১৯৭৫ সালের ২৫ জুন,জরুরি অবস্থার অন্ধকারে অধ্যাপক হরিপদ ভারতী: জেলের পাঁচিল পেরিয়ে গণতন্ত্র, প্রকৃতি ও শ্রীঅরবিন্দ-স্মরণ

সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ ভারতের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের ২৫ জুন একটি বিতর্কিত ও স্মরণীয় দিন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী-র নেতৃত্বে দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর সংবিধানপ্রদত্ত একাধিক মৌলিক অধিকার স্থগিত করা হয়। সংবাদপত্রের উপর আরোপিত হয় সেন্সরশিপ, বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের বিনা বিচারে গ্রেফতার করা হয় এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাধীনতা ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়ে।

এই সময়ে গ্রেফতার হওয়া হাজার হাজার রাজনৈতিক বন্দীর মধ্যে অন্যতম ছিলেন ভারতীয় জনসঙ্ঘের বিশিষ্ট নেতা, দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক হরিপদ ভারতী। ১৯৭৫ সালের ২৭ জুন ‘মিসা’ (Maintenance of Internal Security Act) আইনে তাঁকে গ্রেফতার করে কলকাতার প্রেসিডেন্সি জেল-এ বন্দি রাখা হয়।

পরবর্তীকালে কারাবাসের সময় স্ত্রী প্রগতি ভারতীকে লেখা তাঁর গোপন চিঠিগুলির সংকলন থেকেই প্রকাশিত হয় বিখ্যাত গ্রন্থ জেলে মিসা বাইরে মিসা। সেই গ্রন্থে একদিকে যেমন জরুরি অবস্থার কঠোর বাস্তবতা উঠে এসেছে, অন্যদিকে তেমনি ধরা পড়েছে জেলের ভেতরে তাঁর দেখা এক বিস্ময়কর প্রকৃতি-জগতের ছবি।

কারাগারে প্রথম রাত কাটানোর পর ভোরবেলায় অধ্যাপক ভারতীর চোখে ধরা পড়ে এক অনন্য দৃশ্য। উঁচু পাঁচিলবেষ্টিত জেলের অভ্যন্তরে ছিল সুপরিকল্পিত ফুলের বাগান। স্বর্ণচাঁপা, গোলাপ, বেল, গন্ধরাজ, কামিনী, কাঁঠালিচাঁপা, রজনীগন্ধা, সূর্যমুখী, হাসনাহানা, শিউলি, অপরাজিতা—নানান ফুলের সমারোহে মুখর ছিল সেই পরিবেশ।

তিনি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করেন, কঠোর কারাজীবনের মধ্যেও প্রকৃতি যেন বন্দিদের মানসিক আশ্রয় হয়ে উঠেছে। সুবাসিত ফুলের সারি, ঝাউগাছের ছায়া এবং সুসজ্জিত পথঘাট জেলের নিষ্ঠুর বাস্তবতার সঙ্গে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য সৃষ্টি করেছিল।

শুধু উদ্ভিদ নয়, জেলের অভ্যন্তরে ছিল পাখিদেরও এক সমৃদ্ধ আবাস। পাকা পেয়ারা খেতে আসা টিয়াপাখির ঝাঁক, আমগাছের ডালে বসে থাকা হলদে বউকথাকও পাখি এবং বিশাল আমগাছ ও পামগাছ জুড়ে নিশিবকের উপনিবেশ তাঁকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছিল।

দর্শনের অধ্যাপক হরিপদ ভারতী এই প্রকৃতির মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলেন মুক্তির এক অনুভূতি। বন্দিদশার মধ্যেও প্রকৃতির সৌন্দর্য তাঁর মনকে আশাবাদী রেখেছিল বলে তাঁর লেখনী থেকে স্পষ্ট হয়।

জরুরি অবস্থার সময় কারাবন্দি রাজনৈতিক কর্মীরা জেলের মধ্যেই স্বাধীনতা দিবস পালন করেন। বন্দেমাতরম ও ‘জয় হিন্দ’ ধ্বনির মধ্যে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়।

অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে বন্দিরা শ্রদ্ধা জানান সুভাষচন্দ্র বসু-র স্মৃতির প্রতি। এরপর তাঁরা যান শ্রীঅরবিন্দ-র স্মৃতিবিজড়িত সেই ঐতিহাসিক প্রকোষ্ঠে, যেখানে আলিপুর বোমা মামলার সময় তিনি বন্দি ছিলেন।

হরিপদ ভারতী তাঁর স্মৃতিচারণায় উল্লেখ করেছেন, শ্রীঅরবিন্দের আবক্ষ মূর্তিতে মাল্যদান, ভগবান বাসুদেব, শ্রীঅরবিন্দ ও শ্রীমায়ের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন এবং অরবিন্দ-বন্দনা গানের মাধ্যমে সেই অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। এমনকি বহু সাধারণ অপরাধী বন্দিও নীরবে দাঁড়িয়ে এই অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করেছিলেন।

হরিপদ ভারতীর স্মৃতিচারণায় বারবার ফিরে আসে শ্রীঅরবিন্দের কারাজীবনের প্রসঙ্গ। ১৯০৮ সালে ব্রিটিশ শাসনের সময় আলিপুর জেলে বন্দি থাকা অবস্থায় শ্রীঅরবিন্দ যে কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলেন, তার বিবরণ পাওয়া যায় তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ কারাকাহিনী-তে।

সেখানে তিনি বর্ণনা করেছেন অতি ক্ষুদ্র, জানালাবিহীন একটি কুঠুরির কথা, যেখানে একই ঘরে শোবার ব্যবস্থা, আহারের স্থান এবং শৌচাগার ছিল। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, একাকীত্ব এবং কঠোর নজরদারির মধ্যেও তিনি আধ্যাত্মিক উপলব্ধির এক নতুন জগতে প্রবেশ করেছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি দাবি করেন, সেই কারাগারেই তিনি সর্বত্র ভগবান বাসুদেবের উপস্থিতি অনুভব করেছিলেন।

‘জেলে মিসা বাইরে মিসা’ শুধুমাত্র একটি স্মৃতিকথা নয়, বরং জরুরি অবস্থার সময় গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল। কারাগারের কঠোর বাস্তবতার পাশাপাশি এতে উঠে এসেছে মানুষের অদম্য মানসিক শক্তি, প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা এবং স্বাধীনতার প্রতি গভীর আকাঙ্ক্ষা।

জরুরি অবস্থার ৫১ বছর পূর্তিতে অধ্যাপক হরিপদ ভারতীর এই স্মৃতিচারণ নতুন প্রজন্মকে স্মরণ করিয়ে দেয়—গণতন্ত্রের মূল্য কত বড়, আর নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষার জন্য সংগ্রাম কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

২৫ জুনের এই দিন তাই শুধু ইতিহাসের একটি তারিখ নয়; এটি স্বাধীনতা, সাংবিধানিক অধিকার এবং গণতান্ত্রিক চেতনা রক্ষার এক চিরন্তন স্মারক।

Loading