সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: নবান্নে ফেস রিকগনিশন বায়োমেট্রিক অ্যাটেনডেন্স সিস্টেম চালুর সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে প্রশাসনিক সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সময়ানুবর্তিতা, উপস্থিতি সংক্রান্ত স্বচ্ছতা এবং কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এই ব্যবস্থা কি শুধুমাত্র নবান্নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তা রাজ্যের প্রতিটি সরকারি দপ্তরে সম্প্রসারিত হবে? বাস্তবিক অর্থে প্রশাসনিক সংস্কারের সুফল তখনই সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে, যখন জেলা, মহকুমা, ব্লক, পঞ্চায়েত, পুরসভা, ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তর, বিডিও অফিস, এসডিও অফিস, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, হাসপাতাল, বিদ্যালয়, কলেজ এবং বিভিন্ন জনপরিষেবা কেন্দ্রেও একই ধরনের বায়োমেট্রিক উপস্থিতি ব্যবস্থা চালু হবে। কারণ সাধারণ মানুষ প্রতিদিন নবান্নে যান না; তাঁরা পরিষেবা নিতে যান স্থানীয় সরকারি অফিসে। ফলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হলে সংস্কারের পরিধি গোটা প্রশাসনিক কাঠামো জুড়ে বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন। তবে শুধুমাত্র বায়োমেট্রিক হাজিরা চালু করলেই প্রশাসনিক সমস্যার সমাধান হবে না। উপস্থিতি নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি সরকারি কাজের অগ্রগতির স্বচ্ছতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আজও বহু মানুষ জানেন না তাঁদের আবেদনপত্র, অভিযোগ, জমির নথি, সামাজিক প্রকল্পের আবেদন বা অন্য কোনো সরকারি ফাইল কোন স্তরে রয়েছে, কার টেবিলে রয়েছে অথবা কতদিন ধরে আটকে আছে। এই সমস্যার সমাধানে প্রতিটি সরকারি পরিষেবা ও অভিযোগের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। যেখানে একজন নাগরিক নিজের আবেদন নম্বর ব্যবহার করে জানতে পারবেন— তাঁর আবেদন বর্তমানে কোন দপ্তরে রয়েছে, কোন আধিকারিকের কাছে ফাইলটি আছে,কতদিন ধরে ফাইলটি মুলতুবি রয়েছে, কোনো আপত্তি বা ঘাটতি থাকলে তার কারণ কী, সমাধানের জন্য কী পদক্ষেপ প্রয়োজন, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কাজ সম্পন্ন না হলে দায়িত্ব কার, এতে অপ্রয়োজনীয় দৌড়ঝাঁপ যেমন কমবে, তেমনি মধ্যস্বত্বভোগী ও দুর্নীতির সুযোগও অনেকাংশে হ্রাস পাবে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনসাধারণ ও সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে যোগাযোগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা। সরকারি অফিসে নাগরিকরা বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের জন্য আধিকারিক ও কর্মচারীদের সঙ্গে দেখা করেন। সেই সাক্ষাৎকার বা আলোচনার সমগ্র অংশ যদি আইনসম্মত পদ্ধতিতে অডিও-ভিডিও রেকর্ডিংয়ের আওতায় আনা যায় এবং তা নিরাপদ ডিজিটাল আর্কাইভে সংরক্ষিত হয়, তাহলে বহু বিতর্ক ও অভিযোগের নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি সম্ভব হবে। অনেক সময় আধিকারিক বা কর্মচারীরা নিজেদের বিশেষ স্বার্থে সাধারণ মানুষকে ভুল তথ্য পরিবেশন করেন এবং হেনস্থা করেন, আবার কোন ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ আধিকারিক বা কর্মচারীদের সাথে খারাপ ব্যবহার করেন। ফলে সমস্ত বিষয় রেকর্ড থাকবে। একজন আধিকারিক বা কর্মচারী সারাদিনে কি কি কাজ করলেন, কি কি কাজ বাকি রইল, কি কারনে বাকি রইল এবং কাজের ক্ষেত্র অফিসের ভিতর না বাহিরে, ফিল্ডে