একসময় গ্রামের প্রাণ ছিল বিএসএনএল, আজ নিঃসঙ্গ এক্সচেঞ্জে শুধুই অতীতের প্রতিধ্বনি

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: একটা সময় ছিল, গ্রামের কোনও বাড়িতে টেলিফোন থাকা মানেই সেই বাড়ির আলাদা সম্মান। সন্ধ্যা নামলেই আশেপাশের মানুষ এসে জিজ্ঞেস করতেন— “কলকাতা থেকে ফোন আসবে?”, “ছেলে কি দুবাই থেকে কথা বলবে?”, “একটু ফোনটা করতে দেবেন?”। টেলিফোন তখন শুধুই যোগাযোগের যন্ত্র ছিল না, ছিল আবেগ, সামাজিক সম্পর্ক আর বিশ্বাসের এক অনন্য সেতুবন্ধন।আজ সেই স্মৃতির সাক্ষী হয়ে গ্রামের মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে মরচে ধরা টেলিফোনের খুঁটি। শহরের অলিতে গলিতে এখনো চোখে পড়ে পুরনো ডিপি বক্স, কেবল জয়েন্টের লোহার বাক্স কিংবা বন্ধ হয়ে যাওয়া টেলিফোন এক্সচেঞ্জ। যেন তারা নীরবে বলে চলেছে— “একদিন আমরাই ছিলাম যোগাযোগের প্রাণকেন্দ্র।”এই স্মৃতির নামই Bharat Sanchar Nigam Limited — বিএসএনএল। যখন টেলিফোন মানেই ছিল বিএসএনএল, ২০০০ সালের ১৫ই সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় ভারত সঞ্চার নিগম লিমিটেড বা বিএসএনএল, কিন্তু এই ২৬ বছরে উন্নতি জায়গায় অবনতির দিকে চলে গেছে এই সংস্থা। যদিও তার আগেই দেশের টেলিকম পরিষেবা পরিচালনা করত ভারত সরকারের টেলিকম বিভাগ (DoT)। স্বাধীনতার পর বহু দশক ধরে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যোগাযোগের একমাত্র ভরসা ছিল সরকারি টেলিফোন ব্যবস্থা।তখন মোবাইল ফোন ছিল না। ইন্টারনেট ছিল কল্পনার বিষয়। গ্রামে একটি ফোন সংযোগ পেতে অনেক সময় বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হতো। তবু মানুষ অপেক্ষা করতেন। কারণ টেলিফোন ছিল প্রয়োজন, মর্যাদা এবং আধুনিকতার প্রতীক। তারপর ধীরে ধীরে ডায়লআপ ইন্টারনেট কানেকশন শুরু হয়। সেই কানেকশনের এক অদ্ভুত ধরনের আওয়াজ শোনা যেত, ইন্টারনেট ব্যবহার করার সময় ফোনের ব্যবহার করা যেত না। তারপর আস্তে আস্তে আসে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পরিষেবা। সেখানে একই সাথে ফোন এবং হাই স্পিড ইন্টারনেট ব্যবহার করা যেতো। আর ছিল ফ্যাক্স, অর্থাৎ এখনকার এর মত কোন ডকুমেন্টস বা ছবি নকল কপি পাঠাতে ব্যবহার করা হতো। পাহাড়, জঙ্গল, সীমান্ত, দ্বীপাঞ্চল— যেখানে বেসরকারি সংস্থার ব্যবসায়িক আগ্রহ ছিল না, সেখানে তার টেনে, খুঁটি বসিয়ে, এক্সচেঞ্জ তৈরি করে যোগাযোগ পৌঁছে দিয়েছিল বিএসএনএল। দেশের বহু দুর্গম গ্রামে প্রথম “হ্যালো” শব্দটি পৌঁছেছিল এই সংস্থার হাত ধরেই। যেখানে তারের সংযোগের সমস্যা ছিল সেখানে ডাব্লু এল এল কানেকশন দেওয়া হতো। বিভিন্ন