September 13, 2026

প্রণাম কাকে বলে? প্রণামের প্রকারভেদ, বিধি ও শাস্ত্রসম্মত নিয়ম

প্রণাম অর্থ কী

সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ ‘প্রণাম’ শব্দের অর্থ—নম্রতা, শ্রদ্ধা ও আত্মসমর্পণের মাধ্যমে ভক্তিপূর্বক নত হওয়া। দেবতা, গুরু, বয়োজ্যেষ্ঠ, সাধু-সন্ত, পিতা-মাতা প্রমুখের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের শাস্ত্রসম্মত পদ্ধতিই প্রণাম। এটি কেবল বাহ্যিক ভঙ্গি নয়—মন, বাক্য ও কর্মের সমন্বয়ে ভক্তির প্রকাশ।

শাস্ত্র মতে প্রণাম মানুষের অহংকার হ্রাস করে, শিষ্টাচার বৃদ্ধি করে এবং পূজার পূর্ণতা প্রদান করে। বিশেষত দেবপূজার শেষে প্রণাম অত্যন্ত প্রশস্ত বলে শাস্ত্রে বলা হয়েছে।

শাস্ত্র অনুযায়ী প্রণাম কত প্রকার

শাস্ত্রানুসারে প্রণাম প্রধানত চার প্রকার

  1. সাষ্টাঙ্গ (অষ্টাঙ্গ) প্রণাম
  2. পঞ্চাঙ্গ প্রণাম
  3. কায়িক প্রণাম
  4. বাচিক প্রণাম

এর মধ্যে অষ্টাঙ্গ ও পঞ্চাঙ্গ প্রণামই দেবপূজায় বিশেষ প্রশস্ত। পূজান্তে এইরূপ প্রণাম করা কর্তব্য। আর পূজাকালে পূজক যদি আসনে উপবিষ্ট থাকেন, তবে করযোড়ে প্রণাম করবেন।

(১) সাষ্টাঙ্গ বা অষ্টাঙ্গ প্রণাম

তন্ত্রসারে বলা হয়েছে—

“পদ্ভ্যাং করাভ্যাং জানুভ্যামুরসা শিরসা দৃশা।
বচসা মনসা চৈব প্রণামোহষ্টাঙ্গ ঈরিতঃ।”

—তন্ত্রসার

অর্থাৎ—
পদদ্বয়, হস্তদ্বয়, জানুদ্বয়, বক্ষ, মস্তক, চক্ষু, বাক্য ও মন—এই অষ্ট অঙ্গ দ্বারা যে প্রণাম, তাকেই অষ্টাঙ্গ প্রণাম বলা হয়।

মহাকাল সংহিতায় বলা হয়েছে—

“অলিকং নাসিকা বাহু বক্ষো জঠরমেব চ।
পাদৌ ক্ষমাং স্পূশতো দণ্ডপ্রণাম: স হি গদ্যতে।”

—মহাকাল সংহিতা

অর্থাৎ—
মাথা, নাক, দুই হাত, বক্ষ, উদর ও দুই পা যখন ভূমি স্পর্শ করে, তখন তা দণ্ডপ্রণাম নামে পরিচিত।

এই অষ্টাঙ্গ দ্বারা দণ্ডবৎ (লাঠির মতো সম্পূর্ণভাবে নত হওয়া—পূর্ণ সমর্পণ) প্রণতি নিবেদন করাকেই সাধারণভাবে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম বলা হয়।

(২) পঞ্চাঙ্গ প্রণাম

বৃহৎ তন্ত্রসারে বলা হয়েছে—

“বাহিভ্যাঞ্চৈব জানুভ্যাং শিরসা বচসা দৃশা।
পঞ্চাঙ্গোহয়ং প্রণামঃ স্যাৎ পূজাসু প্রবরাবিমৌ।। ”

