November 30, 2025

বঙ্গোপসাগরের আকাশে ১৪,০০০ কিমি নো–ফ্লাই জোন ঘোষণায় ভারতের নিরাপত্তা কৌশলে নতুন অধ্যায়


সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ বঙ্গোপসাগরের উপরিভাগের আকাশসীমায় প্রায় ১৪,০০০ কিলোমিটার বিস্তৃত নো–ফ্লাই জোন (NFZ) ঘোষণা করেছে ভারত সরকার—যা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আলোচিত প্রতিরক্ষা–কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে উঠে এসেছে। সচরাচর ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা, সামরিক মহড়া কিংবা মহাকাশ উৎক্ষেপণ রিহার্সালের জন্য আকাশসীমা সাময়িক বন্ধ রাখার নজির থাকলেও, এত বিপুল পরিসরের নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার ঘটনা ব্যতিক্রমী। বিশেষজ্ঞ–মহলের মতে, এই সিদ্ধান্ত ভারতের উন্নত প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ প্রযুক্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সম্ভাব্য ইঙ্গিত বহন করছে।

নো–ফ্লাই জোন: সংজ্ঞা ও সাধারণ উদ্দেশ্য

নো–ফ্লাই জোন বলতে বোঝায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ঘোষিত আকাশপথে কোনও বাণিজ্যিক বা বেসামরিক বিমান চলাচল নিষিদ্ধ থাকা। সাধারণভাবে এটি মূলত তিনটি ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়—
(১) মিসাইল বা রকেট উৎক্ষেপণ পরীক্ষা,
(২) সামরিক অস্ত্র মহড়া,
(৩) উচ্চ–ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিরক্ষা বা মহাকাশ–গবেষণাগত ব্যবহার।

এই সূত্রেই এবার বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশিতে ভারতের দীর্ঘদিনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র–পরীক্ষা, সাবমেরিন লঞ্চ ব্যালিস্টিক মিসাইল (SLBM) ট্রায়াল, স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ রিহার্সাল এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য লঞ্চ–ভেহিকল প্রযুক্তি সংক্রান্ত গবেষণা–কার্যক্রমের যোগসূত্র খোঁজা হচ্ছে।

পরিসর অস্বাভাবিক—ইঙ্গিতও বড়

এত বড় NFZ ঘোষণায় প্রথমেই আলোচনায় উঠে এসেছে ভারতের সম্ভাব্য প্রযুক্তি–পরীক্ষার অনুমান। প্রতিরক্ষা–বিশ্লেষকদের মতে, এর মধ্যে কয়েকটি কৌশলগত উদ্দেশ্য থাকতে পারে—

১. দীর্ঘপাল্লার বা হাইপারসনিক অস্ত্র পরীক্ষা

শব্দের গতির ৫ গুণেরও বেশি বেগে চলতে সক্ষম হাইপারসনিক প্রযুক্তিতে ভারত গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিক গবেষণা চালাচ্ছে। এই ধরনের উচ্চ–বেগ ও দীর্ঘ–পাল্লার অস্ত্র–পরীক্ষার জন্য বিশাল নিরাপদ আকাশসীমা একান্ত প্রয়োজন। এই কারণেই আগ্নেয় ক্ষেপণাস্ত্র সিরিজের ভবিষ্যৎ পর্যায় বা হাইপারসনিক টেস্ট ভেহিকল (HSTDV) পরীক্ষার সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছেন না প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা।

২. SLBM উৎক্ষেপণ পরীক্ষার নিরাপত্তা–ব্যবস্থা

ভারতের পারমাণবিক-নৌবহর সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে Strategic Forces Command–এর সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা–ঘাঁটি হিসেবে বঙ্গোপসাগরের গুরুত্ব ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সাবমেরিন থেকে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ–পরীক্ষার সময় বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ–চলাচল বন্ধ রাখা নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—এই যুক্তিও জোর্যাকারে উঠছে।

