November 30, 2025

RSS ও স্বাধীনতার ইতিহাস: অবহেলার আড়ালের এক অধ্যায়

সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাস যতটা জটিল, ততটাই রাজনৈতিক স্মৃতিভ্রষ্টতায় ঢাকা। আজও যখন কেউ প্রশ্ন তোলে—“RSS স্বাধীনতার জন্য কী করেছে?”—তখন বোঝা যায়, ইতিহাসের আয়নাটা আমরা কতবার নিজেই ঝাপসা করে ফেলেছি।

ইতিহাসের এমন কিছু সত্য আছে, যা আরামপ্রিয় রাজনৈতিক উত্তরসূরিদের ভালো লাগে না। স্বাধীনতা সংগ্রামের কণ্ঠে তখন বহুস্বর ছিল—কেউ বন্দেমাতরম বলে ফাঁসির দড়িতে ঝুলেছেন, কেউ “ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস” দাবি করেছেন, কেউ আবার বিদেশি শাসকের পাশে দাঁড়িয়ে ব্রিটেনের যুদ্ধকে নিজের যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে কমিউনিস্ট পার্টির নেতা গঙ্গাধর অধিকারী তাঁর থিসিসে ভারতকে সতেরোটি অঞ্চলে বিভক্ত করার প্রস্তাব দেন। একই সময়ে দলীয় রেজোলিউশনে ঘোষণা করা হয় — “Britain’s War is Our War.”
ভারত যখন ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে, তখন এই ঘোষণা নিঃসন্দেহে প্রশ্ন তোলে — দেশপ্রেমের সংজ্ঞা কি রঙের উপর নির্ভরশীল?

একই সময় কংগ্রেসের অনেক নেতা “Dominion Status”–এর দাবি তুলেছিলেন — অর্থাৎ ভারত হবে আধা স্বাধীন, আধা দাস। ইতিহাস বলে, স্বাধীনতা তখনও সবার কাছে একরকম ছিল না; কেউ লড়ছিল জীবন দিয়ে, কেউ চাইছিল ক্ষমতার পথে আপসের সুযোগ।

আজ তাঁদের উত্তরসূরিরা যখন RSS-কে দেশপ্রেম শেখাতে চান, তখন ইতিহাস যেন নিজেই ব্যঙ্গ করে — পরীক্ষায় ফেল করা ছাত্র যদি শিক্ষকের পাঠদানের সমালোচনা করে, তেমনই চিত্র।

RSS-এর জন্মই সেই উপলব্ধি থেকে— যে স্বাধীনতা মানে কেবল ব্রিটিশ শাসন তাড়ানো নয়, বরং এক জাতিকে আত্মশক্তিতে জাগানো।
RSS প্রতিষ্ঠাতা ড. কেশব বালিরাম হেডগেওয়ার ১৯২১ সালে অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নিয়ে জেলে যান। পরে তিনি বুঝেছিলেন—লড়াই শুধু শাসকের বিরুদ্ধে নয়, জাতির আত্মবোধ জাগানোরও।

তাঁর সেই চিন্তা থেকেই RSS জন্ম নেয়—একটি শৃঙ্খলিত, আত্মনির্ভর ও সংগঠিত জাতি গঠনের প্রত্যয়ে।

RSS কখনও রাজনৈতিক দল ছিল না, কিন্তু চরিত্র, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধ শেখানো ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য।
১৯৪২ সালের Quit India Movement–এর সময় RSS নেতা বলাসাহেব দেওরাস ব্রিটিশদের হাতে গ্রেফতার হন।
আরেকদিকে, বীর সাভারকর আন্দামানের সেলুলার জেলে বছর বছর বন্দী থেকেও “The Indian War of Independence – 1857” বই লিখে জাতিকে শেখালেন — ভয় নয়, প্রতিরোধ।

এই বইটি ব্রিটিশ সরকার নিষিদ্ধ করেছিল, কারণ সেখানে ভারতীয়দের শেখানো হয়েছিল দাসত্ব নয়, স্বাধীনতার মানে কীভাবে বাঁচতে হয়।

১৯৪৭-এর বিভাজনের যন্ত্রণার সময় RSS বলেছিল—

“India is One, and no line can divide the blood of Bharat.”

এ বক্তব্য তখনকার প্রেক্ষিতে শুধু সংগঠনের অবস্থান নয়, বরং এক গভীর সাংস্কৃতিক দৃঢ়তা—যে ভারত ভৌগোলিকভাবে ভাগ হলেও, আত্মায় অবিভাজ্য।

RSS বন্দুক তোলেনি, কারণ তারা জানত স্বাধীনতা টিকে থাকে সংগঠনের মেরুদণ্ডে, শাসকের পতনে নয়।
তারা রাজনীতি করেনি, কারণ তারা জাতির চরিত্র গড়ছিল।
যখন অনেকেই ব্রিটিশদের চোখে “বিশ্বাসযোগ্য অংশীদার” হতে চেয়েছিল, RSS তখন এক নির্লিপ্ত সংগঠক হিসেবে ভবিষ্যতের ভারতের ভিত নির্মাণে ব্যস্ত ছিল।

আজ যারা RSS-এর দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তাদের জানা উচিত — স্বাধীনতা শুধু পতাকা উত্তোলনের দিন নয়, স্বাধীনতা মানে এক জাতিকে ভয়, দুর্বলতা ও নির্ভরতামুক্ত করা।
আর সেই কাজে RSS নীরবে, নিঃস্বার্থভাবে, নির্ভীকভাবে অবদান রেখেছে।

Loading