কাজ করতে গেলে তার সম্পূর্ণ ট্রাকিং, ভিডিও রেকর্ডিং, কি কাজ করছে তার বিস্তারিত রেকর্ড রাখা দরকার। এর ফলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা পাওয়া যেতে পারে—প্রথমত, সরকারি কর্মচারীরা দুর্নীতি, ঘুষ বা অসদাচরণের অভিযোগ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারবেন। দ্বিতীয়ত, সাধারণ নাগরিকরাও মিথ্যা অভিযোগ বা অসৌজন্যমূলক আচরণ থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হবেন। তৃতীয়ত, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা বাড়বে এবং বিরোধের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ প্রমাণ হিসেবে রেকর্ডিং ব্যবহার করা সম্ভব হবে। চতুর্থত, নাগরিক পরিষেবার মানোন্নয়নে এটি একটি কার্যকর মূল্যায়ন ব্যবস্থা হিসেবেও কাজ করতে পারে। তবে এই ধরনের ব্যবস্থা চালুর ক্ষেত্রে নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, তথ্য সুরক্ষা এবং আইনগত অধিকার রক্ষার বিষয়টিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। তথ্য সংরক্ষণ, ব্যবহার ও প্রবেশাধিকারের স্পষ্ট নীতি ছাড়া কোনো প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে না। প্রশাসনিক সংস্কারের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—প্রতিটি সরকারি পরিষেবার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ,নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরিষেবা না দিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কারণ দর্শানোর ব্যবস্থা, দুর্নীতির অভিযোগের জন্য স্বাধীন ডিজিটাল অভিযোগ ব্যবস্থা, সরকারি প্রকল্পের অর্থ বণ্টন ও ব্যয়ের রিয়েল-টাইম তথ্য প্রকাশ, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কর্মদক্ষতার বার্ষিক মূল্যায়নে জনমতের নির্দিষ্ট ভূমিকা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে ফাইলের অস্বাভাবিক বিলম্ব বা দুর্নীতির সম্ভাব্য ঝুঁকি চিহ্নিতকরণ, প্রতিটি সরকারি অফিসে নাগরিক সনদ (Citizen Charter) এবং প্রতিটি সরকারি দপ্তরে অফিসের সামনে উক্ত দপ্তরের নাম, ঠিকানা, ফোন নাম্বার ইমেইল আইডি কার্যকারী সময় এবং সমস্ত কর্মচারী আধিকারিকদের নাম এবং তাদের অফিসিয়াল কোন ফোন নাম্বার থাকে তা উল্লেখ করা বাধ্যতামূলকভাবে প্রদর্শন। ডিজিটাল ইন্ডিয়া এবং স্বচ্ছ প্রশাসনের লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে প্রযুক্তিকে কেবল উপস্থিতি নথিভুক্ত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। প্রযুক্তিকে প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নাগরিকবান্ধব পরিষেবা নিশ্চিত করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।ফেস রিকগনিশন বায়োমেট্রিক অ্যাটেনডেন্স সিস্টেম সেই দীর্ঘ যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হতে পারে। তবে প্রকৃত সাফল্য তখনই আসবে, যখন সাধারণ মানুষ ঘরে বসেই জানতে পারবেন তাঁর কাজ কোথায়, কেন আটকে আছে এবং কবে তার সমাধান হবে। স্বচ্ছ, দ্রুত ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের জন্য এটাই হতে পারে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় সংস্কার।


![]()

More Stories
ছয় মাসের নীরবতার পর শেষ হল নাসার ম্যাভেন মিশন
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনজীবী পরিচয় ঘিরে বিতর্ক, রিপোর্ট তলব বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়ার
অপারেশন সিন্দুরের প্রথম বর্ষপূর্তিতে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী বার্তা প্রধানমন্ত্রীর