স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন ডায়াবেটিক। জন্মেছিলেন 12 ই জানুয়ারি, আর ইনসুলিন আবিষ্কার হয়ে মার্কেটে এসেছিল 11 ই জানুয়ারি।তবে দুঃখের ব্যাপার হলো দুটো ঘটনার মধ্যে তফাৎ ছিল প্রায় 50 বছরের, ফলে- স্বামীজী ইনসুলিন এর উপকারিতা পাননি।
এবার প্রশ্ন হল স্বামীজী র মতো এরকম শারীরিকভাবে সক্ষম, সর্বত্যাগী, পরিশ্রমী মানুষ এত অল্প বয়সে কেন চলে গেলেন? দুর্ঘটনায় মানুষ অকালে মারা যায়- স্বামী বিবেকানন্দের জীবনে তো সেরকম কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি।
মানুষের যাবতীয় রোগের যদি একটি মাত্র কারণই বাছতে বলা হয়- তাহলে সেটা হল তার জিন অর্থাৎ বংশানুক্রমিক ভাবে পাওয়া ব্যাধি। বিবেকানন্দের বাবা বিশ্বনাথ দত্ত ছিলেন স্বল্পায়ু- তারও ডায়াবেটিস ছিল, খুব স্ট্রেসফুল জীবন ছিল, রোজগার করতেন প্রচুর, খরচাপাতি করতেন আরো বেশি এবং আত্মীয়স্বজনদের অত্যাচারে জর্জরিত ছিলেন। মারা গেলেন হার্ট অ্যাটাকে। এর সব কটি বৈশিষ্ট্যই তার পুত্র নরেন্দ্রনাথ তথা বিবেকানন্দের জীবনে আমরা দেখতে পাই। এই বংশানুক্রমিক জিন ব্যাপারটা হচ্ছে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। এবার এরপরে আসে পরিবেশের প্রভাব। স্বামী বিবেকানন্দও ভীষণ ভোজনরসিক ছিলেন। সব রকম খাবার খেতেন, প্রচুর পরিমাণে খেতেন । ফলটল কম খেতেন বিশেষত পেয়ারা পছন্দ করতেন না , কিন্তু তেলেভাজা ফাউল কাটলেট মাটন ইলিশ মাছ মিষ্টি এসবের কোনোটাতেই তার ‘না’ ছিল না।
অনেকেই বলেন মৃত্যুর দিন অসুস্থ অবস্থায় ইলিশ মাছ খাওয়াটা বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে গেছিল; সেটা তো নিশ্চয়ই হয়েছিল। কিন্তু সেটা তাঁর মৃত্যুর কারণ নয়।
এই জিন এবং অনিয়মিত ভোজন – এই দুটিই ডায়াবেটিসের বড় কারণ যা পরবর্তীকালে বিবেকানন্দের হার্টের সমস্যা বয়ে নিয়ে এসেছিল। স্বামী বিবেকানন্দ জীবনের একটা বড় সময় প্রচণ্ড অভাব এর মধ্যে কাটিয়েছেন, অনেক সময় অনাহারে দিন যাপন করেছেন।লোকসেবায় অকাতরে জীবন দান করেছেন, নিজের স্বাচ্ছন্দ্যের দিকে কখনো একটুও নজর দেননি।এই অনাহার, উপবাস,প্রাত্যহিক ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং( Intermittent fasting ), অনিয়মিত ভোজন (Binge eating) এর অপকারিতাও আছে প্রচুর। যেমন ধরুন আপনার সুগার আছে , আপনি কি একেবারে মিষ্টি খাবেন না? বা আপনি প্রিডায়াবেটিক- আপনি কি মিষ্টি খাবেন না? খেতেই পারেন কিন্তু পরিমাণে খুব অল্প ,সারাদিনে কখনোই একটার বেশি নয়। যারা সচেতন প্রিডায়াবেটিক- তাদের মধ্যে একটা জিনিস খুব দেখা যায়; এরা দশদিন হল একটা মিষ্টি ও ছুঁলো না- নিশ্চয়ই উপকার হল? হল। কিন্তু পরের পাঁচ দিন রোজ চারটে করে মিষ্টি খেলো! এতে অপকার অনেক বেশি হল। এর থেকে প্রতিদিন আধখানা করে মিষ্টি খেলে শরীরের ক্ষতি কম হবে। এবার লক্ষ্য করলে দেখবেন স্বামী বিবেকানন্দ যবে থেকে ডায়াবেটিক হলেন সেই সময় থেকে তার খ্যাতিও খুব বাড়তে থাকলো। খ্যাতির সাইডএফেক্ট হল ,পরিশ্রম কম হবে- ব্যস্ততা বেড়ে যাবে ফলে- সুগারের অত্যাচার ও বাড়তে থাকবে। এইজন্যেই এখনকার ডায়াবেটোলজিস্টরা বলেন- বেশ ,আপনি সুগারের পেশেন্ট ঠিক আছে- মিষ্টি আধখানা খেতেই পারেন, কিন্তু রোজ আধঘন্টা হাঁটা যেন বন্ধ না হয়।
