September 15, 2026

অপরাজেয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র—আজও যাঁর গল্পে বেঁচে থাকে বাংলার মানুষ

সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ বাংলা সাহিত্যের আকাশে এমন কিছু নক্ষত্র রয়েছেন, যাঁদের আলো সময়ের সঙ্গে ম্লান হয় না। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁদেরই একজন। আজ তাঁর জন্মদিবসে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করা হচ্ছে সেই অপরাজেয় কথাশিল্পীকে, যিনি কলমের ডগায় তুলে এনেছিলেন বাংলার সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ, অভিমান, বঞ্চনা আর জীবনের নির্মম বাস্তবতা।

১৮৭৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর হুগলির দেবানন্দপুরে জন্মগ্রহণ করেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত, দারিদ্র্য এবং মানুষের কাছ থেকে পাওয়া অসংখ্য অভিজ্ঞতাই পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যকে দিয়েছে এক অনন্য মানবিক গভীরতা। তাঁর সৃষ্ট চরিত্ররা যেন কাগজের পাতায় বন্দি কোনও কাল্পনিক মানুষ নয়—তারা আমাদেরই চেনা মানুষ। তাদের হাসি-কান্না, ভালোবাসা, ব্যর্থতা, প্রতিবাদ আর অসহায়তার মধ্যে পাঠক খুঁজে পান নিজের জীবনকেই।

‘দেবদাস’-এর অপূর্ণ প্রেম, ‘শ্রীকান্ত’-এর পথচলা, ‘চরিত্রহীন’-এর সামাজিক প্রশ্ন, ‘পথের দাবী’-র বিদ্রোহ কিংবা ‘দত্তা’-র ভালোবাসা—প্রতিটি সৃষ্টিই বাংলা সাহিত্যে এক একটি মাইলফলক। বিশেষ করে নারীর প্রতি সমাজের অবিচার, কুসংস্কার এবং পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার বিরুদ্ধে শরৎচন্দ্রের কলম বারবার সরব হয়েছে। তাঁর নারী চরিত্ররা কখনও কোমল, কখনও তীব্র প্রতিবাদী, আবার কখনও সমাজের সমস্ত প্রতিকূলতার মধ্যেও আত্মমর্যাদায় অটল।

শরৎচন্দ্রের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর সহজ ভাষা। কঠিন শব্দের আড়ালে নয়, তিনি মানুষের হৃদয়ের একেবারে কাছাকাছি গিয়ে কথা বলেছেন। তাই তাঁর লেখা পড়তে গিয়ে মনে হয়, লেখক যেন দূরে কোথাও বসে গল্প বলছেন না—আমাদের পাশেই বসে থাকা কোনও আপনজন নিজের জীবনের কথা শোনাচ্ছেন।

সময় বদলেছে, সমাজ বদলেছে, মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে। কিন্তু শরৎচন্দ্রের গল্পের মানুষগুলি আজও আমাদের পরিচিত। আজও কোনও অপ্রকাশিত ভালোবাসায় ‘দেবদাস’-এর ছায়া দেখা যায়, কোনও নারীর নীরব লড়াইয়ে ‘রাজলক্ষ্মী’ বা ‘সাবিত্রী’র প্রতিচ্ছবি মেলে, আর কোনও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন উঠলে মনে পড়ে তাঁর বিদ্রোহী কলমের কথা।

জন্মদিবসে তাই শরৎচন্দ্রকে স্মরণ করা শুধু একজন সাহিত্যিককে শ্রদ্ধা জানানো নয়; বরং সেই মানবিক বোধকে স্মরণ করা, যে বোধ মানুষকে মানুষের কষ্ট বুঝতে শেখায়। তাঁর সাহিত্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সমাজ যতই বদলাক, মানুষের ভালোবাসা, বেদনা, স্বপ্ন এবং চোখের জল কখনও পুরোনো হয় না।

অপরাজেয় সেই কথাশিল্পী আজ শারীরিকভাবে আমাদের মধ্যে নেই। কিন্তু তাঁর সৃষ্টি এখনও অমর। বইয়ের পাতায়, পাঠকের হৃদয়ে এবং বাংলা ভাষার প্রতিটি আবেগে শরৎচন্দ্র আজও বেঁচে আছেন। তাঁর জন্মদিবসে তাই একটাই উচ্চারণ—শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায় এবং অমলিন পাঠে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় চিরকাল অমর।

Loading