সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় ভোটার তালিকা সংশোধনের (SIR) কাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই চরম বিপাকে পড়েছেন বুথ লেভেল অফিসাররা (BLO)। অধিকাংশ BLO–ই প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক হওয়ায় স্কুলের মধ্যপর্বের পরীক্ষা, খাতা দেখা, রেজাল্ট তৈরি, ক্রীড়া অনুষ্ঠান ও নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি নতুন করে ভোটার তালিকার ফর্ম বিলি, সংগ্রহ ও ডিজিটাইজেশনের নির্দেশ তাঁদের ওপর এক অভূতপূর্ব চাপ সৃষ্টি করেছে।
সোমবার সকালে একদল BLO পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়া, পশ্চিম মেদিনীপুরের বালিচকসহ একাধিক স্থানে প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ— প্রযুক্তিগত দক্ষতার সীমাবদ্ধতা, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব, অ্যাপের সমস্যাজনিত বাধা এবং অত্যন্ত কম সময়সীমা তাদের মানসিক–শারীরিক ভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে।
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে BLO–দের যে অ্যান্ড্রয়েড–ভিত্তিক অ্যাপ দেওয়া হয়েছে, সেটি অধিকাংশ BLO–র কাছেই ‘মাথাব্যথার প্রধান কারণ’ হয়ে উঠেছে। তাঁদের দাবি,
- অ্যান্ড্রয়েড ফোনে লগইন করা যাচ্ছে না
- নেটওয়ার্ক সমস্যা ক্রমাগত কাজ ব্যাহত করছে
- ডেটা আপলোড করার পর সেভ না–হওয়ার ঘটনা বারবার ঘটছে
- অ্যাপের নির্দেশাবলী পুরোটাই ইংরেজিতে, যা অনেকের বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে
একজন BLO জানান, “আমার বয়স ৫০-এর উপরে। অ্যান্ড্রয়েড ফোন তেমন ব্যবহার করি না। হঠাৎ অ্যাপ দিয়ে ডেটা আপলোড করতে বলা হয়েছে। বারবার ভুল দেখাচ্ছে। কাজ এগোচ্ছে না।”
এমনকি যারা প্রযুক্তিতে অভ্যস্ত তারাও দাবি করছেন— অ্যাপের সার্ভার বারবার ডাউন থাকায় দিনভর সময় নষ্ট হচ্ছে।
প্রচুর ভোটার অনলাইনে SIR ফর্ম জমা দিচ্ছেন। অনলাইন সিস্টেমে “Form submitted successfully” মেসেজ গেলেও কোনও acknowledgment copy না–মিলায় নাগরিকেরা বিভ্রান্ত।
বহু BLO অভিযোগ করছেন, “অনলাইনে যারা ফর্ম দিয়েছেন, তাঁদের বহু ক্ষেত্রেই তথ্য অ্যাপে দেখা যাচ্ছে না। ফলে আবার কাগজে ফর্ম দিতে বলা ছাড়া উপায় নেই।”
এতে একই ফর্ম দু’বার জমা পড়ছে— অনলাইন ও ম্যানুয়াল। ভোটারদের প্রশ্ন, “যদি আবার কাগজে ফর্মই জমা দিতে হয়, তাহলে অনলাইন প্রক্রিয়ার মানে কী?”
ভোটারদের অভিযোগ, ১৯৫০ হেল্পলাইনে ফোন ধরাই হচ্ছে না। আবার ধরা হলেও কর্মকর্তারা বলছেন— “লোকাল BLO–র সঙ্গে যোগাযোগ করুন।”
নাগরিকদের বক্তব্য, “যদি BLO–কেই সব সমস্যা সামলাতে হয়, তাহলে হেল্পলাইনের প্রয়োজন কোথায়?”
