August 25, 2026

অ্যাডমিশন ডে-তে ৭২ ঘণ্টা প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ—সরকারি চিকিৎসা পরিষেবায় কি নতুন ভারসাম্যের শুরু?

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ: সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক রয়েছে। সেই বিতর্কের মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য দপ্তর ২৪ আগস্ট ২০২৬ একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা জারি করেছে। নির্দেশ অনুযায়ী, সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে যে দিন কোনও চিকিৎসকের ‘অ্যাডমিশন ডে’ থাকবে, সেই দিন থেকে পরবর্তী ৭২ ঘণ্টা অর্থাৎ তিন দিন তিনি কোনও ধরনের প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে পারবেন না। স্বাস্থ্য দপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, রোগীদের আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ এবং অ্যাডমিশন ডে-তে ভর্তি হওয়া রোগীদের পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার চিকিৎসা ও তত্ত্বাবধানে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও ফ্যাকাল্টিদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতেই এই সিদ্ধান্ত।

‘অ্যাডমিশন ডে’ বলতে সাধারণত সপ্তাহের নির্দিষ্ট সেই দিনকে বোঝায়, যেদিন কোনও চিকিৎসক নিজের তত্ত্বাবধানে নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি করেন। বাস্তবে এই রোগীদের চিকিৎসার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, রোগের গুরুত্ব নির্ধারণ এবং পরবর্তী চিকিৎসা পরিকল্পনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ভর্তি করানোর পরপরই যদি সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক হাসপাতালের বাইরে নিজের ব্যক্তিগত চেম্বার বা নার্সিংহোমের কাজে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে রোগীর ধারাবাহিক চিকিৎসায় সমস্যা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সেই জায়গা থেকেই নতুন নির্দেশিকার মূল গুরুত্ব।

এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হল, সরকারি হাসপাতালে সিনিয়র চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট ফ্যাকাল্টিদের উপস্থিতি বাড়ানোর একটি প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি হবে। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবায় একটি অভিযোগ রয়েছে—কিছু ক্ষেত্রে সিনিয়র চিকিৎসকের পরিবর্তে জুনিয়র চিকিৎসকদের উপর রোগী পরিষেবার বড় অংশের দায়িত্ব এসে পড়ে। সিনিয়র চিকিৎসক রোগী ভর্তি করিয়ে পরবর্তী সময়ে ব্যক্তিগত চিকিৎসায় ব্যস্ত থাকলে সেই রোগীর জটিলতা সামলানোর ক্ষেত্রে জুনিয়র চিকিৎসকদের উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। নতুন নির্দেশিকা অন্তত অ্যাডমিশন ডে-কে কেন্দ্র করে এই প্রবণতা কমানোর চেষ্টা করছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এটি শুধুমাত্র চিকিৎসকের কর্মঘণ্টার প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রোগীর নিরাপত্তা। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা অনেক রোগীর ক্ষেত্রেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন, রিপোর্টের ভিত্তিতে চিকিৎসা পদ্ধতি বদল, ওষুধের মাত্রা নির্ধারণ কিংবা প্রয়োজনে দ্রুত কোনও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়ার মতো সিদ্ধান্তে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের উপস্থিতি বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। তাই অ্যাডমিশন ডে-কে কেন্দ্র করে ৭২ ঘণ্টার ‘প্র্যাকটিস ব্রেক’ রোগীকেন্দ্রিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা হিসেবেই দেখা যেতে পারে।

তবে এই নির্দেশিকার অন্য একটি দিকও অস্বীকার করার উপায় নেই। সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা দেশের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান বা কিছু রাজ্যের তুলনায় কতটা প্রতিযোগিতামূলক, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। ফলে প্রাইভেট প্র্যাকটিসের সুযোগ চিকিৎসকদের কাছে শুধুমাত্র অতিরিক্ত আয়ের বিষয় নয়, অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের পেশাগত ও আর্থিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সম্পূর্ণভাবে প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ করে দেওয়া হলে চিকিৎসকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকতেই পারে। সেই দিক থেকে দেখলে অ্যাডমিশন ডে-কে কেন্দ্র করে নির্দিষ্ট ৭২ ঘণ্টা প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তটি তুলনামূলকভাবে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা। চিকিৎসককে পুরোপুরি ব্যক্তিগত চিকিৎসা থেকে বিচ্ছিন্ন না করে, যে সময়ে তাঁর সরকারি হাসপাতালে রোগীর প্রতি সর্বাধিক দায়বদ্ধতা থাকা উচিত, সেই সময়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

