সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ আজ কবি জয়দেবের প্রয়াণ তিথি—পৌষ শুক্লা দ্বিতীয়া। ভারতীয় ভক্তিসাহিত্য ও সংগীতচর্চার ইতিহাসে যাঁর অবদান অমলিন, সেই কবি জয়দেব শুধু একজন কবিই নন, তিনি প্রেম ও ভক্তির এক চিরন্তন সাধক।
প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে ভগবান জগন্নাথের সেবায় নিয়োজিত অবস্থাতেই তাঁর জীবনাবসান ঘটে। আজও পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে নিত্য পাঠিত হয় তাঁর অমর সৃষ্টি ‘গীতগোবিন্দম্’—যা রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা অবলম্বনে রচিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ গীতিকাব্য।
গীতগোবিন্দম্ ও বৈষ্ণব ভাবধারা
রাধা-কৃষ্ণের প্রেম, বিরহ ও পুনর্মিলনের মধ্য দিয়ে ‘গীতগোবিন্দম্’ কেবল মানব প্রেমের কাব্য নয়—এ এক গভীর আধ্যাত্মিক দর্শন। এই কাব্যে রাধা-কৃষ্ণের প্রতীকে জীবাত্মা ও পরমাত্মার সম্পর্ক, মানব হৃদয়ের আকুলতা ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু প্রতিদিন স্বরূপদামোদরের কণ্ঠে ‘গীতগোবিন্দম্’ শ্রবণ করতেন। এই কাব্যের গুরুত্ব ও জনপ্রিয়তার প্রমাণ আজও মেলে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে, যেখানে এটি নিয়মিত পাঠিত হয়।
সেন যুগ ও রাজসভায় জয়দেব
দ্বাদশ শতকে বাংলায় সেন রাজবংশের শাসনকাল। বল্লাল সেনের পুত্র লক্ষ্মণ সেন ‘গৌড়েশ্বর’ উপাধি গ্রহণ করেন। যদিও সেন রাজারা ছিলেন শৈব, লক্ষ্মণ সেন (১১৭৯–১২০৫) ছিলেন বৈষ্ণব ধর্মানুরাগী। তাঁর রাজসভার প্রধান অলংকার ছিলেন সভাকবি জয়দেব।
জয়দেব লক্ষ্মণ সেনের রাজসভার ‘পঞ্চরত্ন’-এর অন্যতম। অপর চারজন ছিলেন গোবর্ধন আচার্য, শরণ, ধোয়ী ও উমাপতিধর। রাজসভার এই সাংস্কৃতিক পরিবেশেই জয়দেবের প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটে।
কেঁদুলির দরিদ্র ব্রাহ্মণ সন্তান
বীরভূম জেলার অজয় নদের তীরে কেন্দুবিল্ব বা কেঁদুলি গ্রামে দ্বাদশ শতকে কবি জয়দেবের জন্ম। দরিদ্র ব্রাহ্মণ ভোজদেব ও বামাদেবীর সন্তান জয়দেব শৈশব থেকেই বিদ্যা ও সংগীতে পারদর্শী ছিলেন। পিতার মৃত্যুশয্যায় বলা কথাই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের দিশারি—
“তোমার জন্য কিছু রেখে যেতে পারলাম না। সাহিত্য ও সংগীতই তোমার সম্পদ।”
পিতৃবিয়োগের পর নিরঞ্জন চাটুজ্যের কাছে পিতার ঋণ শোধ করতে গিয়ে নিজের বসতবাটি লিখে দিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন জয়দেব। সেই মুহূর্ত থেকেই তিনি সম্পূর্ণভাবে ঈশ্বরচিন্তায় নিমগ্ন হয়ে পড়েন।
পুরী, পদ্মাবতী ও ঈশ্বরকৃপা
নিঃস্ব, নিরাশ্রয় অবস্থায় জয়দেব এসে পৌঁছান পুরীর জগন্নাথ ধামে। এখানেই ঘটে তাঁর জীবনের এক অলৌকিক অধ্যায়। এক ব্রাহ্মণের কন্যা পদ্মাবতীকে স্বয়ং ভগবান জগন্নাথ তাঁর পরম ভক্ত জয়দেবের হাতে সমর্পণের নির্দেশ দেন। প্রথমে অস্বীকার করলেও ঈশ্বরের ইচ্ছা মেনে পদ্মাবতীকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন জয়দেব।
‘দেহি পদপল্লবমুদারং’—দিব্য লীলা
‘গীতগোবিন্দম্’ রচনার সময় রাধার অভিমান পর্বে কৃষ্ণের রাধার চরণ স্পর্শের দৃশ্য লেখার সাহস পাচ্ছিলেন না জয়দেব। কিংবদন্তি অনুযায়ী, সেই সময় স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ জয়দেবের রূপ ধরে এসে পান্ডুলিপিতে লিখে দেন—
“দেহি পদপল্লবমুদারং”
এই অলৌকিক ঘটনার মধ্য দিয়েই জয়দেব উপলব্ধি করেন তাঁর আরাধ্য স্বয়ং তাঁর কাব্যে অবতীর্ণ হয়েছেন।
মকর সংক্রান্তি ও কেঁদুলির গঙ্গাস্নান
প্রতিবছর মকর সংক্রান্তিতে কবি জয়দেব বর্ধমানের কাটোয়ায় গঙ্গাস্নান করতেন। একবার যেতে না পারায় স্বপ্নে মা গঙ্গা তাঁকে আশ্বাস দেন যে তিনি অজয় নদেই আবির্ভূত হবেন। পরদিন অজয় নদের উজানে প্রবাহ ও পদ্মফুল ভেসে আসার অলৌকিক ঘটনাকে কেন্দ্র করেই কেঁদুলির মকর সংক্রান্তির মেলার সূচনা।
জয়দেব মেলা ও বাউল সংস্কৃতি
আজ কেঁদুলির পৌষ সংক্রান্তির মেলা কেবল ধর্মীয় উৎসব নয়—এ এক বৃহৎ লোকসংস্কৃতির মিলনক্ষেত্র। এই মেলা মূলত বাউলদের মেলা হিসেবেই পরিচিত। চার দিনব্যাপী আখড়া, গান, সাধনা ও শেষ দিনের ‘ধুলাত’—সব মিলিয়ে কেঁদুলি মেলা দেশের অন্যতম প্রধান লোকোৎসবে পরিণত হয়েছে।
জীবনের শেষভাগে বৃন্দাবনে অবস্থান করলেও কবি জয়দেব আজও ফিরে আসেন—পৌষ সংক্রান্তির শীতল রাতে, অজয় নদের তীরে, বাউলের গানে, গীতগোবিন্দের সুরে।
তিনি চিরকালের সাধক, চিরকালের ভক্ত কবি—বাংলার সংস্কৃতির এক অমর অধ্যায়।


![]()

More Stories
কয়লা পাচার কাণ্ডে পশ্চিমবঙ্গে ইডির তল্লাশি অভিযান, দুর্গাপুর ও বুদবুদে হানা
দিল্লিতে রাজ্য পুলিশের বাড়তি টিম, ২২ জনের দল রাতের বিমানে রওনা
লোকভবনে রাজ্যপালের কাছে SIR সংক্রান্ত দাবিপত্র বিজেপি বিধায়কদের