সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: “সংবাদ শুধু তথ্য নয়, এটি সমাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করার এক শক্তিশালী মাধ্যম। একটি জাতির সামগ্রিক উন্নয়ন, গণতন্ত্রের সুস্থ বিকাশ এবং মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সত্য, নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার কোনো বিকল্প নেই।”— এই বার্তাই উঠে এল গতকালের শিশির মঞ্চে ‘নারদ সম্মান ২০২৬’ প্রদান অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে রাজ্যপাল আর. এন. রবি বলেন, একটি দেশের অগ্রগতি কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে পরিমাপ করা যায় না; সেই উন্নয়নের সঠিক তথ্য, সরকারি উদ্যোগ, সামাজিক পরিবর্তন, মানুষের সাফল্য এবং একই সঙ্গে বিভিন্ন সমস্যার বাস্তব চিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরার দায়িত্ব সংবাদমাধ্যমের। সমাজের কল্যাণে ইতিবাচক পরিবর্তনের খবর যেমন মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে, তেমনি অন্যায়, দুর্নীতি, অব্যবস্থা ও সামাজিক অসঙ্গতিকে সাহসের সঙ্গে তুলে ধরে প্রশাসন ও সমাজকে সতর্ক করার দায়িত্বও সাংবাদিকদের। রাজ্যপাল বলেন, সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি মহান সামাজিক দায়িত্ব। সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে দ্রুততার পাশাপাশি তথ্যের সত্যতা যাচাই, নিরপেক্ষতা, নৈতিকতা এবং জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে, তাই প্রতিটি সাংবাদিকের উচিত তথ্য যাচাই করে বিচক্ষণতার সঙ্গে সংবাদ প্রকাশ করা। তিনি তাঁর তদন্তকারী সংস্থায় দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেন, অনেক সময় একটি নির্ভুল সংবাদ বা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন সমাজে বড় পরিবর্তনের সূচনা করেছে এবং প্রশাসনকে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছে। সেই কারণেই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করে। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মন্ত্রী কল্যাণ চক্রবর্তী দেবর্ষি নারদকে বিশ্বের প্রথম বার্তাবাহক বা সংবাদবাহক হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ভারতীয় ঐতিহ্যে দেবর্ষি নারদ স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতাল— তিন জগতের মধ্যে নিরন্তর সংবাদ আদান-প্রদানের মাধ্যমে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতেন। তাঁর সংবাদ পরিবেশনের মূল ভিত্তি ছিল তথ্যের নির্ভুলতা এবং বৃহত্তর কল্যাণ। সেই আদর্শ থেকেই আজকের সাংবাদিকদের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী দিনের সাংবাদিকরা নির্ভীক, সত্যনিষ্ঠ, দায়িত্বশীল এবং জনকল্যাণমূলক সাংবাদিকতার মাধ্যমে সমাজকে আরও আলোকিত করবেন। গণতন্ত্রে সংবাদমাধ্যমকে যথার্থই “চতুর্থ স্তম্ভ” বলা হয়। আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচারব্যবস্থার পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমই জনগণের কণ্ঠস্বরকে রাষ্ট্রের সামনে তুলে ধরে। একটি স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যম সরকারের সাফল্য যেমন তুলে ধরে, তেমনি জনজীবনের সমস্যা, দুর্নীতি, অনিয়ম, বৈষম্য, পরিবেশ দূষণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, কর্মসংস্থান, নারী ও শিশু সুরক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সংবাদমাধ্যমের এই গঠনমূলক ভূমিকা সমাজে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সুদৃঢ় করে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসারের ফলে তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়লেও ভুয়ো খবর, অপপ্রচার এবং বিভ্রান্তিকর তথ্যের ঝুঁকিও বহুগুণ বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে পেশাদার সাংবাদিকদের দায়িত্ব আরও বেড়ে গেছে। যাচাই-বাছাই করা তথ্য, যুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণ এবং নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশনই মানুষের আস্থা বজায় রাখতে পারে। সংবাদমাধ্যমের কাজ কোনো বিভাজন সৃষ্টি করা নয়; বরং সমাজে সম্প্রীতি, সচেতনতা, যুক্তিবোধ এবং দায়িত্বশীল নাগরিক গড়ে তুলতে সহায়তা করা। গতকালের এই অনুষ্ঠানে বিশ্ব সংবাদ কেন্দ্র, দক্ষিণবঙ্গ-এর উদ্যোগে সাংবাদিকতায় আজীবন অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রবীণ সাংবাদিক রথীন্দ্রমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, বিজয় আঢ্য, ভজন লাল গঙ্গোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ দত্ত এবং রঞ্জিত রায়-কে জীবনকৃতি সম্মান প্রদান করা হয়। এছাড়াও সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের জন্য সাহানা মুখোপাধ্যায়, পিনাকপানি ঘোষ, অনির্বাণ সিনহা, প্রবীর ভট্টাচার্য, সাংবাদিক ও বিধায়ক সন্তু পান, শফিকুল ইসলাম, স্বর্ণালী মিত্র সরকার-সহ মোট ১২ জন সাংবাদিককে ‘নারদ সম্মান ২০২৬’ প্রদান করা হয়। তাঁদের হাতে সম্মাননা, উত্তরীয় ও স্মারক তুলে দিয়ে সংবাদজগতের প্রতি তাঁদের দীর্ঘদিনের নিষ্ঠা, সততা এবং সমাজমুখী ভূমিকার স্বীকৃতি জানানো হয়। অনুষ্ঠানের মূল বার্তা ছিল স্পষ্ট— সত্য, সাহস, নৈতিকতা ও জনকল্যাণের আদর্শে পরিচালিত সাংবাদিকতাই একটি সুস্থ, সচেতন ও শক্তিশালী সমাজ গঠনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। সংবাদমাধ্যম যখন নির্ভীকভাবে সত্য তুলে ধরে, মানুষের সমস্যা সামনে আনে, উন্নয়নের ইতিবাচক দিক তুলে ধরে এবং সমাজকে সঠিক দিশা দেখায়, তখনই গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হয় এবং একটি দেশ প্রকৃত অর্থে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যায়। দেবর্ষি নারদের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সত্যনিষ্ঠ ও জনমুখী সাংবাদিকতার এই ধারা ভবিষ্যতেও সমাজকে আলোকিত করবে— এমনই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন অনুষ্ঠানের বক্তারা।


![]()

More Stories
ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির ১২৫তম জন্মজয়ন্তী
রথযাত্রা উপলক্ষে রাজ্যের উদ্যোগ, নির্বাচিত আয়োজক কমিটিকে ৫ লক্ষ টাকা করে অনুদান
ভারত নেট প্রকল্পে গ্রামীণ ডিজিটাল সংযোগে জোর, পশ্চিমবঙ্গে ৩,৩৪০ গ্রাম পঞ্চায়েত লক্ষ্যমাত্রায়