আরামবাগ পৌরসভার দুরবস্থা, দুর্নীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে মুখ খুললেন বিজেপি কাউন্সিলর বিশ্বজিৎ ঘোষ

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: আরামবাগ পৌরসভার একমাত্র বিজেপি কাউন্সিলর বিশ্বজিৎ ঘোষ এবার সরাসরি পৌর প্রশাসনের একাধিক সমস্যা, আর্থিক সংকট এবং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা নিয়ে মুখ খুললেন। রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন প্রশাসনিক পরিবেশে আরামবাগের উন্নয়ন কতটা সম্ভব, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম আমরা।

আলোচনায় বিশ্বজিৎ ঘোষ দাবি করেন, “মানুষ পরিবর্তন চেয়েছিল, পরিবর্তন হয়েছে। এবার আরামবাগের উন্নয়নের জন্য বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নেওয়া হবে।” তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে পৌরসভার কার্যত কোনও সুস্পষ্ট মাস্টার প্ল্যান ছিল না। শহরের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন, নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ বা নাগরিক পরিকাঠামো নিয়ে পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার বদলে সব ক্ষেত্রেই আপসের রাজনীতি চলেছে। বিশ্বজিৎ ঘোষের বক্তব্য অনুযায়ী, আরামবাগ পৌরসভা এখনও পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ নগর পরিকল্পনা বা মাস্টার প্ল্যান তৈরি করতে পারেনি। ফলে কোথায় কত উচ্চতার বিল্ডিং হবে, নির্মাণের নিয়ম কী হবে, নাগরিক সুবিধা কতটা নিশ্চিত করা হবে—এই সব বিষয়েই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, বড় বড় বহুতল বা বাণিজ্যিক ভবনের ক্ষেত্রেও সঠিক হারে কর আদায় করা হয়নি। বরং কম ট্যাক্স নিয়ে পৌরসভাকে আর্থিকভাবে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, “যে পৌরসভা সঠিকভাবে রাজস্ব আদায় করতে পারে না, সেই পৌরসভা কখনও উন্নয়নের বড় কাজ করতে পারবে না।” পৌরসভার বিভিন্ন পরিষেবা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিজেপি কাউন্সিলর। তাঁর অভিযোগ, বাড়ির প্ল্যান পাস করানো, সাবমার্সিবল বসানো বা অন্যান্য প্রশাসনিক কাজে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়েছে। তিনি সরাসরি বলেন, “পৌরসভা দুর্নীতির আঁতুড়ঘরে পরিণত হয়েছে।” এমনকি পৌরসভা ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর দাবি, পৌরসভা ভবনের উপরে বড় বড় বট ও অশ্বত্থ গাছ জন্মে গেছে, যা প্রশাসনিক অব্যবস্থারই প্রতীক।

তবে শুধুই অভিযোগ নয়, পরিবর্তনের আশ্বাসও দিয়েছেন বিশ্বজিৎ ঘোষ। তিনি বলেন, আগামী ছয় মাসের মধ্যে আরামবাগে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হবে। বিশেষ করে শহরকে “গ্রীন সিটি” হিসেবে গড়ে তুলতে পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক সচেতনতার উপর জোর দেওয়া হবে।

তিনি জানান, বর্জ্য ফেলার জন্য পৌরসভার নিজস্ব নির্দিষ্ট জায়গা রয়েছে এবং সেখানে আধুনিক পদ্ধতিতে বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। তাঁর মতে, “শুধু পরিষ্কার শহর নয়, পরিবেশবান্ধব শহর গড়ে তুলতে হবে।”

আরামবাগের স্বাস্থ্য পরিষেবার দুরবস্থার উদাহরণ হিসেবে প্রাক্তন সাংসদ অপরূপা পোদ্দার এর তহবিলের অর্থে কেনা একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অ্যাম্বুলেন্সে এমপি ফান্ড থেকে দেওয়া সেই অ্যাম্বুলেন্স দীর্ঘদিন ধরে বিকল অবস্থায় পড়ে রয়েছে। গাড়ির উপর লতাপাতা জন্মেছে, শ্যাওলা ধরে গেছে, অথচ তা সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বিশ্বজিৎ ঘোষের দাবি, পরিচালনাকারী কর্মীর অভাব এবং ফান্ডের ঘাটতির কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তাঁর কথায়, “পৌরসভার আর্থিক অবস্থা তলানিতে পৌঁছে গেছে।” পল্লীশ্রী থেকে বাঁধের রাস্তার খারাপ অবস্থার প্রসঙ্গ উঠতেই তিনি জানান, ওই রাস্তার দায়িত্ব মূলত সেচ দপ্তরের। তবে সেই ক্ষেত্রেও কাটমানির অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর মতে, বহু প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ হলেও বাস্তবে কাজের মান অত্যন্ত খারাপ। রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পরে আরামবাগেও উন্নয়নের নতুন আশা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিজেপি নেতৃত্ব। যদিও বাস্তবে কত দ্রুত পরিবর্তন আসে, পৌরসভার আর্থিক ও প্রশাসনিক সংকট কতটা কাটানো যায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। একদিকে দুর্নীতি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও নাগরিক পরিষেবার ঘাটতির অভিযোগ, অন্যদিকে “গ্রীন সিটি” গড়ার প্রতিশ্রুতি—এই দুইয়ের মাঝখানেই এখন দাঁড়িয়ে আরামবাগ পৌরসভা।

Loading