স্বনির্ভরতার স্বপ্ন নাকি ঋণের ফাঁদ? বিশ্ব নারী দিবসে উঠে এল মাইক্রোফাইন্যান্সের বাস্তব চিত্র

সোমালিয়া ওয়েব নিউজঃ আজ বিশ্ব নারী দিবস। চারিদিকে নারী ক্ষমতায়ন, স্বনির্ভরতা ও আর্থিক স্বাধীনতার কথা উচ্চারিত হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবের মাটিতে দাঁড়ালে দেখা যায়, বহু ক্ষেত্রে সেই স্বনির্ভরতার স্বপ্নই যেন ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে ঋণের ফাঁদে। গ্রামের সাধারণ গৃহবধূদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন বেসরকারি মাইক্রোফাইন্যান্স সংস্থা সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার প্রলোভন দেখাচ্ছে, আর সেই প্রলোভনে পা দিয়ে অনেক নারীই পড়ছেন চড়া সুদের চক্রে।

অভিযোগ, এক শ্রেণির বেশ কিছু মাইক্রো ফাইন্যান্স সংস্থা এলাকার মহিলাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, প্যান কার্ড সংগ্রহ করে খুব সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছে। তৎক্ষণাৎ টাকা পাওয়ার সুবিধা থাকায় অনেকেই সেই প্রলোভনে রাজি হয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু পরবর্তীতে সপ্তাহে সপ্তাহে কিস্তি ও উচ্চ সুদের চাপ সামলাতে গিয়ে বহু পরিবার পড়ছে আর্থিক সংকটে।

বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, সমবায় সমিতি ও সরকারি স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও বহু মহিলা অজান্তেই ঝুঁকে পড়ছেন বেসরকারি মাইক্রোফাইন্যান্স সংস্থার দিকে।

অনেকের মতে, এর অন্যতম কারণ সচেতনতার অভাব। ব্যাংক বা সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে গ্রামাঞ্চলের মহিলাদের সেই অর্থে নিয়মিত সচেতন করার উদ্যোগ অনেক ক্ষেত্রেই চোখে পড়ে না। ফলে সহজ শর্তে দ্রুত ঋণের প্রলোভন দেখিয়ে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে যাওয়া মাইক্রোফাইন্যান্স সংস্থাগুলিই হয়ে উঠছে তাঁদের প্রথম ভরসা।

গ্রামের বহু মহিলার অভিজ্ঞতা বলছে, ব্যাংকে গিয়ে ঋণ নিতে গেলে নানা কাগজপত্রের জটিলতা, দীর্ঘ প্রক্রিয়া এবং অনেক সময় অনীহা বা অনাগ্রহের মুখোমুখি হতে হয়। সব ব্যাংককর্মী যে সমান আন্তরিকতার সঙ্গে কথা বলেন, এমন অভিজ্ঞতাও সবার হয় না। ফলে বড় রাস্তায় অবস্থিত ব্যাংক বা অফিসে গিয়ে বারবার ঘোরাঘুরি করার সাহস বা স্বাচ্ছন্দ্য অনেকেরই থাকে না।

তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আর এক গভীর সামাজিক বাস্তবতা—অর্থের প্রয়োজনের কথা প্রকাশ করতে অনেক মহিলা সংকোচ বোধ করেন। সংসারের টানাপোড়েন, হঠাৎ চিকিৎসা খরচ বা ছোট ব্যবসার পুঁজি—এই সব প্রয়োজনের কথা অনেকেই প্রকাশ্যে বলতে লজ্জা পান। ঠিক সেই জায়গাটাকেই ব্যবহার করছে মাইক্রোফাইন্যান্স সংস্থাগুলি। তারা সরাসরি মহিলাদের বাড়িতে পৌঁছে যাচ্ছে, দরজায় কড়া নেড়ে বলছে—“টাকা দরকার? ব্যবস্থা হয়ে যাবে।”

ঘরের ভেতরেই কাগজপত্র নেওয়া, গোপনীয়তা বজায় রাখা এবং দ্রুত ঋণ মঞ্জুর হওয়ার প্রতিশ্রুতি—এই সব মিলিয়ে অনেক মহিলার কাছে বিষয়টি সহজ ও নিরাপদ বলে মনে হয়। কিন্তু সেই সহজ পথই অনেক সময় হয়ে উঠছে কঠিন ঋণের বোঝা।

