু মানুষের কাজের পরিবেশ উন্নত হবে এবং তাদের পেশাগত পরিচয় আরও সুসংহত হবে। একইসঙ্গে কর্মীদের ন্যায্য মজুরি, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং কর্মস্থলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।

কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলী কার্যকর হলে ভারতের ডিজিটাল ইকোসিস্টেম আরও স্বচ্ছ ও শক্তিশালী হবে। বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে থাকা কর্মীদের একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে এনে তাদের অধিকার রক্ষা করাই এই শ্রম সংহিতার মূল লক্ষ্য। ডিজিটাল মিডিয়ার তরুণ কর্মীদের মধ্যে এই খবর আশার আলো সঞ্চার করেছে।

Loading