November 30, 2025

বিহারে মাতৃদুগ্ধে ইউরেনিয়াম—চমকে দিল গবেষণাবিশেষজ্ঞদের সতর্কতা: দূষণ পৌঁছে গেছে বিপজ্জনক পর্যায়ে

সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছিলেন—
“এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি…”
কিন্তু বাস্তব যেন এক ভয়াবহ বিপরীত চিত্র এঁকে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, বিহারের বিভিন্ন জেলার স্তন্যদানকারী মায়েদের বুকের দুধে পাওয়া গেছে ইউরেনিয়াম—এমন মাত্রায়, যা শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক।

কোথা থেকে এল ইউরেনিয়াম?

পাটনার মহাবীর ক্যান্সার ইনস্টিটিউট, এআইআইএমএস দিল্লির বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগ এবং অন্যান্য গবেষকদের সমন্বয়ে ২০২১–২০২৪ সাল পর্যন্ত চলা এই গবেষণায় ১৭ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ৪০ জন মায়ের দুধে ইউরেনিয়াম–২৩৮ পাওয়া যায়।

গবেষক দলের সদস্য ড. অশোক শর্মা জানান—
“ইউরেনিয়াম কোথা থেকে আসছে তা এখনও স্পষ্ট নয়। ভূতাত্ত্বিক অনুসন্ধান চলছে।”
তিনি আরো বলেন—
“ইউরেনিয়াম খাদ্য শৃঙ্খলে ঢুকে গেলে কিডনির ক্ষতি, স্নায়বিক সমস্যা এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়তে পারে—বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে।”

কোন জেলায় সবচেয়ে বেশি?

গবেষণায় দেখা গেছে—

  • খাগারিয়া জেলায় গড় মাত্রা সবচেয়ে বেশি
  • নালন্দা সর্বনিম্ন
  • কাটিহার–এ একক নমুনায় সর্বোচ্চ মাত্রা পাওয়া গেছে

প্রায় ৭০ শতাংশ শিশু এমন মাত্রায় এক্সপোজারে ছিল, যা অ–ক্যান্সারজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে।

বিশ্বে কোথায় এমন সমস্যা দেখা দিয়েছে?

কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, চিন, মেকং ডেল্টা—অসংখ্য অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ জলে উচ্চ মাত্রার ইউরেনিয়াম ইতিমধ্যেই ধরা পড়েছে।
কিন্তু বিহারে বুকের দুধে ইউরেনিয়ামের উপস্থিতি বিষয়টিকে নতুন ও গুরুতর পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

দূষণের মূলে কী আছে?

বিহারের পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার পেছনে আছে—

  • ভূগর্ভস্থ জলের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা
  • অপরিশোধিত শিল্প বর্জ্যের নিঃসরণ
  • দীর্ঘদিন ধরে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার
  • ভূগর্ভে স্বাভাবিকভাবেই থাকা ভারী ধাতুর উপস্থিতি

ফলে আর্সেনিক, সীসা, পারদের মতো ভারী ধাতু তো আগেই ধরা পড়ছিল, এবার যোগ হলো ইউরেনিয়াম।

শিশুদের ঝুঁকি বেশি কেন?

  • অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এখনও বিকশিত হচ্ছে
  • বিষাক্ত ধাতু বেশি শোষণ করে
  • কম ওজনের কারণে এক্সপোজার মাত্রা তুলনামূলক বেশি

ইউরেনিয়াম বিশেষভাবে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং স্নায়বিক বিকাশকে ব্যাহত করতে পারে।

মাপ নিয়ে বিভ্রান্তি—সত্যি কী?

কিছু সামাজিক মাধ্যমের পোস্টে ইউরেনিয়ামের মাত্রা গ্রাম/লিটার বলা হয়েছে, যা বাস্তবে বৈজ্ঞানিকভাবে অসম্ভব।
ইউরেনিয়াম সাধারণত মাপা হয় ppb — parts per billion–এ।
ANI ও ভারতের পারমাণবিক গবেষণা সংস্থার তথ্যানুসারে, সর্বোচ্চ মাত্রা ছিল প্রায় ৫ ppb, যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সীমার নিচে হলেও শিশুদের ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক

তবুও বুকের দুধ বন্ধ নয়

বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট বলেছেন—
“মাতৃদুগ্ধের বিকল্প নেই। শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ করার প্রয়োজন নেই।”
বরং প্রয়োজন—

  • ভূগর্ভস্থ জলের গুণমান পরীক্ষা
  • দূষণের উৎস শনাক্ত
  • নিরাপদ পানীয় জলের নিশ্চয়তা
  • কৃষিতে কীটনাশক–রাসায়নিকের ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ
  • শিল্প বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা শক্ত করা

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের বার্তা

বিহারের পরিস্থিতি শুধু ওদের নয়—ভারতের বহু রাজ্যে একই রকম দূষণের হুমকি রয়েছে।
এই ঘটনার পর স্বাস্থ্যবিদ ও গবেষকদের সর্তক মন্তব্য—
“প্রকৃতি আর দূষণ—এ যুদ্ধে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এখনই ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।”

এই গবেষণা যেন এক ভয়াবহ সংকেত—
আমরা সত্যিই কি বিশ্বের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য এক পৃথিবী রেখে যেতে পারছি?

Loading