—বৃহৎ তন্ত্রসার

অর্থাৎ—
বাহুদ্বয়, জানুদ্বয়, মস্তক, বাক্য ও চক্ষু—এই পঞ্চ অঙ্গ দ্বারা যে প্রণাম, সেটিই পঞ্চাঙ্গ প্রণাম।

(৩) কায়িক প্রণাম (কালিকা পুরাণ মতে)

কালিকা পুরাণ অনুসারে কায়িক প্রণাম তিন রকম—

উত্তম কায়িক প্রণাম:
জানুদ্বয় ও মস্তক ভূমি স্পর্শ করে প্রণাম।

মধ্যম কায়িক প্রণাম:
জানু ভূমি স্পর্শ না করে কেবল মস্তক ভূমি স্পর্শ করে প্রণাম।

অধম কায়িক প্রণাম:
জানু বা মস্তক কোনোটিই ভূমি স্পর্শ না করে কেবল করজোড় করে মস্তকে স্পর্শ করে প্রণাম।

(৪) বাচিক প্রণাম (কালিকা পুরাণ মতে)

কালিকা পুরাণ মতে বাচিক প্রণামও তিন প্রকার—

উত্তম বাচিক প্রণাম:
নিজে গদ্য-পদ্য রচনা করে ভক্তিপূর্বক নমস্কার।

মধ্যম বাচিক প্রণাম:
পৌরাণিক/বৈদিক নমস্কার মন্ত্র উচ্চারণ করে নমস্কার।

অধম বাচিক প্রণাম:
কেবল সাধারণ ভাষায় নমস্কার নিবেদন।

ভিড় বা চলন্ত অবস্থায় কীভাবে প্রণাম করবেন

অত্যন্ত ভিড়, ঠেলাঠেলি বা চলন্ত গাড়ির মতো পরিস্থিতিতে যদি সম্পূর্ণভাবে সাষ্টাঙ্গ/পঞ্চাঙ্গ করা সম্ভব না হয়, তবে অন্তত করজোড় করে ভক্তিসহ প্রণাম করা যেতে পারে।
তবে মন্দিরে এসে সুযোগ হলে সাষ্টাঙ্গ বা পঞ্চাঙ্গ প্রণাম করাই শাস্ত্রসম্মত কর্তব্য

আধুনিক “এক আঙুল কপালে” প্রণাম যথাযথ কি?

শাস্ত্রসম্মত প্রণামের ক্ষেত্রে কেবল দাঁড়িয়ে থেকে এক আঙুল কপালে স্পর্শ করে প্রণাম নিবেদন করার রীতি পূর্ণ প্রণামের বিকল্প নয়। দেবপূজায় শাস্ত্র যেভাবে দণ্ড/পঞ্চাঙ্গ প্রণাম নির্দেশ করেছে, সেই বিধিই অনুসরণীয়।

বিগ্রহের সম্মুখে ফিরে প্রণাম করা যায় কি?

শাস্ত্র অনুযায়ী ভগবদ্ বিগ্রহের একেবারে সম্মুখে সামনাসামনি ফিরে, অথবা বিগ্রহের পিছনে, কিংবা অত্যন্ত কাছে দাঁড়িয়ে প্রণাম করা অনুচিত বলে ধরা হয়। প্রণামেরও স্থান ও দিক-নির্দেশ আছে।

পুরোহিত দর্পণে বলা হয়েছে—

“স্ববামে প্রণমেদ্বিষ্ণু দক্ষিণে শক্তি শঙ্করৌ।
প্রণমেচ্চ গুরুরোগ্রে চান্যথা নিস্ফলং ভবেৎ।। ”

—পুরোহিত দর্পণ (পৃঃ ৪৭)

অর্থাৎ—
বিষ্ণুকে নিজের বামে রেখে, শক্তি ও শঙ্করকে নিজের ডানদিকে রেখে, এবং গুরুদেবকে সামনে রেখে প্রণাম করা উচিত। অন্যথায় সেই প্রণাম নিস্ফল হতে পারে।