স্বনির্ভরতার স্বপ্ন নিয়ে নেওয়া সেই ঋণ, সপ্তাহের পর সপ্তাহ কিস্তি শোধ করতে গিয়ে কখন যে পরিবারের উপর চাপ বাড়ায়, কখন যে শান্ত সংসারে অশান্তির ছায়া নামে—তা অনেকেই বুঝে উঠতে পারেন না।

ভাদুর অঞ্চলের মহামায়া স্বনির্ভর সঙ্গম মহিলা প্রাথমিক বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেড–এর কর্মী জয়ন্তী মুদি জানান, সচেতনতার অভাবেই অনেক মহিলা এই মাইক্রোফাইন্যান্স সংস্থাগুলির প্রলোভনে পা দিচ্ছেন। তাঁর কথায়, “চড়া সুদের চাপে অনেক পরিবার সর্বস্বান্ত হয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও পারিবারিক অশান্তি এমনকি জীবনহানির ঘটনাও ঘটছে।”

একই উদ্বেগের কথা শোনালেন গোঘাটের রঘুবাটি সমবায় সমিতির ম্যানেজার তন্ময় মুখার্জি। তিনি বলেন, “এলাকার মহিলাদের আরও বেশি সচেতন করা জরুরি। অনেকেই একটি সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে সেই কিস্তি শোধ করতে আবার অন্য সংস্থা থেকে ঋণ নিচ্ছেন। এতে করে তাঁদের সিবিল স্কোর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছেন।”

পরিসংখ্যান বলছে, বেশিরভাগ বেসরকারি মাইক্রোফাইন্যান্স সংস্থায় সুদের হার প্রায় ১৪ থেকে ২৪ শতাংশ পর্যন্ত। অন্যদিকে স্বনির্ভর গোষ্ঠী বা সমবায় সমিতির মাধ্যমে ঋণ নিলে সুদের হার থাকে মাত্র ৬.৫ থেকে ৭.৫ শতাংশের মধ্যে

তবে মাইক্রোফাইন্যান্স সংস্থাগুলির পক্ষেও যুক্তি রয়েছে। এক সংস্থার কর্মী বলেন, “হঠাৎ করে টাকা প্রয়োজন হলে বা ছোট ব্যবসা শুরু করতে চাইলে দ্রুত ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে মাইক্রোফাইন্যান্স সংস্থাগুলির গুরুত্ব অনেক, ছোটখাট ব্যবসার প্রয়োজনে বা হঠাৎ যে কোনো ধরনের সমস্যায় ঋণ পেতে সুবিধা সাধারণ মানুষের অনেকটা।”

কিন্তু বাস্তবের চিত্র অনেক সময় ভিন্ন। একাধিক সংস্থা থেকে ঋণ নেওয়া এক গৃহবধূ রিনা সাঁতরা বলেন, “একটা কোম্পানির লোন শোধ করতে গিয়ে আবার অন্য কোম্পানি থেকে লোন নিতে হচ্ছে। এইভাবে ঋণের বোঝা বাড়ছে, বাড়িতেও অশান্তি হচ্ছে।” তিনি অন্য মহিলাদের উদ্দেশ্যে সতর্ক করে বলেন, “এইসব কোম্পানি থেকে লোন না নিয়ে সরকারি ব্যাংক বা সমবায় সমিতি থেকেই ঋণ নেওয়া ভালো, সেখানে সুদের হার কম এবং সুবিধাও বেশি।”

এ বিষয়ে আমরা বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্তে ব্যাংকের ম্যানেজারদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করি কিন্তু তারা ক্যামেরার সাথে কোন রকম মন্তব্য করতে চাননি।

এই পরিস্থিতিতে বড় প্রশ্ন উঠছে—
নারীরা কি সত্যিই স্বনির্ভর হচ্ছেন, নাকি স্বনির্ভরতার স্বপ্ন দেখিয়ে তাঁদের ঠেলে দেওয়া হচ্ছে ঋণের অন্তহীন চক্রে?

একসময় চিটফান্ড কেলেঙ্কারি সাধারণ মানুষের সঞ্চয় লুটে নিয়ে বহু পরিবারকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে— আজকের এই মাইক্রোফাইন্যান্স সংস্কৃতি কি ভবিষ্যতে আর এক নতুন আর্থিক সংকটের কারণ হয়ে উঠবে না তো?

নারী দিবসে তাই শুধু শুভেচ্ছা নয়, দরকার সচেতনতা। কারণ প্রকৃত ক্ষমতায়ন তখনই সম্ভব, যখন স্বনির্ভরতার পথে হাঁটা নারীরা আর্থিক স্বাধীনতার পাশাপাশি নিরাপদ আর সুস্থ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গেও যুক্ত থাকবেন।

Loading