February 4, 2026

প্রশ্নে আটকে থাকা মানুষ আর পথ চলা সাধক

সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ সে অনেক দিন আগেকার কথা।
একদিন একটি ছোট্ট রেল স্টেশনে একটি ট্রেন এসে থামল। প্ল্যাটফর্মে এক কিশোর জল বিক্রি করছিল। ঠিক তখনই এক শেঠজি তাকে ডাকলেন। ছেলেটি এগিয়ে এসে গ্লাসে জল ঢালতে শুরু করল।

শেঠজি জিজ্ঞাসা করলেন,
— “হ্যাঁ ভাই, জল কত করে?”
ছেলেটি বলল,
— “আট আনা।”

দরাদরির সুরে শেঠজি বললেন,
— “চার আনায় হবে না?”

ছেলেটি মৃদু হেসে গ্লাস থেকে ঢালা জল আবার নিজের পাত্রে ঢেলে নিল এবং কোনও কথা না বলে সেখান থেকে সরে গেল।

ট্রেনের ওই কামরায় একজন সন্ন্যাসী বসে ছিলেন। সব ঘটনাই তাঁর চোখ এড়ায়নি। ছেলেটির এই আচরণে তিনি বিস্মিত হলেন। কোনও তর্ক নয়, কোনও কটু কথা নয়—শুধু নীরব হাসি কেন?

ট্রেন ছাড়তে দেরি হওয়ায় সন্ন্যাসী নেমে এসে ছেলেটির কাছে গেলেন। জিজ্ঞাসা করলেন,
— “বৎস, জল বিক্রি করাই যখন তোমার পেশা, তখন দরাদরি না করে তুমি নীরবে চলে গেলে কেন?”

ছেলেটি শান্তভাবে উত্তর দিল,
— “স্বামীজি, ওই লোকটির আদৌ তেষ্টা পায়নি। উনি কেবল জলের দাম জানতে চাইছিলেন। তাই আমি হেসেছিলাম।”

সন্ন্যাসী অবাক হয়ে বললেন,
— “তুমি কীভাবে বুঝলে যে উনি তৃষ্ণার্ত নন?”

ছেলেটির উত্তর আরও গভীর,
— “স্বামীজি, সত্যিই যদি তেষ্টা পেত, তবে আগে এক গ্লাস জল খেয়ে তৃষ্ণা মেটাতেন। তারপর দাম জিজ্ঞাসা করতেন। কিন্তু উনি জল খাওয়ার আগেই দাম জানতে চাইলেন—তাই বুঝলাম, তৃষ্ণা নয়, কৌতূহলই ওঁকে এনেছিল।”

ছোট্ট ছেলেটির মানুষ চেনার ক্ষমতায় সন্ন্যাসী বিস্ময়ে অভিভূত হলেন।

ধার্মিক ও আধ্যাত্মিক বিশ্লেষণ

এই ছোট্ট ঘটনাটি আসলে কেবল একটি রেলস্টেশনের গল্প নয়—এটি মানুষের আত্মিক অবস্থান বোঝার এক গভীর উপমা।

শেঠজীর তৃষ্ণা ছিল না জলের জন্য, তৃষ্ণা ছিল দামের জন্য। অর্থাৎ তাঁর মন বস্তুতে নয়, হিসেব–নিকেশে আবদ্ধ ছিল। হিন্দু দর্শনে একে বলা হয় ভোগবুদ্ধি, যেখানে মানুষ প্রয়োজনের চেয়ে লাভ ও নিয়ন্ত্রণকে বড় করে দেখে। গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন—

“ধ্যায়তো বিষয়ান্ পুংসঃ সঙ্গস্তেষূপজায়তে”
অর্থাৎ, বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তাই আসক্তির জন্ম দেয়।

ছেলেটি জল ঢাললেও যখন দরাদরি শুরু হল, সে বুঝে গেল—এখানে তৃষ্ণা নয়, অহংকার কথা বলছে। তাই সে তর্কে যায়নি। কারণ ধর্মে বলা হয়েছে,
যেখানে প্রয়োজন নেই, সেখানে বিতর্ক নিষ্ফল।

ছেলেটির নীরব হাসি ছিল এক প্রকার বৈরাগ্য। সে জানত, যে তৃষ্ণার্ত নয় তাকে জল দিলেও তৃপ্তি আসে না। উপনিষদে বলা হয়েছে—

“নায়মাত্মা প্রবচনেন লভ্যঃ”
আত্মজ্ঞান কথা দিয়ে নয়, উপলব্ধি দিয়ে আসে।

সন্ন্যাসীর বিস্ময় আসলে ছেলেটির বয়সে নয়, তার বিবেকবুদ্ধিতে। কারণ ধর্মে বয়স নয়, চেতনার পরিপক্বতাই মানুষকে বড় করে তোলে। ছেলেটি বুঝেছিল—
যে আগে দাম জিজ্ঞাসা করে, সে এখনও ভোগের হিসেবেই আটকে আছে;
আর যে আগে জল খায়, সে জীবনের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেয়।

এই গল্পে জল হলো জীবনের সত্য,
গ্লাস হলো মানবদেহ,
আর তৃষ্ণা হলো মুক্তির আকাঙ্ক্ষা

যে সত্যিকারের তৃষ্ণার্ত, সে আগে সত্য গ্রহণ করে—তারপর প্রশ্ন করে।
আর যে প্রশ্নেই আটকে থাকে, সে কখনও সত্যের স্বাদ পায় না।

আমাদের জীবনের পথেও এমনটাই ঘটে। অনেকেই জীবনের যাত্রায় না নেমে শুধু প্রশ্ন করেন—
কেন করব? কী হবে? লাভ কত?
ফলে তারা স্থিরই থেকে যায়।

অন্যদিকে যাঁরা ধর্মপথের প্রকৃত পথিক, তাঁরা জানেন—
কর্মই প্রথম সাধনা।
পথে নামলেই ঈশ্বর পথ দেখান।

গীতার ভাষায়—

“কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন”

অতএব, এই ছোট্ট ছেলেটি আমাদের শেখায়—
তৃষ্ণা না থাকলে জল অর্থহীন,

জীবনে আমরা এমন অনেক মানুষের সঙ্গে দেখা পাই,
যাঁরা এগিয়ে যাওয়ার বদলে কি, কেন, কিভাবে—এই প্রশ্নের জালে নিজেকেই আটকে রাখেন।
দিনের শুরুতে যেখানে ছিলেন, দিনের শেষে সেখানেই থেকে যান।

অথচ প্রকৃত পথিকেরা প্রশ্নে নয়, পথে নামার সাহসে বিশ্বাস করেন।
তাঁরা জানেন—চলতে চলতেই উত্তর আসে,
আর বাধা পেরিয়েই পৌঁছানো যায় লক্ষ্যে।

Loading