দেবীকে প্রণাম করার বিধি

তন্ত্র মতে দেবীর পূজিত পট বা বিগ্রহকে নিজের ডানদিকে রেখে আসনে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করা শাস্ত্রসম্মত। শুধু খালি মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণামকে শাস্ত্রসম্মত রীতির মধ্যে ধরা হয় না—এ বিষয়ে শাস্ত্রে সতর্কতা রয়েছে।

কমপক্ষে তিনবার প্রণাম করার নির্দেশও পাওয়া যায়। কালিকা পুরাণে বলা হয়েছে—

“ত্রিবিধে চ নমস্কারে কায়িকশ্চত্তোম স্মৃতঃ।
কায়িকৈস্তু নমস্কারৈদের্বাস্তুষ্যন্তি নিত্যশঃ।। ”

—কালিকা পুরাণ ৭১/৭২

অর্থাৎ—
তিন প্রকার নমস্কারের মধ্যে কায়িক প্রণাম সর্বশ্রেষ্ঠ, এবং এই কায়িক প্রণামেই দেব-দেবী সর্বদা সন্তুষ্ট হন।

প্রণামের মহিমা ও ফল

কালিকা পুরাণে প্রণামের মহিমা সম্পর্কে বলা হয়েছে—নমস্কারে দেবতা, মানুষ, গন্ধর্ব, যক্ষ, রাক্ষস, পন্নগসহ নানা মহাত্মাগণ তুষ্ট হন। নমস্কার আয়ু বৃদ্ধি করে, জয়লাভে সহায়তা করে এবং সর্বসিদ্ধির প্রশস্ত উপায় বলে গণ্য।

দুর্গাদেবীর প্রণামফল বিষয়ে শাক্তানন্দ তরঙ্গিণীতে বলা হয়েছে—

“যে নমন্তি নরা দুর্গা শ্রদ্ধয়া পবযাহন্বিতাঃ।
অশ্বমেধফলং প্রাপ্য দুর্গালোকং ব্রজন্তিতে।। ”

—শাক্তানন্দ তরঙ্গিণী

অর্থাৎ—
যাঁরা শ্রদ্ধাসহ দুর্গামাতাকে প্রণাম করেন, তাঁরা অশ্বমেধ যজ্ঞের ফল লাভ করে দুর্গালোকে গমন করেন—এমনই শাস্ত্রোক্ত বিশ্বাস।

পুরুষ ও নারীর প্রণাম বিধি

শাস্ত্রানুসারে সাধারণভাবে দেবপূজায় সাষ্টাঙ্গ ও পঞ্চাঙ্গ প্রণাম প্রশস্ত। বহু আচার-অনুশাসনে নারীদের ক্ষেত্রে পঞ্চাঙ্গ প্রণামকে অধিক উপযুক্ত বলা হয়। পুরুষদের ক্ষেত্রে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম অধিক প্রচলিত ও প্রশস্ত বলে মানা হয়।
তবে স্থান, আচার, পরিবার-পরম্পরা ও গুরু-নির্দেশ অনুযায়ী বিধান অনুসরণ করাই শ্রেয়।

প্রণাম কেবল একটি সামাজিক শিষ্টাচার নয়—এটি ভক্তির অনুশীলন, আত্মসমর্পণের প্রকাশ এবং পূজার পূর্ণতা। শাস্ত্র যে প্রণাম-পদ্ধতি নির্দেশ করেছে, তা যথাসম্ভব পালন করলে দেবপূজার ফল বৃদ্ধি পায় এবং মনেও আসে শুদ্ধতা ও বিনয়। আধুনিক ব্যস্ত জীবনে সবসময় পূর্ণ প্রণাম সম্ভব না হলেও, মন্দিরে এসে সুযোগ থাকলে শাস্ত্রসম্মত সাষ্টাঙ্গ বা পঞ্চাঙ্গ প্রণাম করাই কর্তব্য।

Loading