February 4, 2026

প্রয়াণ দিবস: আচার্য স্বামী প্রণবানন্দ, জন্ম, সাধনা ও সমাজসংস্কারের এক বিস্মৃত অধ্যায়

পশ্চিমবঙ্গ রক্ষায় স্বামী প্রণবানন্দজী মহারাজের অবদান

সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ আচার্য স্বামী প্রণবানন্দ (২৯ জানুয়ারি ১৮৯৬ – ৮ জানুয়ারি ১৯৪১) ছিলেন একাধারে যোগসিদ্ধ মহাপুরুষ, সমাজসংস্কারক ও সংগঠক। বর্তমান বাংলাদেশের মাদারিপুর জেলার বাজিতপুর গ্রামে বিষ্ণুচরণ ভূঞা ও মাতা সারদাদেবীর ঘরে তাঁর জন্ম। জন্মতিথি ছিল মাঘী পূর্ণিমা, বুধবার। বাল্যনাম ছিল বিনোদ। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে ঘেরা সেই গ্রামেই তাঁর শৈশব কেটেছিল।

জমিদারি অত্যাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বিনোদের পিতা বিষ্ণুচরণ ভূঞা একাধিকবার বিপদের মুখে পড়েন। কথিত আছে, সেই সংকটকালে তিনি গৃহদেবতা নীলরুদ্রের শরণাপন্ন হলে দেবাদিদেব মহাদেব দর্শন দিয়ে আশ্বাস দেন—ভয় নেই, তিনি পুত্ররূপে জন্ম নিয়ে পরিবারকে বিপদমুক্ত করবেন। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, বিনোদের জন্মের পরই দীর্ঘদিনের মামলায় বিষ্ণুচরণ ভূঞা জয়লাভ করেন। সেই কারণে সন্তানের নাম রাখা হয় ‘জয়নাথ’; পরে নাম হয় বিনোদ, আর বুধবার জন্মগ্রহণ করায় ডাকনাম হয় ‘বুধো’।

মাত্র ১৭ বছর বয়সে, ১৯১৩ সালে গোরক্ষপুরের মহাযোগী বাবা গম্ভীরনাথজীর নিকট তিনি দীক্ষালাভ করেন। ১৯১৬ সালে, মাত্র ২০ বছর বয়সেই কঠোর সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেন বলে তাঁর অনুগামীদের বিশ্বাস। দীর্ঘ আট বছরের সাধনার পর ১৯২৪ সালের জানুয়ারি মাসে প্রয়াগধামে অর্ধকুম্ভ মেলার সময় স্বামী গোবিন্দানন্দ গিরি মহারাজের নিকট থেকে আনুষ্ঠানিক সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। সেই সময় থেকেই তিনি ‘আচার্য স্বামী প্রণবানন্দ’ নামে পরিচিত হন।

স্বামী প্রণবানন্দ কেবল আধ্যাত্মিক সাধনাতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। ব্রহ্মচারী বিনোদ পরোক্ষভাবে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তিনি বিপ্লবী সংগঠন ‘মাদারিপুর সমিতি’-র সদস্য ছিলেন। ১৯১৪ সালে ফরিদপুর ষড়যন্ত্র মামলায় তাঁকে গ্রেফতার করে প্রথমে মাদারিপুর ও পরে ফরিদপুর জেলে আটক রাখা হয়।

সেবাই ছিল তাঁর জীবনের মূল ব্রত। ১৯১৭ সালে তিনি প্রথম একটি আশ্রম স্থাপন করেন। ১৯১৯ সালে এক ভয়াবহ ঝড়ে বহু মানুষের মৃত্যু হলে তিনি ত্রাণ ও সেবাকাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সেই সেবাকর্মের পর স্থানীয় বিশিষ্টজনদের অনুরোধে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘মাদারিপুর সেবাশ্রম’। অল্প সময়ের মধ্যেই খুলনা, নওগাঁ, আশাশুনি-সহ বিভিন্ন স্থানে সেবাশ্রম গড়ে ওঠে।

১৯২২ সালে কলকাতার বাগবাজারে প্রথম আশ্রম স্থাপনের মাধ্যমে তাঁর কর্মকাণ্ড শহরে বিস্তার লাভ করে। পরবর্তী এক দশকে কলকাতার বিভিন্ন স্থানে আশ্রম স্থানান্তরের পর অবশেষে ১৯৩২ সালে বালিগঞ্জের ২১১, রাজবিহারী এভিনিউতে ভারত সেবাশ্রম সংঘের প্রধান কার্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।

স্বামী প্রণবানন্দ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন—ভারতের তীর্থস্থানগুলি দেশের অখণ্ডতার প্রতীক। তাই হিন্দু সমাজের ঐক্য ও পুনর্গঠনের লক্ষ্যে তিনি তীর্থসংস্কার আন্দোলন শুরু করেন। ভণ্ড ধর্মব্যবসায়ীদের দখল থেকে বহু তীর্থস্থান উদ্ধারের জন্য আন্দোলন চালান এবং দরিদ্র ও অবহেলিত মানুষের জন্য তীর্থে প্রবেশের দ্বার উন্মুক্ত করেন।