তবে নির্দেশিকার বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট হওয়া জরুরি। যেসব চিকিৎসকের নির্দিষ্ট অ্যাডমিশন ডে নেই, তাঁদের ক্ষেত্রে নিয়ম কী হবে? কোনও চিকিৎসকের যদি সপ্তাহে একাধিক অ্যাডমিশন ডে থাকে, তাহলে কি প্রত্যেকবার নতুন করে ৭২ ঘণ্টার নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে? দুই অ্যাডমিশন ডে-এর ব্যবধান কম হলে সেই ৭২ ঘণ্টা কীভাবে গণনা করা হবে? একইভাবে, চিকিৎসকের সরকারি দায়িত্ব, জরুরি পরিষেবা এবং নির্দিষ্ট হাসপাতালভিত্তিক ভূমিকার সঙ্গে এই বিধিনিষেধ কীভাবে সমন্বয় করা হবে—এসব বিষয়েও আরও বিস্তারিত নির্দেশিকা প্রয়োজন। কারণ নিয়ম যত স্পষ্ট হবে, বাস্তবায়ন তত সহজ হবে এবং অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক বিতর্কও কমবে।

আরও একটি বড় প্রশ্ন হল—এই নিয়ম শুধু কাগজে থাকবে, নাকি হাসপাতালগুলিতে কার্যকরভাবে নজরদারি করা হবে? কোনও নির্দেশিকা তখনই সফল হয়, যখন তার বাস্তবায়নের জন্য পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা থাকে। অ্যাডমিশন ডে-তে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের উপস্থিতি, পরবর্তী ৭২ ঘণ্টায় তাঁর সরকারি দায়িত্ব পালন এবং প্রাইভেট প্র্যাকটিসের বিধিনিষেধ—সবকিছুর উপর স্বচ্ছ নজরদারি প্রয়োজন। একইসঙ্গে অভিযোগ বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও পরিষ্কার প্রক্রিয়া থাকা দরকার।

আসলে সমস্যাটির আরও গভীরে গেলে দেখা যায়, সরকারি চিকিৎসা পরিষেবায় ‘প্রাইভেট প্র্যাকটিস’ বিতর্কটি কেবল চিকিৎসকের ব্যক্তিগত আয়ের প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসকের কর্মঘণ্টা, রোগীর প্রতি দায়বদ্ধতা, হাসপাতালের মানবসম্পদ, চিকিৎসার মান, গবেষণার সুযোগ এবং চিকিৎসকদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা। একজন চিকিৎসক যদি একই সঙ্গে একাধিক হাসপাতালে, চেম্বারে এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ সময় কাজ করেন, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে তাঁর নিজের বিশ্রাম, পরিবার, মানসিক স্বাস্থ্য এবং পেশাগত দক্ষতার উপরও চাপ পড়তে পারে। চিকিৎসা পেশার মতো উচ্চ-দায়িত্বের ক্ষেত্রে ক্লান্ত চিকিৎসকও রোগীর জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারেন।

এই কারণেই দেশের বহু কেন্দ্রীয় সরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে প্রাইভেট প্র্যাকটিসের উপর কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে। তবে সেই ব্যবস্থার সঙ্গে চিকিৎসকদের বেতন, সুযোগ-সুবিধা, গবেষণার পরিবেশ এবং কর্মপরিবেশের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়। পশ্চিমবঙ্গেও ভবিষ্যতে যদি সরকারি চিকিৎসকদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেশের শীর্ষ সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলির সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ করা যায়, তাহলে সম্পূর্ণ বা আরও কঠোরভাবে প্রাইভেট প্র্যাকটিস নিয়ন্ত্রণের পথ অনেকটাই সহজ হতে পারে।

তবে সেই বৃহত্তর সংস্কার বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান ৭২ ঘণ্টার নির্দেশকে একটি মধ্যপন্থী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যায়। এতে চিকিৎসকদের পুরো সপ্তাহের ব্যক্তিগত চিকিৎসা বন্ধ হচ্ছে না, আবার অ্যাডমিশন ডে-কে কেন্দ্র করে রোগীর চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাঁদের সরকারি দায়িত্বকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

শেষ পর্যন্ত এই নির্দেশের সাফল্য নির্ভর করবে একটি বিষয়ের উপর—হাসপাতালে সত্যিই কি সিনিয়র চিকিৎসকদের উপস্থিতি বাড়ছে এবং তার সুফল কি রোগীরা পাচ্ছেন? যদি এই প্রশ্নের উত্তর ইতিবাচক হয়, তাহলে ৭২ ঘণ্টার এই বিধিনিষেধ শুধু একটি প্রশাসনিক নির্দেশিকা হয়ে থাকবে না; বরং সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবায় জবাবদিহি, চিকিৎসার ধারাবাহিকতা এবং রোগীকেন্দ্রিক ব্যবস্থার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।

সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকের সময় শেষ পর্যন্ত সরকারি রোগীরই সম্পদ। সেই সময়ে চিকিৎসকের উপস্থিতি নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনই চিকিৎসকদের ন্যায্য বেতন, সম্মানজনক কর্মপরিবেশ এবং ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই দুইয়ের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য তৈরি করতে পারলেই পশ্চিমবঙ্গের সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবায় প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব।

Loading