এলাকায় এখনো বিএসএনএলের ল্যান্ডলাইন কানেকশনের তামার তারের জাল এখনো বিছানো আছে, তবে সেগুলি নিষ্ক্রিয়ভাবে পড়ে রয়েছে। টেলিফোন ডাইরেক্টরির সেই দিনগুলিআজকের প্রজন্ম হয়তো কল্পনাও করতে পারবে না, একসময় মোটা টেলিফোন ডাইরেক্টরি বই ছিল প্রতিটি অফিস ও বহু বাড়ির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই বইয়ে রাজ্য ও দেশের হাজার হাজার মানুষের ল্যান্ডলাইন নম্বর লেখা থাকত। ব্যক্তিগত বা কোন প্রতিষ্ঠানের নাম্বার জানা না থাকলে সেই বই থেকে খোঁজে ফোন করা হতো। কারও বাড়িতে ফোন এলে পাশের বাড়ির মানুষ খবর দিতে দৌড়ে যেতেন। অনেক সময় কোনও পরিবারের বিদেশে থাকা ছেলে ফোন করবে বলে গোটা পাড়া অপেক্ষা করত। একজন প্রবীণ গ্রামবাসীর কথায়,“ফোনটা শুধু একটা যন্ত্র ছিল না, পুরো গ্রামের আবেগ ছিল।” পিসিও বুথ — এক হারিয়ে যাওয়া সমাজচিত্র, একটা সময় রাস্তাঘাটে হলুদ রঙের STD-ISD বুথ ছিল ভারতের যোগাযোগ ব্যবস্থার বিপ্লব। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে ফোন করতেন। প্রেমের কথা, চাকরির খবর, অসুস্থতার সংবাদ— সবকিছুই সেই বুথ ঘিরেই। আজ সেই বুথগুলি প্রায় ইতিহাস।হুগলির গোঘাটের হারাধন রায় এক প্রাক্তন টেলিফোন বুথ মালিক স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন,“রাতে অনেক সময় লোক এসে কাঁদতে কাঁদতে ফোন করত। কারও বাড়িতে অসুখ, কারও ছেলে বাইরে কাজ করে। ফোন করিয়ে দিয়ে মনে হতো মানুষের কাজে লাগতে পারছি। এখন দোকানে শুধু পুরনো বিলিং মেশিন আর মৃত টেলিফোন পড়ে আছে। দূরদূরান্ত থেকে লোকে আসতো ফোন করতে, নকুণ্ডা কামারপুকুর ভাদুর ইত্যাদি এলাকা থেকে।” প্রযুক্তির বদল, আর পিছিয়ে পড়া বিএসএনএলসময়ের সঙ্গে টেলিকম জগতে আসে বেসরকারি সংস্থার প্রবেশ। উন্নত প্রযুক্তি, দ্রুত পরিষেবা, আকর্ষণীয় অফার এবং আধুনিক মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে তারা দ্রুত বাজার দখল করতে শুরু করে।অন্যদিকে, অভিযোগ উঠতে থাকে বিএসএনএলের পরিষেবা নিয়ে।ল্যান্ডলাইনে দীর্ঘদিন বিকল, সংযোগ মোবাইল নেটওয়ার্কের দুর্বলতা,ধীরগতির ইন্টারনেট, আধুনিকীকরণে বিলম্ব ফলে গ্রাহক পরিষেবার অবনতিধীরে ধীরে মানুষ বিকল্প খুঁজতে শুরু করেন।কেউ কেউ অভিযোগ করেন, একাংশ অসাধু আধিকারিকের গাফিলতি এবং নীতিগত দুর্বলতার কারণেও বিএসএনএল পিছিয়ে পড়ে। যদিও এই অভিযোগের সরকারি প্রমাণ নেই, তবে বহু প্রাক্তন কর্মী মনে করেন সময়মতো প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ ও আধুনিকীকরণ হলে পরিস্থিতি অন্যরকম হতে পারত। ফোরজি-ফাইভ জির যুগে পিছিয়ে পড়া, যখন বেসরকারি টেলিকম সংস্থাগুলি ৪জি থেকে ৫জি পরিষেবায় এগিয়ে গেল, তখনও দেশের বহু জায়গায় বিএসএনএলের ৪জি পরিষেবা সীমিত রয়ে যায়। অনেক এলাকায় টাওয়ারের কাছাকাছি থেকেও দুর্বল সিগন্যালের অভিযোগ রয়েছে। আরামবাগের এক মোবাইল গ্রাহক শংকর বাবু জানান আরামবাগের বাইরে গেলে আর নেটওয়ার্ক থাকে না, ইন্টারনেট পরিষেবা সমস্যা হলে অনেক পরে সমাধান হয়, আগে যে সমস্ত প্ল্যান সস্তায় ছিল সেই প্ল্যানগুলোই বর্তমানে দিন সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। কুড়ি বছর ধরে ব্যবহার করছেন এক প্রবীণ ব্যক্তি রনজিত মন্ডল বলেন আরামবাগের মধ্যে পরিষেবার কোন সমস্যা নেই তবে বাইরে গেলে সমস্যা আছে ইন্টারনেটের সমস্যা আছে, বাড়ির সকলেই তারা বিএসএনএল পরিষেবা ব্যবহার করে। বিএসএনএলের সিমের এক রিটেলার অমলেন্দু পাঁজা জানান ফোন করতে হলে বাড়ি থেকে হাফ কিলোমিটার দূরে এসে তবে সিগনাল পাওয়া যায়। শুধুমাত্র বিএসএনএল এর উপর ভরসা করে থাকা যায় না অন্য বেসরকারি কোম্পানিও ব্যবহার করতে হচ্ছে। গ্রাহকরা সকলেই বিরক্ত হয়ে যাচ্ছেন। গ্রাহক সংখ্যা কমছে ফলে ব্যবসা কমে যাচ্ছে। তার মতে টাওয়ারের সংখ্যা আরো বাড়ানো এবং আরও উন্নত প্রযুক্তিই পারে বিএসএনএলকে আবার ঘুরে দাঁড়াতে। রাজ্যে বিজেপি সরকার পশ্চিমবঙ্গ এখন বিজেপি এসেছে। তাই যৌথ উদ্যোগে আবার বিএসএনএলকে সঠিক জায়গায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।ফলে নতুন প্রজন্মের গ্রাহকেরা ধীরে ধীরে দূরে সরে যান।তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনও বিএসএনএলের হাতে বিশাল পরিকাঠামো রয়েছে—হাজার হাজার মোবাইল টাওয়ার, বিস্তীর্ণ অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক, গ্রামীণ এক্সচেঞ্জ ব্যবস্থা সরকারি যোগাযোগ ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা। এই সম্পদ সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে আবার ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব। কর্মীদের চোখে হারিয়ে যাওয়া এক গৌরব বিএসএনএলের বহু চুক্তিভিত্তিক কর্মী আজও বিভিন্ন এক্সচেঞ্জ বা অফিসের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। এক্সচেঞ্জগুলিতে সুইচ রুমের আর কোন কাজ নেই। টিক টিক শব্দ আর হয় না, আর মিটার রিডিং নিতে হয় না। কেউ দীর্ঘদিন নিয়মিত বেতন পাননি, কেউ কাজ হারিয়েছেন। তবু তাঁদের চোখে আজও এক অদ্ভুত আবেগ। এক প্রাক্তন টেকনিশিয়ানের অভিজিৎ ঘোষের কথায়,“ঝড়বৃষ্টি মাথায় নিয়ে রাতভর লাইন সারিয়েছি। একটা গ্রামে ফোন চালু হলে মানুষ মিষ্টি খাওয়াত। এখন সেই খুঁটি, সেই তার, সব পড়ে আছে। মনে হয় নিজের শরীরের অংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।” গ্রামবাংলার নিঃসঙ্গ এক্সচেঞ্জ পশ্চিমবঙ্গের বহু গ্রামে এখনো পুরনো টেলিফোন এক্সচেঞ্জ দাঁড়িয়ে আছে। কোথাও ভাঙা জানলা, কোথাও আগাছায় ঢাকা ক্যাম্পাস, কোথাও ধুলো জমা সুইচিং রুম— যেন এক হারিয়ে যাওয়া যুগের জাদুঘর। কিন্তু এই মৃতপ্রায় পরিকাঠামোর মধ্যেই অনেক বিশেষজ্ঞ সম্ভাবনা দেখছেন। বর্তমানে ফাইবার ব্রডব্যান্ড পরিষেবা চালু থাকলেও প্রচারের অভাব, দুর্বল পরিষেবা এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক এলাকায় গ্রাহক সংখ্যা কম। আবার কি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে বিএসএনএল?বিশেষজ্ঞ মহলের একাংশ মনে করছেন, সরকারি সদিচ্ছা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা থাকলে বিএসএনএল আবারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।বিশেষ করে—গ্রামীণ ইন্টারনেট, সাশ্রয়ী মোবাইল পরিষেবা, সরকারি ডিজিটাল পরিকাঠামো, দুর্যোগকালে জরুরি যোগাযোগক্ষেত্রে বিএসএনএল এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। অনেকের মতে, বেসরকারি সংস্থার তুলনায় কম মূল্যে নির্ভরযোগ্য পরিষেবা দিতে পারলে সাধারণ মানুষের আগ্রহ আবার বাড়তে পারে। এক ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকের কথায়,“মানুষ এখনো সরকারি সংস্থার উপর একটা বিশ্বাস রাখে। শুধু পরিষেবা ভালো হতে হবে। নেটওয়ার্ক, টাওয়ার আর গ্রাহক পরিষেবা আধুনিক হলেই মানুষ আবার ফিরবে।” আমরা চেষ্টা করেছিলাম আরামবাগের বিএসএনএলের আধিকারিক এর সাথে কথা বলার কিন্তু এই ব্যাপারে তিনি কোন কথা বলতে চাননি। বিএসএনএল শুধু একটি সংস্থা নয়, এক সামাজিক স্মৃতি।বিএসএনএলকে শুধুমাত্র একটি টেলিকম কোম্পানি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি ভারতের সামাজিক পরিবর্তনেরও এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর আমলে টেলিকম যোগাযোগ মন্ত্রী তপন শিকদারের হাত ধরে দেশে আসে এক টেলিকম বিপ্লব। প্রথম ফোনকল, প্রথম বিদেশে কথা বলা, চাকরির খবর, পরীক্ষার ফল, দূরের আত্মীয়ের কণ্ঠ— কোটি কোটি ভারতীয়ের জীবনের আবেগ জড়িয়ে আছে এই সংস্থার সঙ্গে। আজ মোবাইল ফোনের যুগে যোগাযোগ মুহূর্তের ব্যাপার। কিন্তু সেই সহজ যোগাযোগের ভিত গড়ে দিয়েছিল যে প্রতিষ্ঠান, তার নাম আজও মানুষের স্মৃতিতে রয়ে গেছে গভীর আবেগ নিয়ে। হয়তো কোনও একদিন আবার গ্রামের সেই পুরনো খুঁটির তারে নতুন সিগন্যাল বইবে। হয়তো আবার কোনও নিঃসঙ্গ এক্সচেঞ্জে আলো জ্বলবে। আর তখনই হয়তো মানুষ নতুন করে মনে করবে—একদিন এই বিএসএনএল-ই গোটা দেশকে কথা বলতে শিখিয়েছিল।

Loading