সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ গ্রামবাংলার নিস্তব্ধ সবুজ প্রান্তর, ধুলোমাখা আঁকাবাঁকা পথ, আর নদীর কলতান—সব কিছুর মাঝেই অচেনা-অজানা এক অনন্ত ইতিহাস বহন করে দাঁড়িয়ে রয়েছে অজস্র মন্দির। মানুষের লোকবিশ্বাস, বংশপরম্পরার ধর্মীয় আচরণ, আর প্রকৃতির রহস্যময়তার মিলনক্ষেত্র এই মন্দিরগুলি। তেমনই এক গভীর ভক্তি ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধনের আশ্রয়স্থল হলো বাঁকুড়ার জয়রামবাটির সিংহবাহিনী মন্দির।
সময়টা ঠিক কত শতক আগের, তা লিপিবদ্ধ ইতিহাসে নেই। কিন্তু কথামালায় ভেসে আসে এক নাম—কৈলাস মণ্ডল। কথিত আছে, স্বপ্নে তিনি দেবীর আদেশ পান—মাতৃমূর্তি নদীগর্ভেই লুকিয়ে আছে, তাকে উদ্ধার করতে হবে ভক্তের হাত ধরেই। পরদিন ভোরে, ধোঁয়াটে কুয়াশার ভেতর দিয়ে তিনি পৌঁছান কুরিয়াদহ-আমোদর নদীর তীরে। নদীর জল স্পর্শ করতেই মনে হয়—এই জল শুধু জল নয়, কোনো অতীন্দ্রিয় আহ্বান। এরপর নদী থেকে উদ্ধার হয় তিন দেবীমূর্তি—পিতলের তৈরি, ছোট পিতলঘটের উপর দেবীর মুখাবয়ব খোদাই করা, যার আড়ালে ছিল যুগের পর যুগের দিব্য উপস্থিতি।
আরেক পক্ষের স্মৃতিতে উঠে আসে সম্পূর্ণ ভিন্ন কাহিনি—অনেকের বিশ্বাস, এই মূর্তি বানিয়ে দিয়েছিলেন বর্ধমানের রাজা। লোকমুখে বলা হয়, রাজা তন্ত্রসাধনার অনুরাগী ছিলেন এবং দেবীর শক্তি প্রতিষ্ঠা করতে নিজ রাজ্য থেকে মূর্তি নির্মাণ করিয়ে পাঠিয়েছিলেন জয়রামবাটিতে। ইতিহাস ও স্বপ্নকথা—দু’ধারাই সমান্তরাল বহমান, সত্য একটাই—মানুষের বিশ্বাসের জোরেই দেবী এখানে বিরাজমান।
দেবীমূর্তি প্রাপ্তির সংকেতকে শিরোধার্য করে মন্দির স্থাপন করেন গোপাল মণ্ডল। তিনি ছিলেন সাধারণ গৃহস্থ, কিন্তু দেবীর ডাকে অসাধারণ এক কর্তব্য গ্রহণ করেছিলেন। তিন দেবীকে একসূত্রে প্রতিষ্ঠা করা হয়—দেবী চণ্ডী,দেবী মহামায়া আর তাঁদের মাঝখানে সিংহবাহিনী মাতা, যিনি লোকবিশ্বাসে মা দুর্গার প্রবল শক্তির এক বিশেষ প্রকাশ। দেবীর মুখশ্রী এত ছোট বিগ্রহে খোদাই হলেও, তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল বিশাল—যেন মাতৃশক্তি এক ক্ষুদ্র ঘটেও অনন্ত আকাশ ধারণ করে।
মন্দির প্রতিষ্ঠার পর নিত্যপুজো ও সেবার দায়িত্ব গ্রহণ করেন জয়রামবাটির এক প্রাচীন ব্রাহ্মণ পরিবার—রামচন্দ্র মুখোপাধ্যায়-এর বংশধররা। তাঁদের পরিচয় শুধু পৌরোহিত্যতে নয়—তাঁরা ছিলেন মা সারদা দেবীর (শ্রীরামকৃষ্ণের সহধর্মিনী) বংশপরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত। সারদা দেবী-এর জীবনকে ভক্তি ও ত্যাগের যে আদর্শ গেঁথেছে, তারই উত্তরাধিকার যেন এই মন্দিরের সেবাপরায়ণতায় প্রতিধ্বনিত। বিবাহের পর দক্ষিণেশ্বর মন্দির-এ গিয়েছিলেন সারদা দেবী। সেখান থেকে জয়রামবাটি ফিরে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে, আশ্রয় নেন সিংহবাহিনী মাতার চরণে। লোকবিশ্বাসে প্রচারিত কাহিনি বলে—দেবী তাঁকে স্বপ্নে এক বিশেষ ওষুধের সন্ধান দেন। সেই ওষুধ প্রয়োগের পর ক্রমে সুস্থ হয়ে ওঠেন তিনি। এই অধ্যায় স্থানীয় পূজারীতিতে এমন প্রভাব ফেলেছিল যে, মন্দিরের মাহাত্ম্য শুধু ধর্মাচারে নয়, মানবিক আরোগ্য-বিশ্বাসেও প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। বিশেষ পুজো হয় প্রতি—শনি ও মঙ্গলবার, দুর্গাপুজোর দিনগুলি ও আর প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর দিনে। ভক্তরা বহু গ্রাম পেরিয়ে আসেন দেবীর আশীর্বাদ নিতে ও প্রায় দিনই দেবীকে দুধ দিয়ে স্নান করতে।