সমাজসংস্কারের প্রশ্নে তিনি তাৎক্ষণিক ও বলপ্রয়োগমূলক পন্থার বিরোধী ছিলেন। হরিজনদের জোর করে মন্দিরে প্রবেশ করানোর আন্দোলনের বিরোধিতা করে তিনি বলতেন—মন্দির সামাজিক সংঘর্ষের ক্ষেত্র হতে পারে না। পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন চরিত্রগঠন ও সামাজিক ঐক্য। সেই লক্ষ্যেই তিনি ‘হিন্দু মিলন মন্দির’ প্রতিষ্ঠা করেন।

জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট ও সাহসী। তিনি হিন্দু সমাজকে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য বা শূদ্র—এই বিভাজনে বিশ্বাস করতেন না। সকলকে তিনি ‘হিন্দু’ নামেই সম্বোধন করতেন। শূদ্রদের সঙ্গে পঙ্‌ক্তিভোজন, তাঁদের সঙ্গে যজ্ঞে অংশগ্রহণ এবং জন্মজাত শূদ্রত্বের বিরোধিতা তাঁর সমাজদর্শনের বাস্তব উদাহরণ।

স্বামী প্রণবানন্দজী মহারাজ—বাঙালি হিন্দু সমাজের কাছে যিনি মূলত একজন আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবেই পরিচিত। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আজ অনেকটাই বিস্মৃত। তিনি শুধু ধর্মগুরু নন, ছিলেন হিন্দু সমাজের ভবিষ্যৎ বিপদের দূরদর্শী পর্যবেক্ষক এবং ঐক্যের আহ্বানকারী এক দার্শনিক ব্যক্তিত্ব।

সময়টা ছিল ১৯৪০ সাল। স্বাধীনতা আন্দোলন তখন চরম পর্যায়ে। ব্রিটিশ সরকারের সামনে তখন দেশভাগের তত্ত্ব—হিন্দু ও মুসলিমদের জন্য পৃথক রাষ্ট্রের ধারণা। সেই প্রেক্ষাপটে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গ ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কায় দাঁড়িয়ে ছিল।

এই সম্ভাব্য বিপদ অনুধাবন করেই ১৯৪০ সালের জন্মাষ্টমীর দিনে কলকাতার বালিগঞ্জে এক বিরাট অরাজনৈতিক ধর্মীয় সভার আয়োজন করেন স্বামী প্রণবানন্দজী মহারাজ। সভার সভাপতি ছিলেন ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী এবং প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি মন্মথনাথ মুখোপাধ্যায়।

এই সভাতেই জীবনে প্রথমবার প্রকাশ্য মঞ্চে বক্তব্য রাখেন স্বামী প্রণবানন্দজী মহারাজ। তিনি হিন্দু সমাজের আসন্ন বিপদের কথা তুলে ধরে সকল সনাতনী হিন্দুকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। সভা শেষে এক তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্তে তিনি নিজের গলা থেকে মালা খুলে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর গলায় পরিয়ে দিয়ে হিন্দু সমাজের রক্ষার দায়িত্ব তাঁর হাতে অর্পণ করেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠে আসে।

পরবর্তীকালে কাশীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তাঁদের একাধিকবার সাক্ষাৎ হয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সেই সময় দেওয়া দায়িত্ব ও আশীর্বাদ বাস্তব রূপ নেয় দেশভাগের সময়। অনেকেই মনে করেন ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী তাঁর সর্বশক্তি প্রয়োগ করে পশ্চিমবঙ্গকে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পৃথক করে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হন। সেই লড়াই না হলে আজকের পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক পরিচয় সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারত। বর্তমান সময়েও, বিশেষ করে ২০২৫ সালে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর নির্যাতনের যে চিত্র উঠে আসছে, তা ফিরে তাকাতে বাধ্য করে ১৯৪০ সালের সেই সতর্কবার্তার দিকে। বহু আগেই সম্ভাব্য সংকটের আভাস পেয়েছিলেন স্বামী প্রণবানন্দজী মহারাজ—এমনটাই মনে করছেন ইতিহাসবিদ ও অনুগামীরা। এই কারণেই বাঙালি হিন্দু সমাজের একাংশের কাছে তিনি কেবল একজন আধ্যাত্মিক গুরু নন, বরং এক ঐতিহাসিক রক্ষাকর্তা। প্রতি বছরই ৮ জানুয়ারি ও ২৯ জানুয়ারি কলকাতায় বালিগঞ্জের ভারত সেবাশ্রম সংঘের প্রধান কার্যালয়ে তাঁর স্মরণে ভক্তদের সমাগম সেই বিশ্বাসেরই প্রতিফলন।

মাত্র ৪৫ বছর বয়সে, ১৯৪১ সালের ৮ জানুয়ারি স্বামী প্রণবানন্দ দেহত্যাগ করেন। স্বল্পায়ু হলেও তাঁর কর্মজীবন ছিল বিস্তৃত ও গভীর। আধ্যাত্মিক সাধনা, সমাজসংস্কার, তীর্থরক্ষা ও মানবসেবার মধ্য দিয়ে তিনি যে আদর্শ রেখে গেছেন, তা আজও ভারত সেবাশ্রম সংঘের কর্মকাণ্ডে প্রতিফলিত।

স্বামী প্রণবানন্দজী মহারাজের দর্শন আজও স্মরণ করিয়ে দেয়—
“ধর্ম রক্ষতি রক্ষিতঃ”
যে ধর্মকে রক্ষা করে, ধর্ম তাকেই রক্ষা করে।

Loading