৩. মহাকাশ উৎক্ষেপণ–রিহার্সাল বা উচ্চক্ষমতার রকেট–মোটর পরীক্ষা

ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা—ISRO–এর ভবিষ্যৎ রকেট–টেস্ট বা উৎক্ষেপণ–রিহার্সালের প্রস্তুতির অনুমানও আলোচনায় রয়েছে। বিশেষত পুনর্ব্যবহারযোগ্য লঞ্চ–সিস্টেম বা উচ্চ–ক্ষমতার রকেট–মোটর পরীক্ষার ক্ষেত্রেও এই সিদ্ধান্ত প্রাসঙ্গিক হতে পারে।

তবে এটি শুধু প্রযুক্তি–পরীক্ষা নয়, বরং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা–রাজনীতির ভাষাও—তা স্পষ্ট করছেন বিশ্লেষকরা।

প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি কৌশলগত বার্তা:
এই ঘোষণাকে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও মায়ানমারের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও নিরাপত্তা–দৃঢ়তার বার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

ইন্দো–প্যাসিফিক অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য:
চীনের সামুদ্রিক ও আকাশ–তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে India’s maritime security posture–এর এই পদক্ষেপ ভারত মহাসাগরে নিরাপত্তা–বলয় আরও সংগঠিত করার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

SAGAR নীতির সঙ্গে সমন্বয়:
এটি ভারতের ‘Security and Growth for All in the Region (SAGAR)’ নীতির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা সমুদ্র–নিরাপত্তা, বাণিজ্য–রক্ষা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে গুরুত্ব দেয়।

বাণিজ্যিক বিমান চলাচলে সাময়িক প্রভাব:
NFZ চলাকালীন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রুট সাময়িকভাবে ঘুরিয়ে নিতে হয়—যার ফলে কিছু ক্ষেত্রে খরচ ও সময় বাড়ার সম্ভাবনা থাকলেও, অতীতে দেখা গেছে পরীক্ষাকালীন নিষেধাজ্ঞা সাধারণত কয়েক ঘণ্টা থেকে সর্বোচ্চ কয়েকদিন থাকে—বাণিজ্য খুব দীর্ঘমেয়াদে ব্যাহত হয়নি।

NFZ ঘোষণার পর সাধারণ জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—

ভারতের কি নতুন হাইপারসনিক অস্ত্র প্রস্তুত?
ইন্দো–প্যাসিফিক নিরাপত্তা–সমীকরণে কি ভারত আরও কঠোর কৌশলে এগোচ্ছে?
নাকি আসন্ন কোনও বড় মহাকাশ–সফলতার আগে পরীক্ষা–প্রস্তুতি চলছে?

সরকারি সূত্রে এখনো নির্দিষ্ট কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা না করা হলেও, প্রতিরক্ষা–বিশেষজ্ঞদের দৃঢ় অভিমত—

“এত বড় আকাশ–নিষেধাজ্ঞা সাধারণত বড় মাপের কৌশলগত পরীক্ষা–প্রস্তুতি ছাড়া ঘোষিত হয় না।”

বঙ্গোপসাগরের আকাশে ১৪,০০০ কিমি বিস্তৃত নো–ফ্লাই জোন ঘোষণাটি নিঃসন্দেহে India’s defense strategy–এর এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। এটি যেমন ভারতের সম্ভাব্য উচ্চ–চাপ প্রযুক্তিগত পরীক্ষার ইঙ্গিত দিচ্ছে, তেমনি ইন্দো–প্যাসিফিক অঞ্চলে সামুদ্রিক–নিরাপত্তা জোরদারের এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী ভূ–রাজনৈতিক বার্তাও বহন করছে।

সামনে ঠিক কোন পরীক্ষা বা মহড়া হতে চলেছে তা জানা না গেলেও, একটি বিষয় স্পষ্ট—
ভারত তার প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও মহাকাশ সামর্থ্যকে আরও উচ্চস্তরে নিয়ে যেতে প্রস্তুতি নিচ্ছে—যার প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে পড়েছে সমুদ্র–থেকে–আকাশে।

Loading