সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর একটি দৃশ্য প্রায় সর্বত্রই দেখা যায়। বিজয়ী প্রার্থীদের ঘিরে শুরু হয় অভিনন্দন, সংবর্ধনার বন্যা। বিভিন্ন ক্লাব, সংগঠন, সমিতি, ব্যবসায়ী সংগঠন, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত উদ্যোগেও আয়োজন করা হয় একের পর এক অনুষ্ঠান। ফুল, উত্তরীয়, স্মারক ও শুভেচ্ছাবার্তায় ভরে ওঠে জনপ্রতিনিধিদের দিনপঞ্জি। গণতান্ত্রিক সমাজে মানুষের ভালোবাসা ও শুভেচ্ছার এই প্রকাশ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু এর মধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—এই সম্বর্ধনার সংস্কৃতি কি কখনও কখনও জনসেবার মূল উদ্দেশ্যকে আড়াল করে দিচ্ছে না? বিশেষ করে যখন নতুন সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা বলছে, প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, তখন জনপ্রতিনিধিদেরও কিছু বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। কারণ সমাজের সব সংগঠন, প্রতিষ্ঠান বা সমিতি যে একই উদ্দেশ্যে সম্বর্ধনার আয়োজন করে, এমন নয়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকার আকাঙ্ক্ষা থেকে কিছু সংগঠন নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করে। আজ যারা সম্মান জানাচ্ছে, আগামী দিনে তারাই কোনো সরকারি সুবিধা, বিশেষ সুযোগ বা প্রশাসনিক সহানুভূতি প্রত্যাশা করতে পারে। এটাই বাস্তবতা।0তাই কোনো সংগঠনের আমন্ত্রণ গ্রহণের আগে জনপ্রতিনিধিদের নিজেদের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন রাখা জরুরি। যে সংগঠন আজ সংবর্ধনা দিচ্ছে, তারা অতীতে সমাজের জন্য কী কাজ করেছে? পরিবেশ রক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক উন্নয়ন বা জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে তাদের অবদান কতটা? পূর্ববর্তী সরকারের সময় তারা কীভাবে পরিচালিত হয়েছে? তাদের বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতি বা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে কি? যদি কোথাও অন্যায় হয়ে থাকে, তারা কি তার বিরুদ্ধে কখনও প্রতিবাদ করেছে বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন জনপ্রতিনিধির প্রথম দায়িত্ব কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা গোষ্ঠীর প্রতি নয়; তাঁর দায়িত্ব সাধারণ মানুষের প্রতি। সেই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা অপরিহার্য। অত্যধিক ঘনিষ্ঠতা অনেক সময় অজান্তেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাকে প্রভাবিত করতে পারে। ভবিষ্যতে কোনো সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে, অতীতের সৌজন্য ও সম্পর্ক যেন প্রশাসনিক পদক্ষেপের পথে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়। আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়। ভোটের আগে প্রার্থীরা মানুষের দরজায় দরজায় গিয়েছেন, আশীর্বাদ চেয়েছেন, সমস্যা শুনেছেন, পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু নির্বাচনে জয়ের পর সেই একই মানুষের কাছে ফিরে যাওয়ার পরিবর্তে যদি অধিকাংশ সময় কেটে যায় সংবর্ধনা মঞ্চে, তবে জনসংযোগের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। বিজয় মিছিল ও সম্বর্ধনা সাময়িক; কিন্তু মানুষের সমস্যা স্থায়ী। রাস্তা, পানীয় জল, স্বাস্থ্য পরিষেবা, কর্মসংস্থান, কৃষি কিংবা শিক্ষা—এই প্রশ্নগুলির সমাধানই একজন জনপ্রতিনিধির প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি। তাই এখন সময় এসেছে সম্বর্ধনার সংস্কৃতি নিয়েও নতুন করে ভাবার। যে অর্থ, শ্রম ও সময় একটি সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানের জন্য ব্যয় হয়, তার একটি অংশ যদি জনসেবামূলক কাজে ব্যয় করা হতো, তাহলে সমাজের উপকার অনেক বেশি হতো। যারা জনপ্রতিনিধিকে সম্মান জানাতে চান, তারা চাইলে একটি জনসংযোগ কেন্দ্র, একটি পাঠাগার, একটি স্বাস্থ্য শিবির বা মানুষের অভিযোগ জানানোর জন্য একটি স্থায়ী অফিস গড়ে তুলতেও সহযোগিতা করতে পারেন। সেটিই হবে প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক অংশীদারিত্ব। জনপ্রতিনিধিদেরও উচিত নিয়মিত সময় নির্ধারণ করে জনসাধারণের জন্য অফিস খোলা রাখা, সরাসরি মানুষের অভিযোগ ও সমস্যার কথা শোনা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে তার সমাধানের চেষ্টা করা। কারণ জনগণের ভোটে নির্বাচিত একজন বিধায়ক বা সাংসদের সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি কতগুলো সম্বর্ধনা পেয়েছেন তা নয়; বরং তিনি কতটা সময় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। গণতন্ত্রে সম্মান অবশ্যই মূল্যবান। কিন্তু সেই সম্মান যেন জনস্বার্থের ঊর্ধ্বে না উঠে যায়। সম্বর্ধনার ফুল শুকিয়ে যায়, স্মারক ধুলো জমে; কিন্তু মানুষের বিশ্বাস ও আস্থা দীর্ঘস্থায়ী। সেই আস্থা অর্জন ও ধরে রাখার একমাত্র পথ হলো স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নিরলস জনসেবা। নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তি হওয়া উচিত সেখানেই।

![]()

More Stories
সামরিক নার্সিং পরিষেবার অতিরিক্ত মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নিলেন মেজর জেনারেল র্যাচেল থমাস
সঙ্গীতজগতের এক স্বর্ণযুগের অবসান, প্রয়াত সুমন কল্যাণপুর
আজ বিশ্ব তামাক বর্জন দিবস: সচেতনতা বাড়াতেই বিশ্বজুড়ে নানা কর্মসূচি