November 30, 2025

oplus_0

প্রতিবাদী ছড়ার রাজা—সাধারণ মানুষের কণ্ঠ হয়ে ওঠা সাধন বারিক

সোমালিয়া ওয়েব নিউজ; “আমাদের রুটি চুরি করে রাজা, রোজ খান রাজভোগ”—এই দুটি লাইন যেন শুধু ছড়া নয়, সমাজের বুকে বিঁধে থাকা বহুকালের ক্ষুধা–অসুখ–অবিচারের প্রতীক। এই প্রতীকের জনক ছড়াকার সাধন বারিক—ব্যক্তি, যাঁর কলম নয়, যন্ত্রণার আগুন থেকেই জন্ম নেয় ছন্দমিলানো প্রতিবাদের শব্দ।সাধন বারিকের জন্ম উত্তর ২৪ পরগনা জেলার রাজারহাট ব্লকের লাওহাটি গ্রামে—শৈশব কেটেছে লোকসংস্কৃতি, গান–কীর্তন–ছড়ার অনুষঙ্গে জড়ানো পারিবারিক আবহে। তাঁর ঠাকুমা মুখে–মুখে ছড়ার ঝুলি খুলে বসতেন—সেখান থেকেই প্রথম ছড়ার গাঁথনি শেখা। জ্যাঠামশাই কীর্তন গাইতেন, মা-র গলায় ছিল সুরের মায়া; বাড়ির প্রতিটি কোণেই ছিল সাংস্কৃতিক চর্চার নিরন্তর ছায়া।পরবর্তী জীবনে ব্যবসায়িক সূত্রে চলে আসা আরামবাগ–আরামবাগের মাটি তাঁকে দিয়েছে নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন শ্রেণীর মানুষের গল্প। তিনি বলেন, “ছড়া শেখা পরিবারে, কিন্তু ছড়া লেখা সমাজে।” আর সেই সমাজের মূল চরিত্র তাঁর কাছে রাজা–উজির নয়—চাষা, শ্রমিক, খেটে–খাওয়া সাধারণ মানুষ। আজকের দিনে শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভুগছেন সাধনবাবু—প্রতিবাদী ছন্দ এখন মাঝে–মাঝে থেমে যায় হাঁপানির শব্দে, কিন্তু চিন্তা থামে না। তাঁর দাবি, জীবনে প্রায় ১০,০০০ ছড়া লিখেছেন তিনি—যার মধ্যে ৬,০০০ ছড়া কোনরকমে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে। বাকিগুলি সময়ের ঘূর্ণিতে হারিয়ে গেছে। তবু সংখ্যার হিসেবের বাইরে তাঁর সবচেয়ে বড় সম্পদ—ছড়ায় বন্দী সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস, অভিমান, প্রতিবাদ আর আশা। বিভিন্ন সময় সাহিত্য চর্চায় যুক্ত ছিলেন তিনি—লেখালেখি করেছেন বসুমতী, আনন্দমেলা, যুগান্তর, সন্দেশ, জনসেবক–সহ একাধিক জনপ্রিয় পত্রিকায়। বসুমতী, আনন্দমেলা, যুগান্তর, সন্দেশ, জনসেবক—তাঁর ছড়া প্রকাশের অন্যতম ক্ষেত্র ছিল। সমাজের বৈষম্য তাঁকে প্রতিনিয়ত ভাবায়—এই ভাবনা থেকেই অধিকাংশ লেখার জন্ম। সাধনবাবুর মতে, “বৈষম্যই আমার গুরু, ক্ষুধাই আমার ছন্দ।” সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রাম, চাষ–শ্রম–অভাব–অসম্মানের জীবনই বারবার উঠে এসেছে তাঁর ছড়ায়। বর্তমান রাজনীতি ও শিক্ষা–ব্যবস্থার অবনতিতে তিনি গভীরভাবে ব্যথিত। আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন—”যেভাবে