সে সময় ওষুধ সেরকম কিছু ছিল না, ইনসুলিনের তো প্রশ্নই ওঠে না- যা চলত তাকে টোটকার বেশি কিছু বলা উচিত নয়। খুব স্বাভাবিক ভাবেই বিবেকানন্দের ডায়াবেটিস ছিল এখনকার ভাষায়- আন কন্ট্রোলড্। আর তা যে রোগটিকে নিয়ে এলো – তার নাম ডায়ালেটেড কার্ডিওমায়োপ্যাথি Dialated Cardiomyopathyঅর্থাৎ এতে হার্টের চেহারাটা থলথলে হয়ে গেল। আমাদের হার্ট ত বেসিকালি একটা পাম্প, সে যত সুন্দর মাসকুলার থাকবে তত ভালো পাম্প করবে। কিন্তু সে যদি এলিয়ে যায় তাহলে সেকি আর সেরকম পাম্প করতে পারবে? কখনোই পারবে না। শরীরে সব জায়গায় প্রয়োজনীয় অক্সিজেন যাবে না, উল্টে হাতে পায়ে জল জমতে থাকবে, মুখমন্ডলের যে টানটান ব্যাপার সেটা চলে গিয়ে একটা ফোলা ফোলা ভাব চলে আসবে। স্বামী বিবেকানন্দ নিয়মিত ধূমপান করতেন। তখন জানা ছিল না; পরবর্তীকালে আমরা সবাই জানতে পেরেছি ধূমপানের জন্যেও -আপনার সুগার থাকুক বা না থাকুক- হার্টের রোগ হয়েই থাকে। দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত সুগার থাকলে কিডনির সমস্যাও দেখা দেয়- যা স্বামীজীর ক্ষেত্রেও দেখা দিয়েছিল।
এর সঙ্গে কি স্ট্রেস একটা বড় ফ্যাক্টর নয়? অবশ্যই বড় ফ্যাক্টর। স্বামী বিবেকানন্দের জীবনে স্ট্রেসের কোনও অভাব ছিল না। স্বামী বিবেকানন্দকে দায়িত্ব নিয়ে বাঙালিরা প্রচুর জ্বালিয়েছে। বেলুড়ের যে মঠ তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন – তাকে তখনকার দিনের বাঙালি বলতো- নরেন দত্তের বাগানবাড়ি! তাকে যে ঘোড়ার গাড়ি করে বরণ করে আনা হয়েছিল এবং শোভাযাত্রা করা হয়েছিল- তার খরচ বিবেকানন্দের থেকেই চাওয়া হয়েছিল!! আত্মীয়-স্বজনরা অন্যায় মামলায় জর্জরিত করে দিয়েছিল। বালি পৌরসভার একদল কর্মকর্তা র পক্ষ থেকে তাঁকে পরিকল্পনা করে প্রচন্ড বিপদে ফেলা হতো।
এই সবকটি ফ্যাক্টর -বংশানুক্রম, ডায়াবেটিস, স্ট্রেস এবং হার্টের অসুখ আর উপযুক্ত চিকিৎসার অভাব – সবমিলিয়ে স্বামী বিবেকানন্দের জীবন ঊনচল্লিশ বছরের বেশি দীর্ঘায়িত হতে পারেনি। প্রখ্যাত বাঙালি লেখক শঙ্করের ‘দ্য মনক অ্যাজ ম্যান’ বইয়ে বলা হয়েছে, স্বামী বিবেকানন্দ ৩১টি রোগে ভুগছিলেন। বইটিতে অনিদ্রা, লিভার এবং কিডনি রোগ, ম্যালেরিয়া, মাইগ্রেন, ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগের তালিকা রয়েছে। এমনকি তিনি হাঁপানিতেও ভুগছিলেন যা অনেকবার অসহ্য হয়ে উঠেছিল।
এই মহামানব আরো কিছু দিন বাঁচলে আরো কতো কি যে পৃথিবীর জন্য করতেন,তা ভেবে হাত কামড়ানো ছাড়া- আমরা যারা তাঁর ভক্ত- আর কীই বা করতে পারি!
( সংগৃহীত )
ডাঃ সুমিত চট্টোপাধ্যায়

![]()

More Stories
অফিসে ৩০ মিনিটের ‘হস্তমৈথুন বিরতি’! সংস্থার সিদ্ধান্তে নাকি আরও তরতাজা কর্মীরা
হিমালয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল আখরোট: স্বাস্থ্য ও পরিবেশ—দু’দিকেই উপকারী
আগামী ১০–১৫ বছরে হারিয়ে যেতে পারে একটি প্রজন্ম