অন্যসব মন্দিরে যখন অন্নভোগ নিবেদন করা হয়, এখানে বংশানুক্রমিক নিয়মে—রান্না করা ভোগ নিষিদ্ধ। দেবীকে নিবেদন করা হয় কেবল— চাল,ফল,মিষ্টি। এগুলিই প্রসাদ হিসেবে বিতরিত হয়। এর পেছনে বিশ্বাস—দেবী এখানে অতৃপ্ত নন, তিনি নিবেদন চান, অন্ন নয়; তিনি ভক্তির সার চান, রান্নার ব্যঞ্জন নয়।
এখানে যেমন পিতলের ঘটে দেবীর মুখ, তেমনই পিতলের বিগ্রহে মা মনসা-র মূর্তিও রয়েছে—সিংহবাহিনী মাতার এক সহশক্তি, নির্ভর ও সুরক্ষার আরেক আশ্রয়। মন্দির সংলগ্ন পূর্ণপুকুর থেকে জল তোলার রীতি দিয়ে শুরু হয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পূজা। ভোরবেলা যখন ভক্তরা পুকুরঘাটে এসে কাঁসা-পিতলের ঘটি নামান, তখন মনে হয়—এই জল স্পর্শ করা প্রতিটি হাতে যেন ইতিহাসেরই অভিষেক ঘটছে।
মন্দিরে একটি বলির স্থান (থান) রয়েছে—যেখানে, থানের পাশের মাটিকে ভক্তরা প্রসাদতুল্য মনে করেন। তাঁরা বিশ্বাস করেন—এই মাটির স্পর্শে রয়েছে আরোগ্য, বিপদনাশ, অশুভ দূর করার শক্তি। কেউ তা বাঁধাই করে রাখেন ঘরে, কেউ কপালে স্পর্শ করেন, আবার কেউ তা সন্তানের বালিশের নিচে রেখে নিশ্চিন্ত ঘুমান।
শুরুর দিকে মন্দির ছিল মাটির দেয়াল আর খড়ের চালায় গড়া—একেবারে গ্রামীণ কাঠামোর আশ্রয়ে। সময়ের হাত ধরে আজ তা বিশাল নাটমন্দির রূপান্তরিত হয়েছে। ইট-পাথরের দৃঢ়তায় বাঁধা পড়লেও, মন্দিরের প্রাণ তার ধ্বজায়—যা বাতাসে আজও তান্ত্রিক শক্তির মতোই নৃত্য করে। প্রতিষ্ঠা দিবসে ২৪ প্রহরব্যাপী হরিনাম সংকীর্তন অনুষ্ঠিত হয়—যার ধ্বনি নদীর স্রোতের মতোই অবিরাম—“হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ…” এই গান শুধু গান নয়, গ্রামের সামগ্রিক চেতনার ধমনিস্বর। এই সময়—গ্রামের মানুষ প্রসাদ গ্রহণ করেন, দেবীকে স্মরণ করে মানত পূর্ণ করেন এবং বংশগত সেবাপতিত্ব আজও বহন করেন মণ্ডল পরিবার ও সারদা পরিবারের পুরোহিতরা, যা মন্দিরকে কেবল উপাসনালয় নয়—এক জীবন্ত সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার-এ রূপান্তরিত করেছে।
পথের ধুলো, নদীর জল আর ঘটের মুখশ্রী—সব মিলিয়ে জয়রামবাটির সিংহবাহিনী মন্দির শুধু এক ধর্মস্থান নয়; এটি গ্রামীণ মানবিকতার শক্তিকেন্দ্র, যেখানে বিশ্বাস ইতিহাস নির্মাণ করেছে, আর ইতিহাস বিশ্বাসের রূপ নিয়েছে। দেবী এখানে বাস করেন ঘটের তাম্রপৃষ্ঠে, কিন্তু তাঁর শক্তি বিস্তৃত মানুষের হৃদয়ে।

![]()

More Stories
ওড়ন ষষ্ঠীতে বস্ত্রদান ও সহমর্মিতার বার্তা—অগ্রহায়ণের শ্রীক্ষেত্রে মানবিকতার নতুন অধ্যায়
অসামাপ্ত রেলস্বপ্ন: বাগনান–আমতা–চাঁপাডাঙা প্রকল্প জমি–জটে স্থবির
গণতন্ত্রে অন্তর্ভুক্তির বার্তা: তৃতীয়লিঙ্গ, যৌনকর্মী ও তাঁদের সন্তানদের ভোটাধিকার সুরক্ষায় কমিশনের বিশেষ উদ্যোগ