সব চলছে, ভবিষ্যতে মানুষের মেরুদণ্ড ভেঙে যাবে, আর শিক্ষার এত নীচু মান—দিন আসবে, মানুষ বাটি হাতে রাস্তায় নামবে।” তাঁর মতে, প্রযুক্তি উন্নতির উপহার হলেও ধ্বংসের পথও খুলে দিয়েছে। বিশেষত মোবাইল–নির্ভর সমাজ তাকে আতঙ্কিত করে। বলেন, “বই পড়া আর প্রযুক্তি পড়া কখনও সমান নয়, মোবাইলের নেশায় সমাজের মন নষ্ট হচ্ছে, বুদ্ধি–মন–মানবিকতা সবকিছুতেই এর প্রভাব বিষ।”ধর্ম–মানবিকতা প্রশ্নেও তাঁর বক্তব্য তীব্র, বিতর্কিত—তিনি মনে করেন, “ধার্মিক মানুষ আচার করেন, পশু বলি দেন, কিন্তু মানবিক হতে পারেন না। মনুষ্যত্ব সাহিত্যে, মনুষ্যত্ব প্রকৃতিতে, মনুষ্যত্ব মানুষে—শুধু ধর্মে নয়।”এত কিছুর পরেও, আশ্চর্যজনকভাবে রাজ্য সরকারের তরফ থেকে এখনও পর্যন্ত কোন পুরস্কার বা সম্মান পাননি সাধন বারিক। এই নিয়ে তাঁর মনে রয়েছে চাপা অভিমান। সরকারের কাছে একাধিকবার দরখাস্ত করেছেন, সাহায্যের আবেদন রেখেছেন—কিন্তু কোন সাড়া পাননি। পেট চালাতে এই ৭৬ বছর বয়সেও তাকে এখনো কয়েকটি প্রাইভেট টিউশনি করতে হয়। তাঁর আক্ষেপ, “প্রতিবাদী ছড়া লিখি বলে হয়তো সাহায্য পাইনি, সরকার কর্ণপাত করেনি, এই অভিমান আমার ছড়ার চেয়েও বড়।”যদিও সরকারী সম্মান না পেলেও বেসরকারিভাবে বহু সম্মান পেয়েছেন তিনি। সম্প্রতি পেয়েছেন মানবজমিন সম্মান—এর আগে সমাজ–সংগঠন, সাহিত্য মঞ্চ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান–থেকে বহুবার সংবর্ধিত হয়েছেন।শিশু–শিক্ষা নিয়ে তাঁর মত স্পষ্ট—”শিশুকে বিজ্ঞানমনস্ক হতে হবে, মন্দির–মসজিদ গড়ার বদলে গড়তে হবে বিজ্ঞান–চর্চা কেন্দ্র। পাঠ্যক্রমে রাজা–উজিরের গল্পের ভিড়ে চাপা পড়ে আছে সাধারণ মানুষের কথা—এই কথাই বেশি করে ভাবাতে হবে, পড়াতে হবে, বুঝতে হবে।” তাঁর মতে, উচ্চশিক্ষা অর্জনই শেষ কথা নয়; মানবিকতা না থাকলে সেই শিক্ষা মূল্যহীন। রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে তিনি তুলে ধরলেন এক সুন্দর সংযোগ—”মানুষ তৈরি হতে গেলে প্রকৃতির মাঝে থাকতে হবে—রবীন্দ্রনাথ তাই শহর ছেড়ে শান্তিনিকেতন গড়েছিলেন—বিজ্ঞান, প্রকৃতি, সাহিত্য—মিলেমিশে মানুষ তৈরি হয়।

“কেউ বললে নাকো খোকা মানুষ হ..”

সাধন বারিক শুধু একজন ছড়াকার নন—তিনি এক জীবন্ত সময়দলিল, এক প্রতিবাদী ভাষা, আর এক জনপদের বিবেক। তাঁর কণ্ঠে লেখা ছড়া হয়তো শিশুদের মুখে মুখে বলা হবে, কিন্তু তার ভেতরে থাকবে সমাজকে জাগিয়ে তোলার এক নিরন্তর আহ্বান।

oplus_0

Loading