November 30, 2025

বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের লড়াই আজও প্রাসঙ্গিক — আরামবাগের সিপিআইএমের নেতা সমীর চক্রবর্তীর অভিজ্ঞতায় উঠে এল সংগঠনের বাস্তবতা

সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ ১৯৫০ সালে জন্ম, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নোয়াখালী জেলা (বর্তমান বাংলাদেশ)। বাবার চাকরির সুবাদে বাল্য-কৈশোরের ১৪টি বছর কেটেছে চট্টগ্রাম নগরীতে। ১৯৬৪ সালে সেই চট্টগ্রাম থেকেই সীমান্ত পেরিয়ে পা রাখেন ভারতবর্ষে। শরণার্থী জীবনের অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও থেমে যায়নি পড়াশোনার গতি—প্রথমে পশ্চিমবঙ্গের রানীগঞ্জে, তারপর ১৯৬৫ সালে পরিবার স্থায়ীভাবে চলে এলে কোন্নগরের নবগ্রামে বসবাস শুরু। সেখানেই গড়ে ওঠে তাঁর শিক্ষা ও রাজনৈতিক চেতনাবোধ।

সমীর চক্রবর্তীর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা কোনও ক্ষমতার মসৃণ রাজপথে নয়, বরং ক্ষুধা, দ্রব্যমূল্যের আগুন ও ন্যায্য খাদ্যের দাবিতে উত্তাল ১৯৬৬-এর খাদ্য আন্দোলনে। অল্প বয়সেই খাদ্যের অধিকার নিয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন তিনি। সেই সময় খাদ্য আন্দোলনের মিছিলে সামিল ছিলেন তাঁর বাবা-ও—যা তাঁর বামপন্থী রাজনীতিতে প্রবেশের ভিত্তি আরও দৃঢ় করে।


বৃহৎ পত্রিকা-জগতেও তাঁর বোধ-গঠনের ছাপ স্পষ্ট। বসুমতী পত্রিকায় প্রকাশিত বিবেকানন্দ মুখার্জির এক লেখা পড়েই রাজনীতির আদর্শিক দিশায় অনুপ্রাণিত হন কিশোর সমীর। ১৯৭০ সালেই তিনি যোগ দেন Communist Party of India (Marxist)-এ, হন দলের প্রথম পর্যায়ের সক্রিয় সদস্য। একই বছরে দায়িত্ব পান যুব সংগঠন—Democratic Youth Federation of India-এর একটি ইউনিটের সেক্রেটারির। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৮-এ রিষড়া যুব সংগঠনের সভাপতির পদ, ১৯৭৯-এ সম্পাদকের দায়িত্ব সামলেছেন তিনি।


দলীয় নেতৃত্বের কাছে শহরের আরাম ছেড়ে গ্রামবাংলায় কাজ করার ইচ্ছা জানিয়ে চিঠি দেন সমীরবাবু। নির্দেশ অনুযায়ী তাঁর পথ গিয়েছে আরামবাগ মহকুমার দিকে। প্রথমে ডিহিবাগনানের গৌরাঙ্গ ভট্টাচার্যের বাড়িতে, পরে সালেপুরের রামনগরে জয়দেব কোলের বাড়িতে থেকেছেন দীর্ঘদিন। ঠিক সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল গ্রাম-কেন্দ্রিক সংগঠন বিস্তার ও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর লড়াই।

১৯৮১ সালের নভেম্বর মাসে হয় অবিভক্ত আরামবাগ লোকাল কমিটির সম্মেলন—১৫টি অঞ্চল ও একটি পৌরসভা নিয়ে। সেই সম্মেলনেই সমীর চক্রবর্তী সম্পাদক পদের দায়িত্ব পান। এরপর ১৯৮৮ সালে বৃন্দাবনপুরে তৈরি করেন নিজস্ব বাসস্থান, আর ২০০৪ থেকে ২০২১ পর্যন্ত দলের জেলা সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ধারাবাহিকভাবে। বর্তমানেও তিনি পার্টি সদস্য এবং “ফুল টাইমার”—অর্থাৎ হোল-টাইম রাজনৈতিক কর্মী।


সম্প্রতি এক মত-বিনিময় বৈঠকে অভিজ্ঞ এই বামনেতা স্পষ্ট জানালেন—“২০২৬-এ বামফ্রন্টের সরকার গঠনের কথা নিছক গুজব। সাংগঠনিক ভিত এখন সেইভাবে মজবুত নয়।” তাঁর মতে, রাজনীতি ও সমাজ—দু’জায়গাতেই প্রথম প্রয়োজন সংগঠনের মজবুতি ও মানুষের কাজের অধিকার নিশ্চিত করা।