ফর্ম বিলি ও সংগ্রহের সময়সীমা এতটাই কম যে BLO–দের মতে বাস্তবভিত্তিক নয়।
তাঁদের বক্তব্য—
- বানান ভুল হওয়ার ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি
- সময়সীমা বাড়ানো না হলে ভুলে ভরা ডেটা আপলোড হওয়ার আশঙ্কা
অনেক জেলার BLO–রা জানিয়েছেন,
- অনেকেই উচ্চবয়সী
- প্রযুক্তি–অভিজ্ঞতা সীমিত
- স্মার্টফোন ব্যবহারেই অসুবিধা
এই অবস্থায় জটিল অ্যাপ ব্যবহার করে দ্রুত ফর্ম এন্ট্রি করা তাঁদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজ্যের বহু নাগরিক মনে করছেন, বর্তমান প্রক্রিয়াকে সরলীকরণ করতে নির্বাচন কমিশনের উচিত বাড়ি–বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহের পুরনো পদ্ধতিকে পুনরায় সক্রিয় করা। তাঁদের যুক্তি— BLO যদি সরাসরি ভোটারের বাড়িতে গিয়ে প্রয়োজনীয় নথি যাচাই করে তথ্য সংগ্রহ করেন, তবে সেখানেই অনলাইন অথবা কাগজে ফর্ম পূরণ করে জমা নেওয়া সম্ভব হবে। এতে—
- সাধারণ মানুষকে সাইবার ক্যাফে বা বেসরকারি এজেন্টের কাছে যেতে হবে না,
- অতিরিক্ত টাকা খরচ করে ফর্ম পূরণ করাতে হবে না,
- ভুল–ত্রুটির পরিমাণ কমবে,
- এবং পুরো প্রক্রিয়াটি আরও স্বচ্ছ হবে।
অভিযোগ উঠছে, বর্তমানে অনলাইন সিস্টেমের জটিলতা ও অ্যাপ–সংক্রান্ত সমস্যার কারণে বহু মানুষ বাধ্য হচ্ছেন ৫০–১৫০ টাকা খরচ করে সাইবার ক্যাফে, মোবাইল দোকান বা এজেন্টের সাহায্য নিতে। অনেকেই বলছেন—“সরকারি পরিষেবা নিতে গিয়ে কেন অতিরিক্ত টাকা দিতে হবে? BLO যদি বাড়িতে এসে ফর্ম পূরণে সাহায্য করেন, তাহলে মানুষের কষ্ট অনেকটাই কমবে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাড়ি–বাড়ি তথ্য সংগ্রহ ও ফর্ম পূরণ পরিষেবা পুনরায় চালু করলে গ্রামীণ ও প্রান্তিক এলাকার নাগরিকরা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন। কারণ অনেকেই স্মার্টফোন–অ্যাপ বা অনলাইন পোর্টাল ব্যবহার করতে পারেন না।
শিক্ষক সমাজ ও BLO–দের একটাই দাবি—
- প্রতি বুথে একজন করে ডেটা এন্ট্রি অপারেটর নিযুক্ত করা
- BLO–রা কেবল বাড়ি–বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করবেন
- ডিজিটাইজেশন কাজ আলাদা কর্মী করবেন
BLO–দের বক্তব্য,“আমরা শিক্ষক, ডেটা এন্ট্রি অপারেটর নই। শ’শ’ ফর্ম হাতে নিয়ে ডিজিটাইজেশন করা সম্ভব নয়।”
এই পরিস্থিতিতে পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়া ও পশ্চিম মেদিনীপুরের বালিচক BLO–দের দুটি গুরুত্বপূর্ণ চিঠি প্রশাসনিক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে—
- যাদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা নেই, তাঁদের জোর করে অনলাইন কাজ করানো যাবে না
- অ্যাপের সার্ভার সমস্যা অবিলম্বে ঠিক করতে হবে
- পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়াই অনলাইন কাজ চাপিয়ে দেওয়া অযৌক্তিক
- সময়সীমা অন্তত দুই সপ্তাহ বাড়াতে হবে
- BLO–দের “অন–ডিউটি” ঘোষণা করতে হবে, যাতে শিক্ষাগত দায়িত্ব ব্যাহত না হয়
বহু BLO জানিয়েছেন—
- স্থানীয় প্রশাসন থেকে বারবার ফোন যাচ্ছে
- ফর্ম জমা দেওয়ার তাড়া
- রাজনৈতিক চাপ
- মিডিয়ার নজর
এসব মিলিয়ে মানসিক চাপ তীব্র হচ্ছে।
নির্বাচনী বিশেষজ্ঞদের মতে—
- সময়সীমা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি
- অ্যাপের ত্রুটি দ্রুত সারানো উচিত
- প্রতিটি বুথে ডেটা এন্ট্রি সহকারী নিয়োগ
- BLO–দের পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ
- ফর্ম ফিলাপ প্রক্রিয়া সরলীকরণ
এগুলো করা না হলে— ভুল, বিভ্রান্তি ও অস্বচ্ছতার ঝুঁকি বাড়বে বলেই মত তাঁদের।
রাজ্যের BLO–দের মাথায় এখন তিনটি চাপ একসাথে—
- শিক্ষকের নিয়মিত দায়িত্ব
- ফর্ম বিলি ও সংগ্রহ
- অনলাইন ডিজিটাইজেশন
রাজ্য নির্বাচন কমিশন এই বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়— এখন তাকিয়েই আছে রাজ্যের হাজার হাজার BLO ও সাধারণ ভোটার।


![]()

More Stories
পাঁচ লক্ষ কণ্ঠে গীতা পাঠের ডাক ব্রিগেডে, রাজ্যপালকে আমন্ত্রণ সনাতন সংস্কৃতি সংসদের
বিধানসভা নির্বাচনের আগে ইভিএম–ভিভিপ্যাটের এফএলসি শুরু রাজ্যে, চলবে ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত
হাতুড়ে ডাক্তারি বনাম পাশ করা ডাক্তার—অরাজকতার জঞ্জালে বাংলার স্বাস্থ্যব্যবস্থা