সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: কর্নাটক থেকে উঠে আসা এক উদ্বেগজনক তথ্য গোটা দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তর এবং এইডস প্রতিরোধ কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সি ৭ হাজারেরও বেশি তরুণ তরুণী এবং কলেজপড়ুয়া HIV-এ আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছে। এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে কর্নাটক সরকার রাজ্যের সমস্ত সরকারি, বেসরকারি ও অনুদানপ্রাপ্ত কলেজে HIV পরীক্ষা, কাউন্সেলিং এবং সচেতনতামূলক ক্যাম্প চালুর নির্দেশ দিয়েছে। সরকারের মতে, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সংক্রমণের হার উদ্বেগজনকভাবে বাড়তে থাকায় দ্রুত আক্রান্তদের শনাক্ত করা, চিকিৎসার আওতায় আনা এবং নতুন সংক্রমণ রোধ করাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা শুধু কর্নাটকের সমস্যা নয়, বরং গোটা দেশের জন্য একটি সতর্কবার্তা। কারণ, HIV এমন একটি ভাইরাস যা ধীরে ধীরে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ধ্বংস করে দেয় এবং চিকিৎসা না হলে শেষ পর্যন্ত AIDS-এ রূপ নিতে পারে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সচেতনতা কর্মসূচি চললেও এখনও যৌন স্বাস্থ্য সম্পর্কে অজ্ঞতা, অসুরক্ষিত যৌন সম্পর্ক, মাদক গ্রহণের সময় একই সূঁচ বা সিরিঞ্জ ব্যবহার, সংক্রমিত রক্ত গ্রহণ এবং সামাজিক কুসংস্কারের কারণে বহু মানুষ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজলভ্যতা, ডেটিং অ্যাপের ব্যবহার, সচেতনতার অভাব এবং নিরাপদ যৌন আচরণ সম্পর্কে পর্যাপ্ত শিক্ষা না থাকাও সংক্রমণের অন্যতম কারণ হয়ে উঠছে। তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেকেই লজ্জা বা সামাজিক ভয়ের কারণে সময়মতো HIV পরীক্ষা করান না, ফলে সংক্রমণ অজান্তেই অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ে। চিকিৎসকদের মতে, HIV স্পর্শ, আলিঙ্গন, একসঙ্গে বসে খাওয়া, একই শ্রেণিকক্ষে পড়াশোনা করা কিংবা মশার কামড়ের মাধ্যমে ছড়ায় না। তাই HIV আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি বৈষম্য বা সামাজিক বয়কট সম্পূর্ণ অমানবিক এবং বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল। বর্তমানে আধুনিক অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি (ART)-এর মাধ্যমে HIV আক্রান্ত ব্যক্তি দীর্ঘদিন সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন, যদি সময়মতো রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা শুরু করা যায়। কর্নাটক সরকারের কলেজভিত্তিক ক্যাম্পের উদ্দেশ্যও আতঙ্ক সৃষ্টি করা নয়, বরং তরুণদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, স্বেচ্ছায় পরীক্ষা করার মানসিকতা তৈরি করা এবং প্রয়োজনে দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র কর্নাটক নয়, পশ্চিমবঙ্গ-সহ দেশের প্রতিটি রাজ্যে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বৈজ্ঞানিক যৌন শিক্ষা, HIV সম্পর্কে সঠিক তথ্য, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং সচেতনতামূলক কর্মসূচি আরও জোরদার করা প্রয়োজন। কারণ, HIV-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় অস্ত্র আতঙ্ক নয়, সচেতনতা। কর্নাটকের এই ঘটনা প্রমাণ করে, সময় থাকতে ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। তাই সরকারের পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার, সমাজ এবং তরুণ প্রজন্ম—সকলের সম্মিলিত উদ্যোগেই এই নীরব স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলা সম্ভব। HIV-কে লুকিয়ে রাখা নয়, বরং বৈজ্ঞানিক তথ্য, নিয়মিত পরীক্ষা, নিরাপদ জীবনযাপন এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিই পারে এই সংক্রমণকে নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং আগামী প্রজন্মকে একটি সুস্থ ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ উপহার দিতে।

![]()

More Stories
বর্তমান সময়ে অনেক কিশোর-কিশোরীর বিপথে যাওয়ার অন্যতম বড় কারণ হলো অল্প বয়সেই “পার্সোনাল রুম” সংস্কৃতি !
ঐতিহ্যবাহী বাঁশে পোড়ানো ‘নাটুয়া জ্যাকুয়াম সল্ট ’: প্রাকৃতিক লবণের নতুন পরিচয়, নাকি শুধু বিপণনের কৌশল?
জামাইষষ্ঠী কী এবং কেন পালন করা হয়?