সমীরবাবুর কণ্ঠে উঠে আসে সমসাময়িক রাজনীতির গভীর উদ্বেগ—“পশ্চিমবঙ্গের বুকে সবচেয়ে বিপদজনক শক্তি এখন বিজেপি। ধর্মের নামে বিভাজন বাড়িয়ে প্রতিদিনই আক্রমণ করা হচ্ছে অন্য সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি ও অধিকারে।” তিনি মন্তব্য করেন—বাম আন্দোলন কখনোও ধর্মবিরোধী নয়, বরং বৈচিত্র্যের সহাবস্থানে বিশ্বাসী। “জীবনের দীর্ঘ সময় মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে থেকেছি। কখনো কোনও সমস্যা হয়নি। আমাদের লড়াই মানুষের অধিকারের, ধর্মের বিরুদ্ধে নয়.” তাঁর মতে, পরিবর্তন একক শক্তিতে সম্ভব নয়—বামফ্রন্ট যদি বৃহত্তর ধর্মনিরপেক্ষ জোট বাঁধতে পারে, তবেই বড় রাজনৈতিক লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হবে। তিনি ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দেবের বাণী যত মত তত পথ ও বামফ্রন্টের ঐতিহাসিক চরিত্রের উল্লেখ করে বলেন—বামপন্থা সংস্কারকে সম্মান করে, দেখে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দেব কিংবা রাজা রামমোহন রায়কে সমাজ-সংস্কারক হিসেবে।


নিজ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি জানান—“সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় ও অনিল বসুকে সাসপেন্ড না করলেই ভাল হতো”—যা আদর্শ ও আন্দোলনের গণতান্ত্রিক পরিসরকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল।


সমীর চক্রবর্তীর মূল সুর স্পষ্ট—সমাজে যত বৈষম্য বাড়বে, ততই কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রাসঙ্গিকতা দৃঢ় হবে। তিনি বলেন—“সমাজকে যদি বৈষম্যহীন করতে হয়, তবে মানুষের কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, কারখানা নির্মাণ করতে হবে, রুটি-রুজির প্রশ্নকে সামনে রেখে রাজনীতি করতে হবে।” তাঁর সমালোচনা তীব্র—“মন্দির-মসজিদ উদ্বোধনের রাজনীতি নয়, দরকার শিল্প-কারখানা উদ্বোধনের রাজনীতি—মানুষের হাতে কাজ তুলে দেওয়ার রাজনীতি।”


তিনি মনে করেন—পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে যুবসমাজের মেধা। “কখনো প্রযুক্তি, কখনো বাহুবল—প্রতিদিনই আক্রমণ হচ্ছে চিন্তার স্বাধীনতার উপর। মেধা ও শিক্ষার বিনাশ হলে দেশ শুধু বাহুবল দিয়ে চলতে পারে না।” মূল্যবোধের অবক্ষয়কে তিনি “এক সামাজিক ব্যাধি” হিসেবে উল্লেখ করে বলেন—“এই সমাজে বাস করে বামপন্থী কর্মীরাও মূল্যবোধ-অবক্ষয়ের বাইরে নন।”


রাজ্য ও দেশের শাসন ব্যবস্থার বিষয়ে তিনি বলেন—“স্বেচ্ছাচারিতা হচ্ছে সর্বত্র, মূল্যায়ন নয়, চলছে বলপ্রয়োগ। দেশকে অগ্রগতির পথে ফিরিয়ে আনতে দরকার ধর্মনিরপেক্ষ ও কাজ-ভিত্তিক সরকার।” লড়াই সংগঠনের, লড়াই কাজের, লড়াই বৈষম্য-বিরোধী আদর্শের হওয়া উচিত ।

সমীর চক্রবর্তীর অভিজ্ঞতায় স্পষ্ট—“রাজনীতির কেন্দ্র হওয়া উচিত মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষার অধিকার। শিল্প, কর্মসংস্থান, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সাংগঠনিক গণতন্ত্র ছাড়া পরিবর্তন সম্ভব নয়।বৈষম্য-বিরোধী লড়াই নয় শুধু রাজনৈতিক কর্তব্য, এটি মানবতার প্রথম শপথ—বৈষম্যহীন সমাজই ভবিষ্যতের একমাত্র বিকল্প।”

Loading